অস্তমিত জ্যোতির্ময়

Sanjoy Mukhopadhyay about Jyotirmoy Datta: নানাভাবেই কলকাতা বিপন্ন, তার মধ্যে আর একটি নতুন সংকট তৈরি হলো যে, আমাদের বুদ্ধিজগত থেকে একটি নক্ষত্র খসে গেল।

Sanjay Mukherjee
৪ মিনিট
অস্তমিত জ্যোতির্ময়

জ্যোতির্ময় দত্তের বিহনে কলকাতা আরও একটু গরিব হয়ে পড়ল। এমন নয় যে, তিনি উত্তম শিক্ষাবিদ অথবা স্মরণীয় সাহিত্যিক ছিলেন, কিন্তু বাঙালি মেধার মধ্যে যে একটা বহু বিস্তৃত দীপ্তি ছিল একদা, তার শেষ প্রমাণ সম্ভবত জ্যোতির্ময় দত্ত। আমরা পঞ্চাশ দশকের এই চিরযুবাকে কীভাবে চিনতাম? একসময় বাঙালি ইংরেজি লিখতে জানত। পঞ্চাশ দশকের সেই ইংরেজি লেখার চতুর ও দীপ্ত প্রমাণ জ্যোতির্ময় দত্ত ও প্রীতিশ নন্দী। বস্তুত, জ্যোতির্ময় দত্তের ইংরেজি পারিপাট্যের মুগ্ধ ভক্ত ছিলেন বুদ্ধদেব বসু এবং শোনা যায়, তিনি এই অনতি কিশোর ও উদ্ধত যুবাকে কিঞ্চিৎ সস্নেহ প্রশ্রয়ই দিতেন এই ভেবে যে, তাঁর রচনাবলি ইংরেজিতে সু-অনুদিত হতে পারে জ্যোতির্ময়ের সৌজন্যে।

বাঙালি এখন জ্যোতির্ময় দত্তকে জানে জরুরি অবস্থা ও 'কলকাতা' পত্রিকার সেই বিখ্যাত সংখ্যার জন্য। আসলে এখনকার সাংবাদিককে যেরকম ন্যুব্জ শরীর ও মনে দেখায়, যেরকম চারিদিক বাঁচিয়ে সাবধানী কথা বলার জন্য সে বিশ্বখ্যাত হয়ে গেছে, জ্যোতির্ময় দত্ত তেমন ছিলেন না। তিনি এইরকম অসমসাহসী ছিলেন বলেই আমাদের সংস্কৃতিতে যা সম্পূর্ণভাবে বেখাপ্পা, তেমনভাবেই সমুদ্র অভিযানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এবং সেই সমুদ্র অভিযানের জন্য যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বা পোশাক— সব জ্যোতির্ময় জোগাড় করে সুদূর শ্রীলঙ্কার দিকে ধাবিত হন আধুনিক রামচন্দ্রের মতো। শ্রীলঙ্কায় নৌযাত্রা আয়োজন করেছিলেন। আসলে জীবনে সত্যিই তিনি মনে করতেন,

পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়, পথের দু'ধারে আছে মোর দেবালয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আত্মগোপনের সময়ও ব্যাগে ভালো চা নিয়ে ঘুরতেন জ্যোতিদা

Jyotirmoy Datta: জ্যোতিদা খুব চা-ভক্ত ছিলেন। মানে খুব ভালো চা। জ্যোতিদা যখন আত্মগোপন করে বেড়াচ্ছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, জ্যোতিদাকে পুলিশ খুঁজছে, তখন জ্যোতিদা ব্যাগের মধ্যে ভালো চা নিয়ে ঘুরতেন।

তিনি 'কলকাতা'র মতো একটি সাময়িক পত্রিকাতে এমন কিছু বিস্ফোরক দ্রব্য গুঁজে দেন যে জরুরি অবস্থায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় তাঁকে বিপজ্জনক মনে করেন এবং তিনি রাজরোষে দগ্ধ হন। এটা বাঙালি সাংবাদিকতার রাজটিকার মুহূর্ত।

