পেলে থেকে মারাদোনা, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যে ভাবে মরণকামড় বসিয়েছেন তারকারা

FIFA World Cup 2022 : মেসি না মদরিচ, দুই ‘এলএম ১০’-এর মধ্যে আজ কে ছোঁবেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, সেটা দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

Aritra Som
৩ মিনিট
পেলে থেকে মারাদোনা, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যে ভাবে মরণকামড় বসিয়েছেন তারকারা

কেবলমাত্র ফুটবল নয়, বিশ্বের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে একটা কথা বারবার শোনা যায়। যে সেরা খেলোয়াড়, সে বড় মঞ্চে নিজেকে ঠিক মেলে ধরে। চরম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেখানে জেতাই আসল কথা, দলের কোনও পরিকল্পনা কাজে আসছে না। সেখানেই কিংবদন্তিরা নিজেদের জাত চেনান। একা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন তাঁরা। লড়াইয়ের এমন মুহূর্ত তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন ভক্তরাও। সব মিলিয়ে তৈরি হয় ইতিহাস, তৈরি হয় বীরগাথা, যা জড়িয়ে থাকে ক্রীড়া জগতের সঙ্গে।

ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ সেরকমই একটি মঞ্চ। বারবার এই মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরেছেন ফুটবলাররা। কেউ মুখ থুবড়ে পড়েছেন, কেউ হয়ে গিয়েছেন ‘ঈশ্বর’। ১৯৩০ সাল থেকে যে প্রবাহ শুরু হয়েছে, সেখানে যুক্ত হয়েছে একের পর এক ইতিহাস। মহাকাব্য লিখে চলেছেন মহান ফুটবল তারকারা। আর সেটা যদি সেমি ফাইনালের মতো মঞ্চ হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সোনালি ট্রফিটি ছোঁয়ার থেকে দু’কদম দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে দেন ফুটবলাররা।

সেই বিশ্বকাপেরই আরও এক সেমি ফাইনালের মুখোমুখি গোটা বিশ্ব। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের প্রথম সেমি ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া। একদিকে লিওনেল মেসি, অন্যদিকে লুকা মদরিচ। বিশ্ব ফুটবলের গত দেড় দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই ফুটবল তারকা। উল্লেখযোগ্য বিষয়, দু’জনেরই শেষ বিশ্বকাপ এটি। আর গত দু’টি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেও হেরে গিয়েছিল এই দু’টি দল। মেসি না মদরিচ, দুই ‘এলএম ১০’-এর মধ্যে আজ কে ছোঁবেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, সেটা দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

সেমি ফাইনালের মহাকাব্য লেখা শুরু হয়েছিল বহু আগে থেকেই। প্রথমেই চলে আসবে ১৯৫৮ সালের কথা। সে বছর বিশ্বকাপে মুখোমুখি ব্রাজিল এবং ফ্রান্স। সাম্বাদের দলে ছিলেন ১৭ বছরের এক কিশোর, এটাই ব্রাজিলের হয়ে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ। সেমি ফাইনালের মঞ্চে হঠাৎই জ্বলে উঠলেন সেই কিশোর। ম্যাচের ৫২ মিনিটে করলেন প্রথম গোলটি। তারপর ৬৪ এবং ৭৫ মিনিটে আরও দু’টি। মাত্র ২৩ মিনিটে ঝড় তুলে ব্রাজিলকে এগিয়ে দিলেন সেই কিশোর, নাম পেলে। সেই সেমি ফাইনালে ৫-২ ব্যবধানে জেতে ব্রাজিল। ১৭ বছরের পেলে সেই ম্যাচ থেকেই নিজের উত্থান স্পষ্ট করে দেন।

কিংবা মনে পড়বে ১৯৭০ বিশ্বকাপের কথা। যে সেমি ফাইনালকে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ম্যাচ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানির সেই ম্যাচে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ইতালি। একেবারে ৯০ মিনিটে ফিরতি গোল করেন কার্ল শ্নেলিঙ্গার। অতিরিক্ত সময়ে খেলার মোড় ঘুরে যায় পুরোপুরি। গোল, তারপর পাল্টা গোল – গোটা খেলাটাই হয়ে যায় টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। ইনজুরি টাইমে মোট পাঁচটি গোল হয়। ৪-৩ গোলে জেতে আজুরিরা।

