পরিবেশ বাঁচাতে ১৪ বছরের কিশোরের অভিনব আবিষ্কার, ৩০ দিনে মাটিতে মিশে যায় প্লাস্টিকের বিকল্প ট্রে
Biodegradable food tray: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুপারমার্কেট বা স্থানীয় বাজারে ফল, শাকসবজি কিংবা কাঁচা মাংস প্যাকেজিংয়ের জন্য সাদা রঙের যেসব হালকা ট্রে ব্যবহার করা হয়, সেগুলির বড় অংশই এক্সপ্যান্ডেড পলিস্টাইরিন বা স্টাইরোফোম দিয়ে তৈরি। দেখতে সুন্দর এবং অত্যন্ত হালকা হওয়ায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের কাছেই এটি বেশ জনপ্রিয়।
লুকাস তাদাও সুগাহারা ওয়ার্নিক। ব্রাজিলের পারানা রাজ্যের কুরিতিবা শহরের বোম জেসুস সেন্ট্রো স্কুলের ১৪ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে একটি বিজ্ঞান গবেষণা ক্লাসে সে শোনে পরিবেশের উপর স্টাইরোফোম ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্রভাব ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তারপর থেকেই তার মাথায় চলতে থাকে এক ভাবনা— ব্যবহারের পর ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া এই ট্রেগুলি যদি মাটির সঙ্গে নিজে থেকেই মিশে যেতে পারত, তবে পরিবেশকে রক্ষা করা কতটা সহজ হতো!
তার এই ভাবনার নেপথ্যে বাস্তব কারণও ছিল যথেষ্ট। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুপারমার্কেট বা স্থানীয় বাজারে ফল, শাকসবজি কিংবা কাঁচা মাংস প্যাকেজিংয়ের জন্য সাদা রঙের যেসব হালকা ট্রে ব্যবহার করা হয়, সেগুলির বড় অংশই এক্সপ্যান্ডেড পলিস্টাইরিন বা স্টাইরোফোম দিয়ে তৈরি। দেখতে সুন্দর এবং অত্যন্ত হালকা হওয়ায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের কাছেই এটি বেশ জনপ্রিয়। তবে সুবিধা এটুকুই; ব্যবহারের পর ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলার পরই এর আসল প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় প্রকৃতিতে। পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরি এই কৃত্রিম উপাদান কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সহজে পচতে পারে না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পরিবেশে একটি স্টাইরোফোম ট্রে সম্পূর্ণ ক্ষয় হতে বা ভেঙে যেতে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ততদিনে এগুলি মাটি ও জলাশয়ে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত বর্জ্যের স্তূপ তৈরি করে এবং সূক্ষ্ম মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।
পরিস্থিতি কতটা সঙ্গীন, তা জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) তথ্যে স্পষ্ট। হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৪০ কোটি টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার সবচেয়ে বড় অংশটি জুড়ে রয়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য এমন সব প্যাকেজিং সামগ্রী। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের বড় বড় মাথা যখন প্লাস্টিকের এই ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছেন, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তাভাবনা থেকে এই ১৪ বছরের কিশোর এক অভাবনীয় সমাধান বের করে এনেছে। ফেলে দেওয়া কৃষি বর্জ্য আর গাছের শুকনো অংশকে কাজে লাগিয়ে সে বানিয়ে ফেলেছে সম্পূর্ণ পচনশীল বায়োডিগ্রেডেবল ফুড ট্রে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Plastic Recycling: বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ওয়ালেট কিংবা ঘরের সুন্দর প্ল্যান্টার! প্রথম শুনলে হয়তো একটু খটকা লাগতে পারে—‘ফেলে দেওয়া জঞ্জাল দিয়ে আবার ফ্যাশন?’ কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কণিকা আহুজা। দিল্লির বর্জ্যের পাহাড়কে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে, যার নাম ‘লিফাফা’ (Lifaffa)।

বাজার চলতি স্টাইরোফোম ট্রে
লুকাস প্রথম থেকেই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম কোনো উপাদানের পিছনে না ছুটে, স্থানীয় পরিবেশে জমে থাকা বর্জ্যের দিকে নজর দিয়েছিল। ব্রাজিল একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং সেখানে কাস্যাভা (এক ধরনের আলু বা মানকচু জাতীয় খাদ্যশস্য) প্রচুর পরিমাণে চাষ হয়। ভোজ্য অংশ থেকে ময়দা বা স্টার্চ তৈরির পর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলি থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার টন কাস্যাভার খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। খুব অল্প পরিমাণ খোসা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হলেও সিংহভাগই পরিবেশে বর্জ্য হিসেবে জমা হয়। অন্যদিকে, পারানা রাজ্যের নিজস্ব ঐতিহ্য পারানা পাইন বা আরাউকারিয়া