জ্যোতির্ময় দত্ত সবাইকে নাম ধরে ডাকতেন, এমনকি শ্বশুরমশাই বুদ্ধদেব বসুকেও বুদ্ধদেব বলতেন। সবাইকে আপনি করে কথা বলতেন। জ্যোতির্ময় দত্তের আত্মজীবনীর নাম ছিল 'আমার নাইবা হলো পাড়ে যাওয়া', এই নাম দেখেই তো একজন মানুষের ব্যাপ্তির নিশানা পাওয়া যায়। তিনি নাবিক, অভিযানই কেন্দ্রীয় সত্য, পরিণতির পরিধি তাঁর জন্য নয়। জ্যোতির্ময় দীর্ঘদিন 'স্টেটসম্যান' পত্রিকায় কলাম লিখতেন এবং সেই কলামগুলো— তাঁর লেখাগুলি সুপাঠ্য হতো। আমার মনে আছে উত্তম কুমার অভিনীত 'আমি সে ও সখা'র একটি রিভিউ একবার জ্যোতির্ময় দত্ত লিখেছিলেন, ওরকম স্বাদু এবং তীক্ষ্ণ রসিকতা আমি আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালির খবরের কাগজের পাতায় পড়িনি। জ্যোতির্ময় এভাবেই এমন কলমচির ভূমিকায়ও চোখ-কান খোলা রাখা এক সপ্রতিভ মানুষ, তিনি কলকাতার মতো এক শহর থেকেও সারা বিশ্বের খোঁজখবর রাখেন তেমন ছিলেন। জীবনানন্দ দাশের অনুপম ত্রিবেদী আর কি!

বস্তুত জ্যোতির্ময় দত্তই পঞ্চাশের দশকে আমাদের কাছে আমেরিকার খোলা জানালা। তিনি যে আইওয়া থেকে আসতেন, তিনি যে আমেরিকায় কিছুদিন রেসিডেন্সি করেছেন—এই সমস্ত সূত্রেই আমরা বারোজ, কেরুয়াক প্রমুখ সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। অর্থাৎ কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কাছে, সবান্ধব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে তিনি ছিলেন এক বিকল্পহীন কম্পাস, যার সূত্রে আমরা জানতাম পাশ্চাত্য কোন দিকে চলেছে। সেই গুগলবিহীন পৃথিবীতে জ্যোতির্ময়ের মতো মেধাবী যুবকরাই কলকাতার মতো তৃতীয় বিশ্বে এক ধরনের আলোকিত পাশ্চাত্যের ধারণা আনতেন। এবং সেই ধারণার মধ্যে যে অস্থিরতা, যে চঞ্চলতা পাশ্চাত্য দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, বিশেষত মার্কিন দুনিয়াকে, তার প্রমাণ থাকত।

জ্যোতির্ময়ের চলে যাওয়া সেদিক থেকে খুবই ক্ষতিকারক কারণ তিনি নীরব হয়ে এসেছিলেন, তবুও তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার বাইরে যে একটা বিশ্ব ছিল, সেই বিশ্বের ইঙ্গিত আমরা মাঝে মাঝে পেতাম। আমার সৌভাগ্য যে তাঁর কন্যা কঙ্কাবতী এবং তাঁর জামাতা কল্যাণ সরকারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল এবং এই কল্যাণ সরকারই 'ঋত্বিকতন্ত্র'-এর  জন্য আমাকে প্ররোচিত করেছিলেন। ছেপেওছিলেন। আজ জ্যোতির্ময় নেই। নানাভাবেই কলকাতা বিপন্ন, তার মধ্যে আর একটি নতুন সংকট তৈরি হলো যে, আমাদের বুদ্ধিজগত থেকে একটি নক্ষত্র খসে গেল। সেই নক্ষত্র শুধুমাত্র সাহিত্যের বিষয় ছিল না। এই যে কাউন্টার কালচার শব্দটা—প্রতিসংস্কৃতি, হার্লেমের কালো গান—এই সমস্তই জ্যোতির্ময় দত্ত 'কলকাতা'য় সঞ্চারিত করেন। তাঁর বাংলা খুব ঝকঝকে, স্মার্ট, দুরন্ত, কিন্তু তার ইংরেজি নির্বিকল্প। আমার মনে পড়ে না যে গত দশ বছরের মধ্যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি কাগজে বা অন্য ইংরেজি সাময়িকীতে জ্যোতির্ময় দত্তের মতো একজন দুরন্ত অশ্বারোহী শব্দগুলিকে পরিচালনা করেছেন। তাঁর বিদায় আমাদের প্রজন্মের পক্ষে নিশ্চয়ই বড় ক্ষতি। পঞ্চাশ দশকের দিকে তাকালে মনে হয় একে একে নিভেছে দেউটি। এখন তো ইতিহাস প্রায় শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

লিখেছেন
Sanjay Mukherjee
Sanjay Mukherjee
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।