'২৪ এ বিরোধী জোট হবে? ধরাশায়ী কংগ্রেসকে নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠে আসছে

Sindhu Som
৩ মিনিট
'২৪ এ বিরোধী জোট হবে? ধরাশায়ী কংগ্রেসকে নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠে আসছে

গত কয়েক বছরে বিজেপির বিরুদ্ধে একটি জোট গঠনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ব্যাপক হারের পর এই বিরোধী জোটের সম্ভাবনা বাড়ছিল। কংগ্রেসকে মূলে রেখে অরভিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা ব্যানার্জীও এই জোটের মুখ হতে পারেন বলেই চলছিল জল্পনা কল্পনা। বিশেষত সামনে যখন ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচন। আর মাত্র বছর দুয়েক। তবে বিধানসভা নির্বাচনের এই ফলাফল, পাঞ্জাবে কংগ্রেসের হেরে যাওয়া সামগ্রিকভাবে দুর্বল করল এই জোটের সম্ভাবনাকে। একই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে জয় আরেকবার ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রটিতে বিজেপির ঘুরে দাঁড়ানোর জমি শক্ত করল।

নির্বাচনের আগে ক্ষমতার বিরুদ্ধতায় এক জোট হতে দেখা যায় বহু দলকেই। ১৯৯৬-এ বি এস পি-কংগ্রেস থেকে এস পি-বি এস পি, উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সালে কংগ্রেস-এস পি-র জোট—এমন উদাহরণ প্রচুর দেখা গিয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই বিরোধীদের একজোট হওয়ার প্রয়োজন এবং সেক্ষেত্রে কাজ শুরু করা বাঞ্ছনীয় রাজ্যস্তর থেকেই। সদ্য হওয়া পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে কোনও সাধারণ প্রার্থীর দিকে এগোতেন বা বিজেপি বিরোধিতার কৌশল হিসেবে নিজেদের সম্পর্কগুলি খতিয়ে দেখতেন তবে জেতার সম্ভাবনা আরো বেশি থাকত। সমস্ত বিরোধী একজোট হয়ে যাবেন–এমনটা বাস্তবে সম্ভব না। কিন্তু একটা বড় অংশ একজোট হওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন।

বিরোধীদের মতানৈক্যের অনেক কারণ রয়েছে। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের হার এই যাবতীয় কারণে আরও জ্বালানি যোগাবে। ভারতের রাজনীতিতে পাঞ্জাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবার প্রধানত কৃষক আন্দোলনকে সামনে রেখেই। গোটা দেশ এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে ছিল। পাঞ্জাবে জয়ী দল অন্যতম বিরোধী হিসেবে যে গোটা ভারতবর্ষে একটা জায়গা করে নেবে–এমনটাই স্বাভাবিক। এইটি মাথায় রেখেই নির্বাচনে প্রাণপণ লড়ে গিয়েছেন বিরোধীরা। কারণ পাঞ্জাবে কৃষি আইনের প্রণেতা ও সমর্থক হিসেবে বিজেপির জেতার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু কংগ্রেসের দলীয় বিবাদ সামলাতে অপারগ গান্ধী পরিবার শুধু যে তাদের ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাঞ্জাবে নিজেদের ক্ষমতা হারাল তাই নয়, ভারতীয় কংগ্রেস পরিচালনার কতখানি ক্ষমতা তাদের রয়েছে–বর্তমানে এ প্রশ্নকেও তারা আরও জোরদার করেছে। মূলত ২০১৪ থেকেই সর্বভারতীয় স্তরে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়ে আসছে কংগ্রেস। নিজেদের অতীত ইতিহাস উদযাপনে কংগ্রেস যেখানে মগ্ন, সেখানে আঞ্চলিক দলগুলি নিজস্ব এলাকায় বিজেপি-বিরোধিতায় বেশ দড় হয়ে উঠেছে।

এখন বিরোধীদের সামনে মূল লক্ষ্য কীভাবে বিজেপিকে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে বিজেপি তাদের হাত খেলতে শুরু করেছে। বিশেষত, উত্তরপ্রদেশে যোগীর আবার জয় সামনের লোকসভা নির্বাচনের দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। উল্টোদিকে কংগ্রেসের দুর্বলতা পার্লামেন্টের ভিতরে ও বাইরে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দড় একটি বিরোধীশূন্যতা তৈরি করেছে। বিজেপি-বিরোধী জোটের আঞ্চলিক দলগুলিকে যে জাতীয় সুতোয় গাঁথার পরিকল্পনা চলছিল তা কিন্তু কংগ্রেসই। সেই সুতো দুর্বল হয়ে পড়ায় জাতীয় স্তরের বিরোধী জোট কতটা পোক্ত হবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই জন্যেই আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে মতানৈক্য বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি আঞ্চলিক দল মুখে জোটের প্রয়োজন স্বীকার করে নিলেও আদতে নিজেদের মধ্যেই ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দিতা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। বিজেপি বিরোধিতার ইস্যু সেখানে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, যোগী আদিত্যনাথ–প্রত্যেকেই প্রধানমন্ত্রী পদলাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। আর এইবার কোন দল ভারতের ক্ষমতায় আসে এর উপর ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কংগ্রেসের দুর্ভাগ্য তারা এখন বিরোধী জোটের সামান্য এক অংশ মাত্র। তুলনায় এই জোটের আঞ্চলিক দলগুলির কাজকর্ম চোখে পড়ার মতো। ফলে জোটের মূলসূত্র হওয়ার পরিবর্তে কংগ্রেসও অন্যান্য দলগুলির মতোই প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে নেমে গিয়েছে। উপরন্তু কংগ্রেসের মধ্যে নিরন্তর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। জিতিন প্রসাদ, আর পি এন সিং-এর মতো রাহুল-কংগ্রেসের বড় বড় নেতা এই কারণে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে চলে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে নওজ্যোত সিধুকে নিয়ে হয়ে গিয়েছে আরেক চোট। প্রথমে অম্‌রিন্দর সিং পরে চান্নি–কারোর সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি গান্ধী পরিবার। এখন মনে করা হচ্ছে অম্‌রিন্দরকে পদচ্যুত না করলে এবারও পাঞ্জাব নির্বাচন জিততে পারত কংগ্রেস। বি এস পির সঙ্গেও কংগ্রেসের কয়েকটি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব রয়েছে। উত্তর প্রদেশে দলিত ও ব্রাহ্মণ ভোটের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এদিকে আপের সঙ্গে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও গোয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কংগ্রেসের। শিবসেনা এবং তৃণমূলের সঙ্গেও সম্পর্ক মোটেও ভালো না তাদের। অপরদিকে আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে সাংঘাতিক ইগোর লড়াই। রাহুলের নেতৃত্ব মেনে নিতেও নারাজ তারা। সুযোগ পেলেই নিজেদের বিরুদ্ধেও নখ দাঁত শানিয়ে থাকে এই দলগুলি। এমতাবস্থায় বিজেপির বিরুদ্ধে পোক্তভাবে লড়াই করতে গেলে সবার আগে বিরোধীদের প্রয়োজন নতুন কৌশ। সে কৌশল কতটা সাবধানতার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে বেছে নিতে পারছেন তাঁরা, কতটা রূপ দিতে সক্ষম হচ্ছেন –তার উপর ২০২৪-এর নির্বাচনে ফলাফল নির্ভর করবে।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।