অস্তমিত জ্যোতির্ময়

Sanjoy Mukhopadhyay about Jyotirmoy Datta: নানাভাবেই কলকাতা বিপন্ন, তার মধ্যে আর একটি নতুন সংকট তৈরি হলো যে, আমাদের বুদ্ধিজগত থেকে একটি নক্ষত্র খসে গেল।

অস্তমিত জ্যোতির্ময়

জ্যোতির্ময় দত্তের বিহনে কলকাতা আরও একটু গরিব হয়ে পড়ল। এমন নয় যে, তিনি উত্তম শিক্ষাবিদ অথবা স্মরণীয় সাহিত্যিক ছিলেন, কিন্তু বাঙালি মেধার মধ্যে যে একটা বহু বিস্তৃত দীপ্তি ছিল একদা, তার শেষ প্রমাণ সম্ভবত জ্যোতির্ময় দত্ত। আমরা পঞ্চাশ দশকের এই চিরযুবাকে কীভাবে চিনতাম? একসময় বাঙালি ইংরেজি লিখতে জানত। পঞ্চাশ দশকের সেই ইংরেজি লেখার চতুর ও দীপ্ত প্রমাণ জ্যোতির্ময় দত্ত ও প্রীতিশ নন্দী। বস্তুত, জ্যোতির্ময় দত্তের ইংরেজি পারিপাট্যের মুগ্ধ ভক্ত ছিলেন বুদ্ধদেব বসু এবং শোনা যায়, তিনি এই অনতি কিশোর ও উদ্ধত যুবাকে কিঞ্চিৎ সস্নেহ প্রশ্রয়ই দিতেন এই ভেবে যে, তাঁর রচনাবলি ইংরেজিতে সু-অনুদিত হতে পারে জ্যোতির্ময়ের সৌজন্যে।

বাঙালি এখন জ্যোতির্ময় দত্তকে জানে জরুরি অবস্থা ও 'কলকাতা' পত্রিকার সেই বিখ্যাত সংখ্যার জন্য। আসলে এখনকার সাংবাদিককে যেরকম ন্যুব্জ শরীর ও মনে দেখায়, যেরকম চারিদিক বাঁচিয়ে সাবধানী কথা বলার জন্য সে বিশ্বখ্যাত হয়ে গেছে, জ্যোতির্ময় দত্ত তেমন ছিলেন না। তিনি এইরকম অসমসাহসী ছিলেন বলেই আমাদের সংস্কৃতিতে যা সম্পূর্ণভাবে বেখাপ্পা, তেমনভাবেই সমুদ্র অভিযানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এবং সেই সমুদ্র অভিযানের জন্য যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বা পোশাক— সব জ্যোতির্ময় জোগাড় করে সুদূর শ্রীলঙ্কার দিকে ধাবিত হন আধুনিক রামচন্দ্রের মতো। শ্রীলঙ্কায় নৌযাত্রা আয়োজন করেছিলেন। আসলে জীবনে সত্যিই তিনি মনে করতেন,

পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়, পথের দু'ধারে আছে মোর দেবালয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আত্মগোপনের সময়ও ব্যাগে ভালো চা নিয়ে ঘুরতেন জ্যোতিদা

Jyotirmoy Datta: জ্যোতিদা খুব চা-ভক্ত ছিলেন। মানে খুব ভালো চা। জ্যোতিদা যখন আত্মগোপন করে বেড়াচ্ছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, জ্যোতিদাকে পুলিশ খুঁজছে, তখন জ্যোতিদা ব্যাগের মধ্যে ভালো চা নিয়ে ঘুরতেন।

তিনি 'কলকাতা'র মতো একটি সাময়িক পত্রিকাতে এমন কিছু বিস্ফোরক দ্রব্য গুঁজে দেন যে জরুরি অবস্থায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় তাঁকে বিপজ্জনক মনে করেন এবং তিনি রাজরোষে দগ্ধ হন। এটা বাঙালি সাংবাদিকতার রাজটিকার মুহূর্ত।

