ওয়াও মোমো অগ্নিকাণ্ড: মৃত ১৬, দায় কার?

Wow Momo Incident: দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ঘটনাস্থলে পৌঁছতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় নিয়েছেন, এই বিলম্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনও যাননি। সরকারি ব্যস্ততার কারণ থাকতে পারে, কিন্তু জনমানসে এই অনুপস্থিতি দাগ কেটেছে। কারণ একই সময়ে শহর বইমেলার আলোয় ব্যস্ত, মঞ্চে ছবি তোলা চলছে— এই বৈপরীত্য মানুষ চোখ এড়িয়ে যেতে দেয় না।

inscript
৩ মিনিট
ওয়াও মোমো অগ্নিকাণ্ড:  মৃত ১৬, দায় কার?

সংখ্যাটা ১৬। ১৬টা মৃতদেহ। ১৬টা পরিবারের ভালোবাসা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ— একমুহূর্তে থেমে গেল। ২৬ জানুয়ারি ভোররাতে, কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ওয়াও মোমোর একটি গুদামে আগুন লাগে। জায়গাটি ব্যবহার হত খাদ্য প্রস্তুতি, প্যাকেজিং এবং স্টোরেজের কাজে। সেখানে কর্মরত ছিলেন বহু শ্রমিক। কেউ রাতের শিফটে, কেউ কাজ শেষে বিশ্রামে।

প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, আগুন ছড়াতে সময় লাগেনি। বেরোনোর রাস্তা ছিল না বললেই চলে। প্রধান দরজা খোলা যায়নি, এমন অভিযোগও উঠেছে। বিকল্প জরুরি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না বলেই উদ্ধারকর্মীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। এর ফলে ভেতরে থাকা মানুষগুলি ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন। দমকলের একের পর এক ইঞ্জিন পৌঁছয়। ভেতরে অনেক দাহ্য জিনিস ছিল, জায়গা ছিল খুব সঙ্কীর্ণ, আর জিনিসপত্র এলোমেলোভাবে রাখা ছিল তাই আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পরও পুরো আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে না। ততক্ষণে পরিষ্কার এটি আর শুধু আগুন নেভানোর ঘটনা নয়, এটি লাশ উদ্ধারের প্রস্তুতি। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। আরও অনেকে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন। পরিচয় নিশ্চিত করতেও অনেকটা সময় লেগেছে।

ঘটনাস্থল ঘুরে দমকল ও প্রশাসনের আধিকারিকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে গুরুতর অভিযোগ। গুদামটি নাকি যথাযথ অগ্নি-নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই চলছিল। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত জরুরি বেরোনোর পথ— এসবের ঘাটতির কথা সামনে আসে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন অনিবার্য: এতদিন তদারকি কোথায় ছিল?

ফায়ার লাইসেন্স, বিল্ডিং সেফটি, শ্রমিকদের কাজ ও থাকার পরিবেশ— এসব কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল? নিয়মিত পরিদর্শন কি হয়নি, নাকি হয়েছিল কিন্তু কার্যকর হয়নি? এই প্রশ্নগুলি নতুন নয়, প্রতিবারই কোনো বড় দুর্ঘটনার পর উঠে আসে, কিছুদিন থাকে, তারপর চাপা পড়ে যায়।

পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ দায়ের করেছেন। ক্ষতিপূরণ, বিচার, দায়ীদের শাস্তির দাবি উঠেছে। কিন্তু আগেও দেখা গিয়েছে, এই দাবিগুলি প্রায়শই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায়।

ঘটনার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিরোধীরা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। শাসকপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে কঠোর পদক্ষেপের। কিন্তু এর আগেও এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বারবার। মানুষ দেখছে, এমন ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটছে। জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই নজরদারি এতদিন কোথায় ছিল?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১০ মিনিটের প্রতিশ্রুতি বাতিল: গিগ কর্মীদের সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট?

Gig worker: ডেলিভারি কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এবং তাদের আন্দোলনের ধরন পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, অ্যাপগুলো কর্মীদের উপর যে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, তা কেবল একটি নিয়ম বদলে দূর হওয়ার নয়।

২০১১ সাল থেকে রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার। ২০১০ সাল থেকে কলকাতা পুরসভা। ২০০৯ থেকে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভা। ২০০৮ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ। এত বছরের ধারাবাহিক প্রশাসনিক উপস্থিতির পরেও যদি একটি গুদাম এভাবে চলতে পারে, তবে তদারকি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ঘটনাস্থলে পৌঁছতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় নিয়েছেন, এই বিলম্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনও যাননি। সরকারি ব্যস্ততার কারণ থাকতে পারে, কিন্তু জনমানসে এই অনুপস্থিতি দাগ কেটেছে। কারণ একই সময়ে শহর বইমেলার আলোয় ব্যস্ত, মঞ্চে ছবি তোলা চলছে— এই বৈপরীত্য মানুষ চোখ এড়িয়ে যেতে দেয় না। এই ১৬ জনের প্রত্যেকের পরিবার আছে। তারা জানতেন, কলকাতায় কাজ আছে। কিন্তু জানতেন না, নিরাপত্তা নেই। প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি উন্নয়নকে এতটাই প্রাধান্য দিচ্ছি যে মানুষের নিরাপত্তা গৌণ হয়ে যাচ্ছে?

ওয়াও মোমোর নাম এখন আলোচনায়। ব্র্যান্ডটির বড় ব্র্যান্ড হিসেবে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু বিস্তারের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিকাঠামো তাল মিলিয়েছে কি? বড় ব্র্যান্ড মানেই বড় দায়িত্ব। শ্রমিক নিরাপত্তা, লাইসেন্স, নিয়ম মেনে গুদাম পরিচালনা— এসব আনুষ্ঠানিকতা নয়, জীবন-মরণের প্রশ্ন। এই অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নটাই সামনে এনে দিয়েছে, শুধু একটি সংস্থাকে নয়, পুরো শিল্পক্ষেত্রকে।

গুদামের মালিককে আটক করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। নিরাপত্তা গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। অগ্নি-নিরাপত্তা নীতি আরও কড়াভাবে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অতীতের ঘটনাগুলি দেখলেই বোঝা যাবে, আগুন নিভে যায়, সংবাদ শিরোনামও বদলে যায়, আবার সব আগের মতো হয়ে যায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?