জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

inscript
৩ মিনিট
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলে মানুষ কি একা হয়ে যায়?

এই প্রশ্নটাই ওঠে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, দেশের শীর্ষ পদে থাকা মানুষের চারপাশে সবসময় মানুষের মেলা। কিন্তু কড়া নিরাপত্তা, প্রোটোকল আর অবিরাম ফাইলের ভিড়ে দিনশেষে তাঁদের নিজস্ব জগতটা ঠিক কতটা নিঃসঙ্গ হতে পারে, তার এক আশ্চর্য ছবি পাওয়া যায় সেই পোস্ট থেকে।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি। ছোটবেলা থেকে পড়া ওসামু তিজুকার বিখ্যাত মাঙ্গা কমিক ‘ফায়ারবার্ড’-এর পুনর্জন্মের ধারণায় বিশ্বাস করে তিনি ভেবেছিলেন, এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিও হয়তো জীবনের কোনো এক চক্রের অংশ। পরে যখন তাঁর কর্মীরা এসে কীটনাশক প্রয়োগ করে সেটিকে সরিয়ে দেন, তখন তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাকাইচির মনে হয়েছিল—চারপাশটা যেন কিছুটা ফাঁকা হয়ে গেল। আরশোলাটি মারা যাওয়ায় একটু বিষণ্ণতাও বোধ হলো।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনা ‘আরশোলার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নামক চটকদার শিরোনাম নিয়ে ঘুরছে। কিন্তু একটু এই বিষয় নিয়ে একটু ভাবলেই আমরা দেখতে পাব, এর মধ্যে আছে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।

টোকিওর যে সরকারি বাসভবনে তাকাইচি থাকেন, সেটি তৈরি হয়েছিল ১৯২০-এর দশকে। ১৯৩২ ও ১৯৩৬ সালের সেনা অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় জাপানে এই বাড়িটিকে নিয়ে বহু বছর ধরে নানা ভৌতিক গল্প প্রচলিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুরাগীরা যখন জানতে চান তিনি সেখানে কোনো ভূত দেখেছেন কি না, তাকাইচি হেসেই উত্তর দেন। তিনি জানান, ভূতের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি, তবে তিনি আরশোলা দেখেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

কিন্তু এই হালকা রসিকতার পিছনে ধরা পড়ে এক অন্যরকম জীবনযাপন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি এই বাসভবনকেই নিজের প্রধান কর্মক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছেন। ছুটির দিনেও তিনি সাধারণত বাইরে বেরোন না। তাঁর যুক্তি, বাইরে গেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের উপর বাড়তি চাপ পড়ে, তাই তিনি অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে নিজের বাসভবনেই ফাইল দেখা আর জরুরি বৈঠক করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

তবে এই কাজের পদ্ধতির কারণে দলের সহকর্মী ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

দলের শীর্ষ পদে আসার সময় তাকাইচি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, তিনি তথাকথিত ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’ বা কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের ধার ধারেন না। তাঁর মূল মনোযোগ শুধু কাজে।

বাস্তবেও তিনি দিনরাত এক করে কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর রাতের ঘুম নেমে এসেছে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টায়। কোনো রাতে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে সেটাকেই তিনি বড় সাফল্য মনে করেন। ভোররাত পর্যন্ত ফাইল পড়া, সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রস্তুতি নেওয়া, আর তার ফাঁকে নিজেই নিজের ঘর গুছিয়ে নেওয়া, বাসন মাজা কিংবা কাপড় সেলাই করা—এভাবেই কাটছে তাঁর সময়।

জাপানে যেখানে অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে বহু বছর ধরে তীব্র বিতর্ক চলছে এবং কর্মসংস্কারে জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এমন রুটিন নজর কেড়েছে সবার। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কাজের মান এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে সবসময় থাকেন মন্ত্রী, আমলা, সচিব কিংবা নিরাপত্তারক্ষীরা। কিন্তু এই যোগাযোগ পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রোটোকলনির্ভর। সেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলা বা নিছক আড্ডা দেওয়ার সুযোগ থাকে না বললেই চলে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, তাকাইচি আগের প্রধানমন্ত্রীদের তুলনায় মন্ত্রিসভার বৈঠক কম করছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎও কমেছে। তিনি নিজের বেশিরভাগ সময় বাসভবনেই কাটাচ্ছেন।

তাকাইচি আক্ষরিক অর্থেই যে আরশোলাটিকে বন্ধু ভেবেছিলেন, বিষয়টি তা নয়। কিন্তু একটানা কাজের মধ্যে থাকা এবং চারপাশের কঠোর নিয়মে ঘেরা পরিবেশে সেই ছোট্ট প্রাণীর নড়াচড়া হয়তো তাঁর কাছে এক মুহূর্তের জন্য বাইরের জীবন্ত দুনিয়ার একটি অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রাণীটি চলে যাওয়ার পর তাঁর ‘একটু একা’ লাগার অনুভূতি অতিরিক্ত কাজের চাপে সংকুচিত হয়ে আসা ব্যক্তিগত পরিসরের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

কাজ দায়িত্ব দেয়, মর্যাদা দেয়। কিন্তু কাজ যখন সব সম্পর্ক ও বিশ্রামের জায়গা দখল করে নেয়, তখন মানুষ ভিড়ের মাঝেও একাকিত্ব অনুভব করতে পারে।

সানায়ে তাকাইচির এই ছোট্ট ঘটনাটি তুলে ধরে, যে পদে বা যে দায়িত্বেই মানুষ থাকুক না কেন, কাজের পাশাপাশি একটু স্বস্তি, সামান্য বিশ্রাম আর সাধারণ মানবিক যোগাযোগের প্রয়োজন সবার জীবনেই থাকে।

লিখেছেন
inscript
inscript
15 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।

সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ

Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।