চলে আসবে ১৯৭৪ সালের টোটাল ফুটবলের কথা। নেদারল্যান্ডের সামনে মহা শক্তিধর ব্রাজিল। কার্যত অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু উল্টোদিকের একটি মানুষ সমস্ত হিসেব বদলে দিলেন। তিনি যোহান ক্রুয়েফ। সেমি ফাইনালে ২-০ গোলে ডাচরা হারান ব্রাজিলকে। ক্রুয়েফের জাদুর সামনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় গোটা বিশ্ব। কিংবা ধরা যাক ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের পশ্চিম জার্মানি বনাম ফ্রান্স। ইতিহাসে প্রথমবার পেনাল্টি শ্যুট আউটের দিকে গড়ায় সেমি ফাইনাল। শেষমেশ সাডেন ডেথে গিয়ে ৫-৪ ব্যবধানে ফ্রান্সকে হারায় জার্মানি।

১৯৮৬ সালে এবারের মতোই সেমি ফাইনালে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। উল্টোদিকে ছিল বেলজিয়াম। আর তাদের সামনে ছিল ঝাঁকরা চুল, খাটো চেহারার এক ‘পাগল’। দিয়েগো আর্মান্ডো মারাদোনা। এই বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল ও ফাইনাল – দু’টি ম্যাচই তাঁর জন্য ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে দু’টি স্মরণীয় গোল করেন মারাদোনা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছয় ডিফেন্ডারের জঙ্গল ভেদ করে যেভাবে দুর্বার গতিতে গোল করেছিলেন তিনি, সেটা ইতিহাস হয়েই থেকে গিয়েছে। তারপর ফাইনালে ‘হ্যান্ড অফ গড’… ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ছিল মারাদোনাময়। অথবা ২০০২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল বনাম তুরস্ক (টার্কি)। সাম্বা সমর্থকদের হতাশ করেননি রোনাল্ডো। ৪৯ মিনিটের মাথায় তাঁর গোলেই ফাইনালের দরজা খোলে ব্রাজিলের। ওই বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর ছন্দ এক কথায় অপ্রতিরোধ্য ছিল। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বারবার সেই কথা বলেছেন।

শেষ করা যাক ২০১৪-র বিশ্বকাপ সেমি ফাইনাল দিয়ে। একটি ম্যাচে নেদারল্যান্ডের সামনে আর্জেন্টিনা, অন্য ম্যাচে জার্মানি বনাম ব্রাজিল। তার ওপর খেলা হচ্ছে ব্রাজিলের মাটিতেই। লাতিন আমেরিকার হুংকার চলবে স্টেডিয়ামে – এটাই ভেবেছিলেন সবাই। কিন্তু জার্মানি সবচেয়ে বড়ো অঘটন ও কলঙ্কের ইতিহাস উপহার দিল ব্রাজিলকে। ক্লোসে, সোয়াইনস্টাইগার, লাম, মুলারদের জার্মানি ৭-১ গোলে দুরমুশ করে নেইমারবিহীন ব্রাজিলকে। কার্যত শোকের পরিস্থিতি তৈরি হয় স্টেডিয়ামে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডও প্রায় আটকে দিয়েছিল লিওনেল মেসিকে। কিন্তু পেনাল্টি শ্যুট আউটে বদলে যায় পরিস্থিতি। রোমেরোর হাত বাঁচিয়ে দেয় আর্জেন্টিনাকে। টাই ব্রেকারে ডাচদের হারিয়ে ফাইনালে যান মেসিরা।

এবার ফের আরও দু’টো সেমি ফাইনাল। একদিকে মেসি-মদরিচ, অন্যদিকে এমবাপ্পে-হাকিমি। বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে সবসময় নিজেদের মেলে ধরেছেন মহান খেলোয়াড়রা। এখান থেকেই উড়ান শুরু পেলে, মারাদোনা, ক্রুয়েফদের। সেই দলে নাম লেখাবেন মেসি, এমবাপ্পেরা? তৈরি হবে নতুন কোনও ইতিহাস? লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।