আবর্জনার পাহাড় থেকে কোটি টাকার ব্যবসা! প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়েই সফল ফ্যাশনেবল ব্যাগের স্টার্টআপ
Plastic Recycling: বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ওয়ালেট কিংবা ঘরের সুন্দর প্ল্যান্টার! প্রথম শুনলে হয়তো একটু খটকা লাগতে পারে—‘ফেলে দেওয়া জঞ্জাল দিয়ে আবার ফ্যাশন?’ কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কণিকা আহুজা। দিল্লির বর্জ্যের পাহাড়কে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে, যার নাম ‘লিফাফা’ (Lifaffa)।
কণিকার শৈশবের একটি স্মৃতি আজও তাঁর মনে ভীষণ স্পষ্ট। তখন তিনি ছোট। একদিন একটি ল্যান্ডফিলে (যেখানে শহরের সমস্ত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়) গিয়ে তিনি এক বিশাল স্তূপ দেখতে পান। শিশু মনে ভেবেছিলেন, ওটা বুঝি ছোট্ট কোনো পাহাড়! সেখানে আশেপাশের আরও অনেক শিশুদের খেলাধুলো করতে দেখে তিনিও চড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের লোকেরা তাঁকে বারণ করেন। বলা হয়, ওখানে গেলে বড় কোনো অসুখ করবে। সেই থেকে বর্জ্যের ভয়াবহতা তাঁর মনে দাগ কেটে যায়।
কণিকা এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে কেনাকাটা বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয় রোধে ভীষণ কড়াকড়ি ছিল। পরিবারের এই পরিবেশই তাঁর মনে ‘পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনীতি’ বা ‘সার্কুলার ইকোনমি’-র বীজ বুনে দেয়।
১৯৯৮ সালে কণিকার বাবা-মা, অনিতা ও শলভ আহুজা 'কনজারভ ইন্ডিয়া' (Conserve India) নামে একটি এনজিও গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য ছিল শক্তির সঠিক ব্যবহার এবং দিল্লির প্লাস্টিক সমস্যার সমাধান করা। তাঁরা বহু চেষ্টার পর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে এক বিশেষ প্রযুক্তিতে মজবুত কাপড় তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
তবে কণিকার বাবা একেবারেই চাননি যে মেয়ে এই কঠিন কাজ করুক। তাই বাবার কথামতো কণিকা মণিপাল থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন এবং দিল্লির বিখ্যাত এসআরসিসি (SRCC) থেকে এমবিএ শেষ করেন। এরপর ২০১৫ সালে কাজ শুরু করেন একটি মার্কেট রিসার্চ ফার্মে। কিন্তু বাঁধাধরা করপোরেট জীবন তাঁকে খুব বেশি দিন আটকে রাখতে পারেনি। সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে ২০১৬ সালে তিনি নিজের চাকরি ছেড়ে বাবা-মায়ের এনজিওতেই যোগ দেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
‘লিফাফা’-র জন্ম
এনজিও-তে যোগ দেওয়ার পর কণিকা অনুধাবন করলেন, তাঁদের কাজটি কেমন যেন শুধুই একটি ‘এক্সপোর্ট হাউস’-এর রূপ নিচ্ছে। আসল সামাজিক পরিবর্তন আনাই ছিল মূল উদ্দেশ্য, যা কোথাও একটা হারিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কাজ কিছুদিন বন্ধ রেখে সবটা নতুন করে ভাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে জন্ম নেয় একটি নতুন ব্র্যান্ড—‘লিফাফা’।
উদ্দেশ্য ছিল খুব স্পষ্ট—একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (যেমন চিপসের প্যাকেট, পলিমার ব্যাগ), যা কেউ কুড়াতেও চায় না, সেগুলিকে আবার ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। সেই প্লাস্টিক প্রসেস করে তৈরি হতে শুরু করল নানারকম ব্যাগ, ওয়ালেট, ল্যাপটপ কভার, টেবিল ম্যাট ইত্যাদি। এই উদ্যোগ এতটাই নজর কাড়ে যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘অশোকা’ (Ashoka) থেকে শুরুর দিকেই বড় অর্থসাহায্য পায় লিফাফা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
একই বছর (২০১৭ সালে) ল্যাকমে ফ্যাশন উইক-এ নিজেদের তৈরি পণ্য তুলে ধরার সুযোগ পায় লিফাফা। এই প্ল্যাটফর্মটি ব্র্যান্ডটির সাফল্যকে এক লাফে অনেক দূর এগিয়ে দেয়।
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে রোজগার
লিফাফা শুধু পরিবেশ বাঁচাচ্ছেন না, বাঁচাচ্ছেন শত শত মানুষের সংসারও। বর্তমানে এই ব্র্যান্ডটি প্রতিদিনের জঞ্জাল কুড়ান কর্মী, আফগান শরণার্থী নারী এবং স্থানীয় কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ দিচ্ছে। এখন প্রায় ২০০ জন বর্জ্য সংগ্রাহক ও ৩০০ জন কারিগর এই উদ্যোগে যুক্ত। এর মধ্যে বড় অংশই নারী। তাঁরা প্রতি মাসে প্রায় ৮,০০০ টাকা উপার্জন করছেন, যা তাঁদের সংসারে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে। এখন আর শুধু প্লাস্টিক নয়, ফেলে দেওয়া পুরনো টায়ার দিয়ে চমৎকার সব প্ল্যান্টার বা গয়না এবং প্রথাগত হস্তশিল্পের ছোঁয়া দিয়ে নতুন নতুন ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি হচ্ছে।
প্রতি বছর লিফাফা প্রায় ১২ টন (১২,০০০ কেজি) ফেলে দেওয়া প্লাস্টিককে নতুন জীবন দিচ্ছে। যে প্লাস্টিক ল্যান্ডফিলে জমা হয়ে মাটি ও বাতাস বিষাক্ত করত, তা এখন রূপ নিচ্ছে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে। গত অর্থবর্ষে ব্র্যান্ডটি ১ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করেছে এবং দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে।
যে কোনো বড় কাজের পথই সহজ হয় না। কণিকার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের চিন্তা ভাবনা বদলানো। অনেকেই প্রশ্ন তুলতেন—‘আবর্জনা দিয়ে তৈরি জিনিসের এত দাম দেব কেন?’ কোভিডের সময় ব্যবসা ও উৎপাদনে বড় ধাক্কা আসে। ছোট স্কেলে কাজ করার জন্য বড় বড় আন্তর্জাতিক পরিবেশবান্ধব সার্টিফিকেট নেওয়া বেশ ব্যয়বহুল ছিল। কিন্তু কণিকা দমে যাননি। সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকদের সরাসরি বোঝানোর পথ বেছে নেন। চামড়ার বদলে পরিবেশবান্ধব ও ভিগান (Vegan) বিকল্প হিসেবে লিফাফা খুব দ্রুত ক্রেতাদের মন জয় করে নেয়।
আজ কণিকা আহুজা শুধু লিফাফাতেই থেমে নেই। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘প্লাস্টিস্কুল’ (Plastiskul)-এর সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং বিশ্বমঞ্চে (যেমন TEDx)-এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলছেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ফ্যাশন মানেই শুধু সেটা তৈরি করতে নতুন করে বর্জ্য উৎপাদন করা নয়। আমাদের চারিপাধে উপস্থিত বর্জ্য থেকেও ফ্যাশন সম্ভব; সঠিক চিন্তাভাবনা থাকলে ফ্যাশন হতে পারে পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।