গাছ। এই গাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুকনো ডাল ও পাতা ঝরে পড়ে, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘গ্রিম্পাস’ (grimpas) বলা হয়। স্থানীয় মানুষ এগুলিকে নিছক বাগানের জঞ্জাল মনে করে ফেলে দেয়। লুকাস লক্ষ্য করে, ক্যাসোভার ফেলনা খোসায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ফাইবার ও স্টার্চ, আর আরাউকারিয়ার শুকনো ডাল-পাতার মধ্যে রয়েছে শক্ত কাষ্ঠল ফাইবার। সে বুঝতে পারে, এই দুটি জৈব বর্জ্যকে সঠিকভাবে মেশাতে পারলে স্টাইরোফোমের মতো হালকা অথচ শক্ত একটি বিকল্প উপাদান তৈরি করা সম্ভব, যা টেকসই এবং চক্রাকার অর্থনীতির (circular economy) আদর্শ উদাহরণ।
তৈরির প্রক্রিয়াটিকে লুকাস একটি বৈজ্ঞানিক কিন্তু অত্যন্ত সহজ এক ফর্মুলেশনে নিয়ে এসেছে। প্রথমে ক্যাসোভার খোসা ও আরাউকারিয়ার শুকনো ডাল-পাতা ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। এরপর সেগুলিকে ছোট ছোট কণা ও মিহি গুঁড়োয় রূপান্তর করা হয়। তারপর এই দুই গুঁড়োর মিশ্রণে যোগ করা হয় সামান্য জল এবং ক্যাসোভার প্রাকৃতিক স্টার্চ। এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো, উপাদানগুলিকে একসঙ্গে আটকে রাখা বা জমাট বাঁধাতে সে কোনো পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিক, কৃত্রিম কেমিক্যাল বা সিন্থেটিক আঠা ব্যবহার করেনি। ক্যাসোভার নিজস্ব স্টার্চই এখানে প্রাকৃতিক আঠা হিসেবে কাজ করে। পুরো মিশ্রণটিকে হালকা তাপে ফুটিয়ে ছাঁচে রেখে প্রচণ্ড চাপে প্রেস করা হয় এবং তারপর শুকিয়ে নেওয়া হয়। ব্যস, তৈরি হয়ে যায় পরিবেশবান্ধব শক্ত বায়ো-ট্রে। লুকাস তার ল্যাবে এখন পর্যন্ত এমন ৩০টিরও বেশি সফল নমুনা তৈরি করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trashbot AI Robot: 'ট্র্যাশবট' (TRASHbot)—একটি বুদ্ধিমান চলন্ত রোবট, যা নিজে থেকেই চারপাশের ময়লা খুঁজে বের করে এবং তা আলাদা করতে পারে। মাহি শুধু একটি চলন্ত ডাস্টবিন বানাতে চায়নি, সে চেয়েছিল এটি যেন দেখতে জীবন্ত মনে হয়—ঠিক যেন পরিচ্ছন্নতার কাজে এক ভরসাযোগ্য সঙ্গী!

লুকাস তাদাও ও তার পরিবেশবান্ধব ট্রে
কার্যকারিতার দিক থেকেও লুকাসের এই ট্রে সাধারণ স্টাইরোফোমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং পরিবেশগত দিক থেকে দেখতে গেলে শতগুণ এগিয়ে। যে স্টাইরোফোম ৭০০ বছরেও মাটিতে মিশতে চায় না, লুকাসের পরীক্ষা অনুযায়ী তার তৈরি এই বায়ো-ট্রে উপযুক্ত আর্দ্রতা ও মাটির পরিবেশে রাখলে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে পুরোপুরি পচে যায়। তাপমাত্রা বা পরিবেশভেদে এই সময় খানিকটা কম-বেশি হলেও, খোলা বাতাসে ফেললেও সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে এটি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে মাটিকে উর্বর করে তোলে। ট্রেগুলি বাস্তবে খাবারের ভার সামলাতে পারবে কিনা তা যাচাই করতে নিজের হাতেই মেকানিক্যাল টেস্ট চালিয়েছে। সে দেখেছে, ভিতরের জিনিসপত্রের ওজনের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা, মোচড়ানোর প্রতিরোধ ক্ষমতা, প্রেশার টেস্ট এবং জল শোষণের হার—সবকটিতেই এটি চমৎকার ফল দিয়েছে।
লুকাসের এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে চলা কাস্যাভা ও অন্যান্য কৃষি বর্জ্যভিত্তিক প্যাকেজিং গবেষণার আন্তর্জাতিক ধারার সঙ্গেও হুবহু মিলে যায়। ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেমন UEL বা UFSCar-এ কাস্যাভা স্টার্চ, আখের ছিবড়া বা নারকেলের ফাইবার দিয়ে বায়োপ্লাস্টিক তৈরির গবেষণা চলছে। কিন্তু লুকাসের কৃতিত্ব এখানেই যে, নবম শ্রেণিতে পড়া একজন শিক্ষার্থী ল্যাব স্কেলে নিজের উদ্যোগে দুটি স্থানীয় ফেলনা বর্জ্যকে একত্রিত করে একটি বাস্তবে ব্যবহারের উপযোগী পণ্য তৈরি করে দেখিয়েছে। তার এই কাজ ইতিমধ্যে ব্রাজিলের ‘PUCPR সায়েন্স ফেয়ার’-সহ নানা বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং একটি বৈজ্ঞানিক সায়েন্টিফিক ইনিশিয়েশন সিম্পোজিয়ামের প্রসিডিংসে গবেষণাপত্র হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে।
অবশ্য এই আবিষ্কারকে স্কুল ল্যাব থেকে বের করে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক রূপ দিতে গেলে কিংবা বাজার থেকে স্টাইরোফোমকে একবারে বদলে ফেলতে হলে আরও কয়েকটি ধাপ পেরোনো বাকি। যেহেতু এটি প্রাকৃতিক উপাদান ও স্টার্চ দিয়ে তৈরি, তাই কাঁচা মাংসের জল বা ভেজা খাবারের আর্দ্রতায় ট্রেটি যেন নরম না হয়ে যায়, তার জন্য কোনো প্রাকৃতিক ওয়াটারপ্রুফ কোটিং কীভাবে দেওয়া যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। পাশাপাশি বাজারে ছাড়ার আগে ফুড-গ্রেড সেফটি পাওয়ার প্রক্রিয়াও বাকি রয়েছে।






