১৭ বছরের এক কিশোরীর আবিষ্কার! এবার রোবটই কুড়িয়ে নেবে রাস্তার ময়লা
Trashbot AI Robot: 'ট্র্যাশবট' (TRASHbot)—একটি বুদ্ধিমান চলন্ত রোবট, যা নিজে থেকেই চারপাশের ময়লা খুঁজে বের করে এবং তা আলাদা করতে পারে। মাহি শুধু একটি চলন্ত ডাস্টবিন বানাতে চায়নি, সে চেয়েছিল এটি যেন দেখতে জীবন্ত মনে হয়—ঠিক যেন পরিচ্ছন্নতার কাজে এক ভরসাযোগ্য সঙ্গী!
দিল্লির ‘সুন্দর নার্সারি’। চারপাশের সবুজ গাছপালা, চমৎকার হেরিটেজ পার্কের ইতিহাস আর সুন্দর পরিবেশ দেখতেই ২০২৩ সালে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে ঘুরতে যায় মাহি মালহানি। সবাই যখন পার্কের ইতিহাস আর সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত, ১৭ বছর বয়সি মাহির চোখ ঠিক তখনই বারবার আটকে যাচ্ছিল অন্য একটা দিকে। ডাস্টবিনের দিকে।
ডাস্টবিনগুলি একদম কাছেই রাখা ছিল, তাও চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্লাস্টিকের প্যাকেট, জলের বোতল আর খাবারের অবশিষ্টাংশ। ডাস্টবিন পর্যন্ত যাওয়ার অলসতা থেকেই যেন সবাই যেখানে খুশি ময়লা ফেলে দিচ্ছিল।
দিল্লির ময়ূর বিহারের অ্যামিটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী মাহি সেই দিন থেকেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে শুরু করে। সে চেয়েছিল প্রযুক্তির সাহায্যে এই অভ্যাসের পরিবর্তন করতে। যাতে শুধু মুখে 'পরিষ্কার রাখুন' না বলে আসলেই মানুষের সাহায্য করা যায়।
আমাদের দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাটা যে কতটা বিশাল, তা সরকারি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। ২০২৪ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে প্রতিদিন গড়ে ১,৭০,৩৩৮ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে অর্ধেকও ঠিকঠাক প্রক্রিয়াজাত বা রিসাইকেল করা সম্ভব হয় না। মাহি বুঝতে পেরেছিল, সমস্যাটা শুধু ময়লা ফেলার নয়; সমস্যাটা মানুষের আরাম আর দায়িত্ববোধের অভাবের। এমন কিছু একটা তৈরি করা দরকার যা মানুষের কাছে পৌঁছবে, যেন ময়লা ফেলাটা আরও সহজ আর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
ছোটবেলা থেকেই মাহি একটু অন্যরকম ছিল। যেকোনো ছোটখাটো গ্যাজেট দেখলেই সেটা নিয়ে মেতে থাকত, পুরনো ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র খুলে দেখত এবং কোডিং নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করত। পাইথন, সি++ কিংবা জাভাস্ক্রিপ্টের মতো কঠিন সব কোডিং ভাষা সে নিজে নিজেই রপ্ত করেছিল। তার ইচ্ছা ছিল একটাই—যন্ত্র কীভাবে কাজ করে তা বোঝা এবং তাদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানো।
এই ভাবনা থেকেই মাহি খসড়া স্কেচ তৈরি করা শুরু করে। ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে আইআইটি দিল্লির একটি রোবোটিক্স উদ্যোগ ‘র্যাঞ্চো ল্যাবস’-এর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। সেখান থেকে এবং নিজের স্কুলের কম্পিউটার মেন্টরদের কাছ থেকে সে প্রযুক্তিগত সাহায্য পায়। তবে পুরো প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেলটি মাহি একাই তৈরি করে।
আর এভাবেই জন্ম নেয় 'ট্র্যাশবট' (TRASHbot)—একটি বুদ্ধিমান চলন্ত রোবট, যা নিজে থেকেই চারপাশের ময়লা খুঁজে বের করে এবং তা আলাদা করতে পারে। মাহি শুধু একটি চলন্ত ডাস্টবিন বানাতে চায়নি, সে চেয়েছিল এটি যেন দেখতে জীবন্ত মনে হয়—ঠিক যেন পরিচ্ছন্নতার কাজে এক ভরসাযোগ্য সঙ্গী!
ট্র্যাশবট কীভাবে কাজ করে?