জ্যোতির্ময় দত্ত সবাইকে নাম ধরে ডাকতেন, এমনকি শ্বশুরমশাই বুদ্ধদেব বসুকেও বুদ্ধদেব বলতেন। সবাইকে আপনি করে কথা বলতেন। জ্যোতির্ময় দত্তের আত্মজীবনীর নাম ছিল 'আমার নাইবা হলো পাড়ে যাওয়া', এই নাম দেখেই তো একজন মানুষের ব্যাপ্তির নিশানা পাওয়া যায়। তিনি নাবিক, অভিযানই কেন্দ্রীয় সত্য, পরিণতির পরিধি তাঁর জন্য নয়। জ্যোতির্ময় দীর্ঘদিন 'স্টেটসম্যান' পত্রিকায় কলাম লিখতেন এবং সেই কলামগুলো— তাঁর লেখাগুলি সুপাঠ্য হতো। আমার মনে আছে উত্তম কুমার অভিনীত 'আমি সে ও সখা'র একটি রিভিউ একবার জ্যোতির্ময় দত্ত লিখেছিলেন, ওরকম স্বাদু এবং তীক্ষ্ণ রসিকতা আমি আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালির খবরের কাগজের পাতায় পড়িনি। জ্যোতির্ময় এভাবেই এমন কলমচির ভূমিকায়ও চোখ-কান খোলা রাখা এক সপ্রতিভ মানুষ, তিনি কলকাতার মতো এক শহর থেকেও সারা বিশ্বের খোঁজখবর রাখেন তেমন ছিলেন। জীবনানন্দ দাশের অনুপম ত্রিবেদী আর কি!

বস্তুত জ্যোতির্ময় দত্তই পঞ্চাশের দশকে আমাদের কাছে আমেরিকার খোলা জানালা। তিনি যে আইওয়া থেকে আসতেন, তিনি যে আমেরিকায় কিছুদিন রেসিডেন্সি করেছেন—এই সমস্ত সূত্রেই আমরা বারোজ, কেরুয়াক প্রমুখ সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। অর্থাৎ কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কাছে, সবান্ধব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে তিনি ছিলেন এক বিকল্পহীন কম্পাস, যার সূত্রে আমরা জানতাম পাশ্চাত্য কোন দিকে চলেছে। সেই গুগলবিহীন পৃথিবীতে জ্যোতির্ময়ের মতো মেধাবী যুবকরাই কলকাতার মতো তৃতীয় বিশ্বে এক ধরনের আলোকিত পাশ্চাত্যের ধারণা আনতেন। এবং সেই ধারণার মধ্যে যে অস্থিরতা, যে চঞ্চলতা পাশ্চাত্য দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, বিশেষত মার্কিন দুনিয়াকে, তার প্রমাণ থাকত।

জ্যোতির্ময়ের চলে যাওয়া সেদিক থেকে খুবই ক্ষতিকারক কারণ তিনি নীরব হয়ে এসেছিলেন, তবুও তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার বাইরে যে একটা বিশ্ব ছিল, সেই বিশ্বের ইঙ্গিত আমরা মাঝে মাঝে পেতাম। আমার সৌভাগ্য যে তাঁর কন্যা কঙ্কাবতী এবং তাঁর জামাতা কল্যাণ সরকারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল এবং এই কল্যাণ সরকারই 'ঋত্বিকতন্ত্র'-এর  জন্য আমাকে প্ররোচিত করেছিলেন। ছেপেওছিলেন। আজ জ্যোতির্ময় নেই। নানাভাবেই কলকাতা বিপন্ন, তার মধ্যে আর একটি নতুন সংকট তৈরি হলো যে, আমাদের বুদ্ধিজগত থেকে একটি নক্ষত্র খসে গেল। সেই নক্ষত্র শুধুমাত্র সাহিত্যের বিষয় ছিল না। এই যে কাউন্টার কালচার শব্দটা—প্রতিসংস্কৃতি, হার্লেমের কালো গান—এই সমস্তই জ্যোতির্ময় দত্ত 'কলকাতা'য় সঞ্চারিত করেন। তাঁর বাংলা খুব ঝকঝকে, স্মার্ট, দুরন্ত, কিন্তু তার ইংরেজি নির্বিকল্প। আমার মনে পড়ে না যে গত দশ বছরের মধ্যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি কাগজে বা অন্য ইংরেজি সাময়িকীতে জ্যোতির্ময় দত্তের মতো একজন দুরন্ত অশ্বারোহী শব্দগুলিকে পরিচালনা করেছেন। তাঁর বিদায় আমাদের প্রজন্মের পক্ষে নিশ্চয়ই বড় ক্ষতি। পঞ্চাশ দশকের দিকে তাকালে মনে হয় একে একে নিভেছে দেউটি। এখন তো ইতিহাস প্রায় শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।