বটবৃক্ষের ছায়ায় বাড়ে আবেগ, কিংবদন্তিদের হাত ধরে উঠে আসেন আলভারেজ, এমবাপেরা
World Cup Football Final 2022: কে বলতে পারে হয়তো বেলজিয়াম বা নেদারল্যান্ডসের মতোই পরবর্তী সময়ে উঠে আসবে জাপান, মরক্কো, আমেরিকা, সুইৎজারল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া।

বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘গ্রেভ ইয়ার্ড অফ দ্য গ্রেটস’। বিশ্বকাপের মঞ্চেই অধিকাংশ ফুটবলার নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন। প্রত্যেক বিশ্বকাপই সাক্ষী থাকে কোনও না কোনও কিংবদন্তির বিদায়বেলার। কিন্তু ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ একটু আলাদা। এই বিশ্বকাপে কোনও একজন সুপারস্টার বিদায় নিচ্ছেন না, বিদায় নিচ্ছে একটা গোটা প্রজন্ম। গত এক-দেড় দশক ধরে যারা বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতেন, তাঁরা অবসর নিচ্ছেন। লিও মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, লুইস সুয়ারেজ, লুকা মদরিচ, থিয়াগো সিলভা, ম্যানুয়েল ন্যয়ার, থমাস মুলারের মতো সুপারস্টাররা খেলে ফেলেছেন তাঁদের শেষ বিশ্বকাপ। আর হয়তো ময়দানে দেখা যাবে না এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি'ব্রুয়েন, রোমেলু লুকাকু সম্বলিত বেলজিয়ামের সেই গোল্ডেন জেনারেশন। ভাবতেও অবাক লাগে, আর কোনদিনও দেশের জার্সি গায়ে খেলতে দেখা যাবে না এই তাবড় খেলোয়াড়দের। এবারের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে একটা গোটা ফুটবল প্রজন্ম।
কিন্তু ভুললে চলবে না, শেষ মানেই নতুনের শুরু। একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার হাত ধরেই উঠে আসছে আরেকটি। সময়ের নিয়মেই নিজেদের জায়গা ছাড়ছেন মেসি-রোনাল্ডো-সুয়ারেজ। এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা দলে নিজেদেরকে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন অ্যাঞ্জেল ডি'মারিয়া এবং লিও মেসি। কিন্তু দলটির দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কীভাবে উঠে আসছে পরবর্তী প্রজন্ম, উঠে আসছে এই প্রজন্মের কিংবদন্তিদের বিদায় জানাতে। বিশ্বকাপের প্রতি ম্যাচেই প্রায় গর্জে উঠছেন জুলিয়ান আলভারেজ। হঠাৎ হঠাৎ করে ডিফেন্স-ভেদি শট নিয়ে ডিফেন্ডারদের ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন ম্যাক অ্যালিস্টার। মাঝ মাঠে দলকে ভরসা যোগাচ্ছেন রদ্রিগো ডি'পল। পরবর্তী প্রজন্ম তো তৈরিই প্রায়। মারিও কেম্পেস, মারাদোনা, বাতিস্তুতারা যে উত্তরাধিকার ছেড়ে গিয়েছিলেন তার ব্যাটন তুলেছিলেন মেসি। আর রবিবারের পর সেই ব্যাটন হাতে উঠবে আলভারেজ, অ্যালিস্টারদের।

জুলিয়ান আলভারেজ এবং ম্যাক অ্যালিস্টার
পর্তুগালের শেষ দুই ম্যাচে বেঞ্চে বসতে হয়েছিল রোনাল্ডোকে। কারণ বা ফলাফল যাই হোক না কেন, রোনাল্ডোহীন পর্তুগালের খেলা দেখে বোঝা গিয়েছিল ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হাতেই আছে। পর্তুগালের কথা উঠলেই নাম করতে হয় সেই দেশের আরেক ডিফেন্ডার পেপের। ৩৯ বছর বয়সেও তিনিই এই মুহূর্তে পর্তুগালের সেরা ডিফেন্ডার। সামনের বিশ্বকাপে রোনাল্ডো আর পেপেকে দেখা যাবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। নায়কদের অনুপস্থিতিই সুযোগ করে দেয় নবাগতদের। জন্ম দেয় নতুন সম্ভাবনার। সেই সম্ভাবনার নাম হতে পারে গঞ্জালো রামোস কিংবা রিকার্দো হোর্তা কিংবা জোয়াও ফেলিক্স। পেপের অনুপস্থিতিতে দলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠতে পারেন তরুণ ডিফেন্ডার রুবেন ডিয়াস। অপরদিকে, রোনাল্ডোর অনুপস্থিতিতে আরও বড় দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ আসবে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, আন্দ্রে সিলভাদের কাছে।
এই নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই যে এবারের বিশ্বকাপ জন্ম দিয়েছে বেশ কয়েকজন তারকার। মেসি-রোনাল্ডো-নেইমার পরবর্তী সময়ে কারা বিশ্বফুটবল শাসন করবে তার খানিকটা আভাস মেলে এই বিশ্বকাপে। এই বিশ্বকাপের অন্যতম প্রতিশ্রুতিমান ফুটবলার হিসেবে উঠে এসেছেন কিলিয়ান এমবাপে। বিশ্ব ফুটবলে তাঁর নাম আগেই ছিল, কিন্তু তিনি যে কত বড় মাপের খেলোয়াড় তা প্রকাশ পাচ্ছে এই বিশ্বকাপে। ইতিমধ্যেই দু'টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে মোট ৯টি গোল করা হয়ে গিয়েছে এমবাপের। অনেকের মতে জিদানের সমকক্ষ হওয়ার সব রসদ রয়েছে এই ২৩ বছরের তরুণের মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে ৫ টি গোল করে মেসির সঙ্গে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে রয়েছেন। ফাইনালে দু'জনের মধ্যে কে এগিয়ে যাবে, সেই দিকে নজর থাকবে সকলের। ফ্রান্সের থেকে ব্রাজিলের দিকে নজর ঘোরালে চোখে পড়বেন রিচার্লিসন। বিশ্বকাপের সবক'টি ম্যাচে অত্যন্ত দারুণ ম্যাজিক উপহার দিয়েছেন তিনি। দলকে সেমিফাইনালে তুলতে ব্যর্থ হলেও রিচার্লিসনের কৃতিত্বকে কোনও অংশে ছোট করা যায় না।