শুনতে খুব জটিল মনে হলেও ট্র্যাশবটের কাজ করার পদ্ধতি সাধারণ মানুষের জন্য ভীষণ সহজ। এটি মূলত দুটি বড় কাজ খুব নিখুঁতভাবে করতে পারে:
১. নিজের বুদ্ধিতে পথ চলা
রোবটটিকে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে ডানে-বামে বা সামনে-পিছনে চালনা করা যায়। আবার চাইলে একে ‘অটোমেটিক মোড’-এও ছেড়ে দেওয়া যায়। গাড়ির পার্কিং সেন্সরের মতো এর গায়ে লাগানো আছে ‘আল্ট্রাসনিক সেন্সর’। চলার পথে কোনো মানুষ, দেওয়াল বা টেবিল এলে এটি নিজে থেকেই তা বুঝতে পারে এবং প্রায় ৯৮% সফলতার সঙ্গে সেই বাধা এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
২. চোখ দিয়ে দেখে ময়লা আলাদা করা
এর ভিতরে বসানো আছে একটি ক্যামেরা এবং ‘YOLOv3’ নামের একটি এআই (AI) মডেল। রাস্তায় কোনো ময়লা দেখলে রোবটটি প্রথমে সেটির ছবি তোলে। তারপর নিজের সিস্টেমে থাকা হাজারো ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে সেটি ঠিক কী ধরনের ময়লা। পচনশীল বর্জ্য (যেমন খাবারের অংশ) নাকি অপচনশীল বর্জ্য (যেমন প্লাস্টিকের প্যাকেট)—তা চিনে নেওয়ার পর ভিতরের ছোট মোটরগুলি নির্দিষ্ট খোপটিকে একদিকে কাত করে দেয় এবং ময়লাটি ঠিকঠাক সঠিক বাক্সে গিয়ে পড়ে।
এই পুরো সিস্টেমটি পরিচালনা করে রোবটের ভিতরে থাকা দুটি ছোট কম্পিউটার। এর মধ্যে 'রাসবেরি পাই' (Raspberry Pi) কাজ করে রোবটের মাথা বা ব্রেন হিসেবে, যা ছবি দেখে ময়লা চেনার সিদ্ধান্ত নেয়। আর 'আর্ডুইনো ইউনো' (Arduino Uno) কাজ করে রোবটের পেশি হিসেবে, যা এর নড়াচড়া আর মোটরগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বের করে ট্র্যাশবটকে যখন বাস্তবের মুখোমুখি করা হলো, তখন আসল পরীক্ষা শুরু হলো। প্রথমে মাহির নিজের বাড়িতে এবং পরে স্কুলের ব্যস্ত ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ ব্রেকের সময়ে এর পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে এর এলইডি আলো আর সেন্সরগুলি শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
এরপর ট্র্যাশবটের ডিউটি পড়ে নয়ডার আবাসিক সোসাইটি এবং উদয়পুরের একটি পৌর সংস্থায়। ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে চলা এই পাইলট প্রজেক্টে বেশ ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছে। লোটাস বুলেভার্ড সোসাইটির জয়েন্ট সেক্রেটারি গীতা নাথ জানান যে, রোবটটি নিজে থেকেই আবর্জনা আলাদা করে ফেলায় তাদের দৈনন্দিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। সোসাইটির অনুষ্ঠানগুলিতে যেখানে খাবারের স্টল বসে, সেখানে এটি চমৎকার কাজ করেছে।
সাফল্য এবং প্রতিকূলতা জয়
কোনো বড় আবিষ্কারই বাধা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। ট্র্যাশবট তৈরির শুরুর দিকে ভোল্টেজ কমে যাওয়ার কারণে ভিতরের কম্পিউটার বারবার বন্ধ হয়ে যেত, ব্লুটুথ সংযোগে দেরি হতো। এমনকী প্রথম মডেলটি বানাতে খরচও হয়েছিল প্রায় ২০,০০০ টাকা। কিন্তু মাহি দমে যায়নি। সে নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে এর খরচ নামিয়ে এনেছে মাত্র ৭,০০০ টাকায়! মাহি জানায়, ভবিষ্যতে আরও উন্নতমানের পার্টস ব্যবহার করলে এই খরচ ৪,০০০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।
এই কঠোর পরিশ্রমেরই স্বীকৃতি মেলে যখন ২০২৫ সালে ‘ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াড’-এর ভার্চুয়াল চ্যাম্পিয়নশিপে মাহি দিল্লিতে প্রথম এবং সমগ্র ভারতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। পাশাপাশি, ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’-এ সারা দেশের সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি প্রজেক্টের মধ্যে সেরা ৫০টি এআই-ভিত্তিক প্রজেক্টের তালিকায় জায়গা করে নেয় ট্র্যাশবট।
স্বপ্নের পরিধি যেখানে আকাশছোঁয়া
একবার ফুল চার্জ দিলে ট্র্যাশবট প্রায় আড়াই ঘণ্টা টানা চলতে পারে। বর্তমানে এটি ময়লাকে দুটি ভাগে ভাগ করলেও, মাহির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো একে আরও উন্নত করে প্লাস্টিক, ধাতু, কাচ, পচনশীল ও অপচনশীল—এই ৫টি আলাদা ক্যাটাগরিতে রূপ দেওয়া। সঙ্গে যোগ হবে সোলার প্যানেল এবং দূর থেকে তদারকি করার জন্য ওয়াই-ফাই ও ক্লাউড সিস্টেম, যাতে প্রত্যন্ত গ্রাম বা রুক্ষ এলাকাতেও এটিকে সমানভাবে ব্যবহার করা যায়।
দিল্লির সুন্দর নার্সারির মাটিতে পড়ে থাকা সাধারণ কিছু প্লাস্টিকের বোতল আর চিপসের প্যাকেট দেখে যে ভাবনার শুরু হয়েছিল, আজ তা এক দারুণ সমাধানে রূপ নিয়েছে। ট্র্যাশবট শুধু রাস্তা থেকে ময়লাই কুড়াচ্ছে না, এটি চলন্ত আলো আর আকর্ষণীয় ডিজাইন দিয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে—পরিচ্ছন্নতা আসলে আমাদের নিজেদের অভ্যাস বদলানোর মাধ্যমেই শুরু হয়।






