চোলাই নয়, সরকারি লাইসেন্সের বাংলা মদই মৃত্যু পরোয়ানা! দায় কার?

মদ বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ফীত হয়েছে রাজ-কোষাগার। পাশাপাশি ঢালাও মদ বিক্রির লাইসেন্সের পরিণতি যে কী মারাত্মক হতে পারে, তা ভালোই দেখেছে রাজ্য।

tiasa gupta
৩ মিনিট
চোলাই নয়, সরকারি লাইসেন্সের বাংলা মদই মৃত্যু পরোয়ানা! দায় কার?

বর্ধমানে বিষমদ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনার রেশ এখন কাটেনি। এরই মধ্যে তোলপাড় ফেলল হাওড়া। এখানেও বিষ মদের বলি কয়েকজন। সংখ্যাটা যাই হোক, প্রশ্ন হলো, এতগুলো মানুষের জীবনের দাম কীভাবে দেবে সরকার? মন্ত্রী তো পুলিশের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন। তাতেই কি আদৌ হাত ধুয়ে ফেলা যায়? সরকার মদ বিক্রির লাইসেন্স দিচ্ছে পুরোদমে। যতদূর জানা যাচ্ছে, মৃতরা চোলাই খাননি, খেয়েছেন দেশি মদ। এই মদ তো সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। তাহলে এতগুলো মৃত্যুর দায় কার? তদন্ত নিছক দায় এড়ানো নয় তো? তদন্ত প্রহসনে পরিণত হবে না তো? এই নজির যে বিরল, তা বলা যায় না। আপাতত এই ঘটনা নিয়ে উত্তাল রাজ্য, তাই কি আবগারি দফতরকে আসরে নামিয়ে তদন্তের প্রয়োজন ছিল?

কী হয়েছে হাওড়ায়

১৯ জুলাই সন্ধ্যায় হাওড়ায় অনেকে মদ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর ২০ জুলাই থেকে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যা। বেশ কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাওড়া ও কলকাতার একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তাঁদের। রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ রায় এই প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশ অন্যায় করলে ছাড় পাবে না।

হাওড়ার মালিপাঁচঘড়ার ঘটনা। মদ্যপান করে অসুস্থ হয়ে এখানকার অনেকে চিকিৎসাধীন। মৃতরা প্রত্যেকেই মালিপাঁচঘড়ার গজানন বস্তির বাসিন্দা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ এবং রাজ্য আবগারি দফতর জানতে পেরেছে, বাংলা মদ খেয়েই স্থানীয় বেশ কয়েকজনের শরীরে বিষক্রিয়া হয়। মদের নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছে আবগারি দফতর। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দেহগুলি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, হাওড়ার গজানন বস্তির বেশ কিছু বাসিন্দা প্রতাপ কর্মকার বলে স্থানীয় এক ব্যক্তির ঠেক থেকে মদ কিনে খেতেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ জানালেও এই বেআইনি ঠেকের বিরুদ্ধে কোনও ব‍্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। ২ দিন ধরে মদ খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। ২০ জুলাই সকাল থেকে পরিস্থিতি খারাপ হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ থাকলেও তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী অরূপ রায়।

আসরে আবগারি দফতর

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মধ্যবিত্তর পকেটে টান, বাজারের কোথায় কতটা কোপ বসাচ্ছে জিএসটি?

এখনও পর্যন্ত এই জিএসটি তালিকায় সবথেকে বেশি কর বৃদ্ধি হওয়া যে জিনিসটি রয়েছে, সেটি হলো চেক বই এবং তার খুচরা পাতা। এতদিন পর্যন্ত এই জিনিসটি কর ছাড়ের আওতায় আসত।

এই ঘটনার পর তৎপর হয়েছে রাজ্য আবগারি দফতর। যে ব্যাচের মদ্যপান করে এই ঘটনা বলে অভিযোগ, সেই ব্যাচের সমস্ত উৎপাদিত বাংলা মদ আপাতত বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। যে দোকান থেকে এই মদ কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই দোকানের পাশাপাশি এলাকার আরও কয়েকটি দোকানের বাংলা মদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কতগুলি মানুষের জীবনের বিনিময়ে আবগারি দফতরের এই তৎপরতা? মদ বিক্রি থেকে আদায় হওয়া শুল্ক সরকারকে লাভের মুখ দেখিয়েছে। তাই কি এই তৎপরতা? যে মানুষগুলো বিষমদের বলি হলেন, তাঁদের জীবনের দাম এতে মিলবে?