জাভি-ইনিয়েস্তার মতোই হতে চলেছে পাবলো-পেদ্রির জুটি
শেষ ষোলোয় মরক্কোর কাছে হেরে গেলেও গ্রুপ পর্বে স্পেনের জার্সি গায়ে নজর কেড়েছে পাবলো গাভি এবং পেদ্রি। স্পেন দলের অন্যতম আস্থার জায়গা মিডফিল্ডার পাবলো গাভি। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার নিয়মিত মুখ ১৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। গাভির সঙ্গী স্পেনের আরেক তরুণ মিডফিল্ডার পেদ্রি। তরুণ এই ফুটবলের প্লে-মেকিং স্টাইল ইনিয়েস্তার কথা মনে করাতে বাধ্য। অনেক ফুটবল বোদ্ধার মতে, অদূর ভবিষ্যতে পাবলো এবং পেদ্রির এই জুটি, জাভি-ইনিয়েস্তা জুটির মতোই সাফল্য এনে দেবে স্পেন এবং বার্সেলোনাকে। স্পেনের এই জুটির মতোই আরেকটি সফল জুটি দেখেছে এই বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের ফিলিপ ফডেন এবং জুড বেলিংহ্যামের জুটি। ফিলিপ ফডেন পরিচিত মুখ। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে অনেক গোল করেছেন ও করিয়েছেন। প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের জাত চিনিয়েছেন। তবে এই বিশ্বকাপের অন্যতম আবিষ্কার জুড বেলিংহ্যাম। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের এই ১৯ বছর বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার আক্ষরিক অর্থেই টোটাল ফুটবলার। প্রয়োজনে নেমে ডিফেন্সকে সাপোর্ট দেওয়ার পাশাপাশি দারুণ আক্রমণ তৈরি করতে পারেন নিজের পা থেকে। অনেকেই বেলিংহ্যামের মধ্যে স্টিফেন জেরার্ডের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।

জুড বেলিংহ্যাম
তবে এই সব বড় বড় দলগুলি ছাড়াও বেশ কয়েকজন তারকা উঠে এসেছেন তথাকথিত ছোট দলগুলি থেকে। ছোট দলগুলোর মধ্যে চমকপ্রদ পারফরম্যান্স দিয়েছে মরক্কো এবং জাপান। এবারের বিশ্বকাপে জাপানের হয়ে নজর কেড়েছেন তাকেফুসা কুবো। তাকে ডাকা হয় ‘জাপানের মেসি’ বলে। রিয়াল সসিদাদের এই অ্যাট্যাকিং মিডফিল্ডার এবারের বিশ্বকাপে নজর কেড়েছেন সকলের। একই সঙ্গে নাম করতে হবে সেদেশের ফরওয়ার্ড রিৎসো দুয়ানের। জার্মানি এবং স্পেনকে হারাতে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। এতদিন পর্যন্ত আশরাফ হাকিমি বা হেকিম জিয়েচকে বিশ্ব চিনত তাদের ক্লাবের জন্য। এই বিশ্বকাপে মরক্কো দেখিয়ে দিয়েছে তাদের মধ্যে সম্ভাবনা কতটা। বলাই বাহুল্য হাকিমি, জিয়েচরা নতুন করে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা জাগিয়েছেন দেশবাসীর মধ্যে। কে বলতে পারে হয়তো বেলজিয়াম বা নেদারল্যান্ডসের মতোই পরবর্তী সময়ে উঠে আসবে জাপান, মরক্কো, আমেরিকা, সুইৎজারল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া। আর সামনের বিশ্বকাপে যখন ৪৮টি দেশ খেলবে তখন আরও নতুন প্রতিভা উঠে আসবে তা বলাই বাহুল্য। যথার্থভাবেই বিশ্বকাপ নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।







