স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?
mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।
স্ট্রেস— ছোট্ট একটা শব্দ। প্রায় প্রতিদিনই নতুনভাবে শব্দটির সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটে। বলাই বাহুল্য, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যাওয়া এই ‘স্ট্রেস’কে ইদানীং নির্দ্বিধায় জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকির তকমা দেওয়া চলে। ২০১৭ সালে Lancet-এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভারতে প্রায় ১৯৭.৩ মিলিয়ন মানুষই স্ট্রেস এবং সমগোত্রীয় মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪.৩%।
একইভাবে ২০২৪ নাগাদ, অ্যাপোলো কর্তৃক প্রকাশিত, ‘হেলথ অব দ্য নেশন ২০২৪’ সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রবীণ অপেক্ষা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে স্ট্রেস বেশি। ১৮-৩০ বছর বয়সিদের প্রায় ৮০ ভাগই ‘ ‘সিগনিফিকেন্ট স্ট্রেস’-এ আক্রান্ত ।
ইদানীং একটু হেঁয়ালি করেই, দুশ্চিন্তাকে চিন্তারই একটি মননশীল প্রক্রিয়া বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চিন্তা করলে দুশ্চিন্তা আসবেই, এমন একটা ভাব। যদিও এই চিন্তার সংজ্ঞাটা বেশ জটিল। এবং সেটিতে যে বিরাট কিছু সংযোজিত, সমস্ত ক্ষেত্রে এমনটা না-ও হতে পারে। ধরুন, কোনো একটা অনুষ্ঠানে কোন রঙের জামা পরে গেলে ভালো এটা যদি সাধারণ একটা ‘চিন্তা’ হয়, তবে এর আনুষঙ্গিক ‘দুশ্চিন্তা’ খানিকটা এমন হতে পারে, ‘যদি ওই একই রঙের জামা আর পাঁচ জনও পরে যায়?’— বাহ্যিকদৃষ্টি বলছে, বিষয়টা ভীষণই সধারণ। সত্যিই কি তাই? কেউ কেউ ছোট একটা ঘটনাকেও এমন বড় ভেবে নেন, যা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এসবই রোজনামচা জীবনে আকছার আমাদের চোখে পড়ে। আসলে ‘চিন্তা-দুশ্চিন্তা’র মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেখা রয়েছে। একটা ভারসাম্য রয়েছে। এর তারতম্য হলেই চিন্তা ও দুশ্চিন্তার ফারাক ঘোচে। তৈরি হয় অহেতুক বিতৃষ্ণা, অবসাদ।
প্রসঙ্গত, বিতৃষ্ণা, দুর্ভাবনা কিংবা দুশ্চিন্তাকে প্রথমেই স্ট্রেস বা মানসিক অবসাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাটা ভুল। প্রতিটি মানুষকেই বিভিন্ন রকম চাপ মাথায় নিয়ে কাজ করতে হয়, এমন কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া ভার, যিনি নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করছেন। তবে, মাথায় চলা অবিশ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা, টুকি টাকি নিত্য চাপ আর স্ট্রেস নামক অসুখকে এক সরলরেখায় ফেলা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল।
মেডিক্যালে ‘স্ট্রেস’ শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট অসুখ-নিহিত অর্থ আছে। কোনো চাপ, দুশ্চিন্তাকে তখনই স্ট্রেস বলে গণ্য করা হয় যখন সেটি একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে। এবার এই নির্দিষ্ট সীমাটা যে প্রত্যেক মানুষের জন্য একরকম হবে তেমনটা নয়, তার জন্য প্রয়োজন ডাক্তারের পরামর্শ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Steps Per Day for Weight Loss: গবেষকদের মতে, ১ কেজি শরীরের চর্বি কমাতে প্রায় ৭,৭০০ ক্যালোরির ঘাটতি তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহে ১ কেজি ওজন কমাতে হলে প্রতিদিন প্রায় ১,১০০ ক্যালোরি অতিরিক্ত খরচ করতে হবে। শুধু হাঁটার মাধ্যমে এত বড়মাত্রার ক্যালোরি ঘাটতি তৈরি করা বেশ কঠিন।
বিজ্ঞানী জোনাথন এইচ. গিলিয়ার্ড, স্ট্রেস-এর কারণ কিংবা ভ্যারিয়েবলস গুলিকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন— ইনপুট (কর্মক্ষেত্র: কম সময়ে বেশি কাজ, নির্ভুল কিন্তু দ্রুতগতিতে কাজ, অতিরিক্ত কাজ, প্রতিকূল পরিবেশে কাজ বা তীব্র মানসিক আঘাত/অশান্তির মধ্যে কাজ), আউটপুট ( ব্যক্তির নিজস্ব অনুভব, তাঁর উপর অন্যদের আচরণ) এবং সব শেষে মন (মনের উপর প্রভাব)। স্ট্রেসে আমাদের জীবন তিন দিক থেকে প্রভাবিত হয়: মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক। অল্পেতেই মেজাজ হারানো, খিটখিটে ভাব, বিষাদ, অলসতা, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা ইত্যাদি। এর চূড়ান্ত পরিণতি যে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দেয়, তাও কারোর অজানা নয়।
চিকিৎসকদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি শরীরের মধ্যে দ্রুত প্রভাব ফেলে। হঠাৎ ঘুমের সমস্যা থেকে অনিদ্রা, অরুচি, খিদে কমে যাওয়া, হজমে গোলযোগ, শ্বাস নিতে অসুবিধা, হাত-পা কাঁপা কোনো কিছুই অস্বাভাবিক নয়।
এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে? উত্তর: মূলত দু’ভাবে। এক, এন্ডোক্রিন বা হরমোন সিস্টেম। দুই ,ইমিউন বা প্রতিরক্ষা সিস্টেম। এর মধ্যে, এন্ডোক্রিন বা হরমোন সিস্টেমের ক্ষেত্রে, বিশেষ উল্লেখ্য দুটি স্ট্রেস বিষয়ক হরমোন— HPA axis এবং HPG axis।
HPA axis সামগ্রিকভাবে আমাদের শরীরের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রক্রিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন: স্মৃতিশক্তি, নতুন কিছু শেখা, অনুভূতি, ব্যাথা অনুভব এমনকী ঘুমের মতো প্রয়োজনীয় নিত্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলি অনেকাংশে এই axis-এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর তারতম্য ঘটলে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় তার প্রভাব স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। এমনকী আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বুদ্ধি ক্ষমতারও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
HPG axis-এর সম্পর্ক মানুষের যৌনক্ষমতা, উদ্দীপনা, মানসিক সুখ-শান্তি ও কর্মদক্ষতা ইত্যাদির সঙ্গে। প্রসঙ্গত, এই axis অন্তর্গত আরও দুটি হরমোনের কথা উল্লেখ করা আবশ্যক। এগুলি: testosterone ও Di-hydro Epiandrosterone । যা আমাদের ভয়কে জয়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহস, দৃঢ়তা, স্মৃতিশক্তি এবং গৃহীত অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। সঙ্গত কারনেই, শরীরে এই দুই অক্ষরের (এক্সিস) ভারসাম্য বদলালে, অর্থাৎ স্ট্রেস এর কারণে এই হরমোনগুলি দেহে বেশি ক্ষরিত হলেই, আমাদের সাধারণ শারীরবৃত্তীয় কাজ গুলি বিঘ্নিত হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rheumatoid Arthritis Treatment: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব না হলেও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। DMARDs, বায়োলজিক ওষুধ, JAK inhibitor, স্টেরয়েড এবং ব্যথানাশক ওষুধের সাহায্যে অধিকাংশ রোগীর প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিগত দশ বছরে একাধিক গবেষণায় চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেছেন, যেমন সর্দি কাশি জ্বর বা যে কোনো ইনফেকশনে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় ঠিক তেমনি মানসিক অবসাদ বা স্ট্রেসেও শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে। এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারিও হতে পারে। ফলে দুর্বল শরীরে অন্য রোগের আস্ফালন ঘটার সুযোগও বাড়ে বহু অংশে।
UCL Centre for Longitudinal Studies-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, ইংল্যান্ডে ২০ বছরের কম, যাদের বয়স, সেই জেন-জিদের প্রায় ২২ শতাংশই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ২৮%। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রায় ২১% জেন-জি মাত্র ২৩ বছরেই ডিপ-ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়ছে।
WHO-এর ১৪৪টি দেশের সমীক্ষা বলছে, প্রায় ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ সর্বস্তরে, সর্ববয়সি ‘মেন্টাল হেলথ ডিসঅর্ডারে’ আক্রান্ত। প্রায় ৩১টি দেশের জনমত নিয়ে তৈরি ‘Ipsos World Mental Health Day Report 2024’-এর তথ্যে দেখা গিয়েছে, সেইসব দেশের মানুষদের প্রায় ৪৫%-ই মানসিক অবসাদকেই এই সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে করে।
২০২৫ সালের AXA Mind Health Report-এ ১৬টি দেশের সমীক্ষা বলছে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশই আপাতত মেন্টাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এবং নব প্রজন্মের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ ‘ওভার স্ট্রেসড’।
তবে স্ট্রেস কি সবসময়ই খারাপ! উত্তরটা তেমন নয়। বিজ্ঞানী Hans Selye স্ট্রেসকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন: ইউস্ট্রেস এবং ডিস্ট্রেস। ইউস্ট্রেস বা পজিটিভ স্ট্রেস আমাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। উদাহরণস্বরূপ, স্টেজে ওঠবার আগে যেকোনো শিল্পীই মানসিক চাপ অনুভব করেন, তা পরবর্তীতে তাদের কাজটিকে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অব্দি স্ট্রেস ও কর্মক্ষমতা সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে মনে রাখা ভীষণভাবে প্রয়োজনীয় যে সেই নির্দিষ্ট মাত্রার পর কিন্তু গল্পটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেক্ষেত্রে স্ট্রেস আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকে এবং ইউস্ট্রেস ক্রমশ ডিস্ট্রেস-এ বদলে যেতে থাকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।