রাজ্যের আবগারি আয়

মদ বিক্রির নীতি পরিবর্তন করে রাজ্যে রেকর্ড আয়। আবগারি শুল্কবাবদ রাজ্য কোষাগারে ঢুকেছে ২৩,০০০ কোটি টাকা। রাজ্য সরকার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জুন মাস থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ২৩,০০০ কোটি টাকার আবগারি শুল্ক আদায় হয়েছে। যেখানে ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষে আদায় হয়েছিল ১১,২৩৬ কোটি টাকা। আবগারি দফতর সূত্রের খবর, মোট বিক্রির মাত্র ৩৫ শতাংশ হল দেশি মদ।

নতুন আবগারি নীতি চালু করে রাজ্য। চোরাকারবার রুখতে এটা করা হয়েছিল। এর ফল এসেছে হাতেনাতে। কমানো হয়েছিল বিলিতি মদের দাম। আর তাতেই এই রেকর্ড আয়!

সর্বকালীন রেকর্ড, গড়ে গত ১৮ মাসে মদ বিক্রির আবগারি শুল্কবাবদ রাজ্য কোষাগারে আসে ২৩ হাজার কোটি টাকা। যা একেবারেই নজিরবিহীন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। নতুন আবগারি নীতি ও পরবর্তীকালে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে সমতা বজায় রেখে মদের দাম নতুন করে ঠিক করতেই বেড়েছে আবগারি শুল্ক। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মদের দাম কমেছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমদানি করা মদের দাম, দিল্লির থেকে কম এই রাজ্যে। এতে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে মদ চোরাচালানের মাত্রা কমে গেছে কয়েক গুণ। সরকারি কোষাগারে সাফল্যের সঙ্গে ঢুকছে মদ বিক্রির টাকা।

ঢালাও লাইসেন্স

মদ বিক্রিতে রেকর্ড আয় রাজ্যের। তাই মদ বিক্রিতে দেওয়া হয়েছে ঢালাও লাইসেন্স। আর এটাই এখন গ্রামে গ্রামে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির মহিলারা পথে নেমেছেন।

সরকার দিচ্ছে ঢালাও মদের লাইসেন্স। সেক্ষেত্রে বাড়ছে মদের দোকান। আর সেই মদের দোকান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মদ্যপের সংখ্যা। সেই কারণ কোথাও কোথাও পথে নামেন গ্রামবাসীরা। কিছুদিন আগে খবরের শিরোনামে এসেছিল কাঁথির রসুলপুর। সেখানেই রাস্তা অবরোধ করেন এলাকার মহিলারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার মদের ঢালাও লাইসেন্স দিয়েছে। যে কারণে বেড়েছে মদ্যপ-দের উপদ্রব।

এর আগে মালদাতেও একই ধরনের ঘটনা সামনে আসে। মদের দোকানে লম্বা লাইন। দিনের পর দিন এভাবে কষ্টার্জিত অর্থ শুধুমাত্র নেশায় ব্যয় হচ্ছে দেখে সেখানেও হাতে লাঠি তুলে নেন মহিলারা। সরকারি লাইসেন্স প্রাপ্ত মদের দোকান নিজেরাই ভাঙতে শুরু করেন।

বলা বাহুল্য, মদ বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ফীত হয়েছে রাজ-কোষাগার। পাশাপাশি, ঢালাও মদ বিক্রির লাইসেন্সের পরিণতি যে কী মারাত্মক হতে পারে, তা ভালোই দেখেছে রাজ্য। এরপর যাতে রাজ্যে মদ বিক্রি মুখ থুবড়ে না পড়ে, তাই কি তড়িঘড়ি হাওড়ায় আসরে আবগারি দফতর?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।