প্রসঙ্গত, বিজ্ঞানী Yorkes ও Dodson একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে এটা প্রমাণ করেছেন, যেকোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অল্পবিস্তর মানসিক চাপ আমাদের সকলের জন্যই ইতিবাচক কারণ তা কর্মদক্ষতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।
পজিটিভ হেলথ/ হেলথ রিসার্ভ/ পজিটিভ সাইকোলজি (positive health / health reserve / positive psychology): পজিটিভ সাইকোলজি-র ধারণাটি বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই, মনোবিজ্ঞানের জগতে ক্রমশ জায়গা করে নিতে থাকে। এক্ষেত্রে সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞানকে কেবল অসুখ বা অসুবিধের প্রতিকার হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম হিসেবেও গণ্য করা হয়ে থাকে। পজিটিভ সাইকোলজি কেবল মানুষের খামতিগুলি দূর করার চেষ্টা না করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সদর্থক দিকগুলিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সহজভাবে পজিটিভ সাইকোলজি-র চর্চার মাধ্যমে আমরা সকলেই নিজের মানসিক ও আত্মিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারি। এক কথায়, পজিটিভ সাইকোলজি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত সদর্থক দিকগুলি দেখতে আমাদের সাহায্য করে, যা তিনভাবে আমাদের প্রভাবিত করতে পারে—
১। নিজস্ব সত্তার উন্নতিতে: ভালোলাগা, খুশি ও আশার মুহূর্তগুলিকে খুঁজে নিতে ও সেখান থেকে ভালোকিছু করার অনুপ্রেরণা পাওয়া।
২। ব্যক্তিসত্তার উন্নতিতে: নিজের ভালো গুণগুলি, যেমন- সাহস, সৃজনশীলতা, মৌলিক দিকগুলিকে চিনে নেওয়া।
৩। বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে দেখা: মানবতা ও জাতীয়তা বোধ, অপরকে সাহায্য করা, কর্মোদ্যোগী হয়ে নিজেকে বহু মানুষের সঙ্গে যুক্ত করা।
মানসিক চাপ সামলাতে মানুষ নানা ধরনের উপায় বেছে নেয়, আর মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলিকে বলা হয় কোপিং স্কিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এই কৌশল মূলত দুই ধরনের—ইমোশন ফোকাসড কোপিং এবং প্রবলেম ফোকাসড কোপিং। প্রথম ক্ষেত্রে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মানসিক অস্বস্তি কমানোর দিকে ঝোঁকে; যেমন- হঠাৎ স্ট্রেস এলে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে মূল সমস্যার সমাধান হয় না, বরং চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, প্রবলেম ফোকাসড কোপিংয়ের লক্ষ্য থাকে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করে তা কমানো বা দূর করা। অর্থাৎ, আবেগে ভেসে না গিয়ে কারণকে সমাধান করার চেষ্টা করলে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পজিটিভ সাইকোলজি, যা কেবল দুর্বলতা বা ঘাটতি দূর করার চেষ্টা করে না, বরং মানুষের শক্তি, সম্ভাবনা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষ নিজের ভালো লাগা, আশা, সাহস, সৃজনশীলতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে মানসিকভাবে আরও স্থিতিশীল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তি, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ—তিন ক্ষেত্রেই মানসিক ভারসাম্য গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
স্ট্রেস কমাতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু সহজ অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। নিয়মিত খেলাধুলা ও কায়িক পরিশ্রম শরীরে এন্ডরফিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মন ভালো রাখতে সহায়ক। যোগব্যায়ামও এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম আরেকটি জরুরি বিষয়, কারণ ঘুম কম হলে শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোই চাপের মধ্যে পড়ে। সাধারণভাবে দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম উপকারী বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি নিজের পছন্দের কাজ যেমন-গান, নাচ, বই পড়া বা অন্য কোনো শখে সময় দিলে মানসিক প্রশান্তি আসে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং নেশাজাতীয় অভ্যাস থেকে দূরে থাকাও স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগও মানসিক সহায়তার বড় উৎস হতে পারে। শেষ পর্যন্ত, চাপকে হারাতে হলে শুধু সময় নয়, দরকার সচেতন অভ্যাস আর ইতিবাচক মানসিকতা। এটাই সুস্থ জীবনের আসল চাবিকাঠি।






