মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা
Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?
অসমের চা-বাগান এলাকার বহু শিশুর কাছে স্কুলে যাওয়া কিংবা বই পড়ার সুযোগ পাওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবারের আর্থিক সমস্যা, বাবা-মায়ের দীর্ঘক্ষণ কাজ, নানা কারণে স্কুলে ভর্তি হতে না পারা কিংবা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া-এমন অনেক বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। এই পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য বই পড়ার সুযোগ তৈরি করতে এগিয়ে এসেছেন অনিন্দিতা গগৈ। ২০২০ সালে মাত্র ১০০টি বই নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি ছোট লাইব্রেরি। ছয় বছরে সেই উদ্যোগের পরিধি বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। এখন তিনটি লাইব্রেরি মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে অনিন্দিতার পরিবার বিনিয়োগ করেছে ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি। তবে তাঁর কাছে লাইব্রেরি মানে শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, শিশুদের নতুন কিছু শেখার এবং নিজেদের আগ্রহ খুঁজে নেওয়ার সুযোগও।
২০২০ সালে সমাজসেবা নিয়ে পড়াশোনা করার সময় অসমের চরাইদেও জেলার চা-বাগান এলাকায় গিয়েছিলেন অনিন্দিতা। সেখানেই তাঁর চোখে পড়ে শিশুদের পড়াশোনার নানা সমস্যা। অনেকেই কখনও স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়নি। কেউ স্কুলে গেলেও মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। দশম শ্রেণির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মাত্র চারজন পড়ুয়া। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো যেমন জরুরি, তেমনই পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি করাও দরকার। সেই ভাবনা থেকেই অসমের ভোগবাড়ি গ্রামে নিজের বাড়ির আবাসিক এলাকায় শুরু করেন ‘পথৰ পুথিভঁৰাল’। অসমিয়া এই নামের অর্থ পথের লাইব্রেরি। শুরুতে সেখানে বই ছিল মাত্র ১০০টি। সেই বই দিয়েই শিশুদের জন্য একটি পড়ার জায়গা তৈরি করার চেষ্টা শুরু হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Famous Books Lost Completely : বহু পুরনো সেই বইগুলির মূল পাণ্ডুলিপিই এখন আর পাওয়া যাবে না। এরকমই কিছু বইয়ের দিকে একবার ফিরে দেখা যাক…
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দিতার উদ্যোগও বড় হতে থাকে। বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তিনটি লাইব্রেরি-পথৰ পুথিভঁৰাল, টোট্টো-চান চিলড্রেনস লাইব্রেরি এবং টোট্টো-চান কমিউনিটি লাইব্রেরি। সব মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। নথিভুক্ত সংস্থা টোট্টো-চান কমিউনিটি লাইব্রেরির মাধ্যমে এই কাজ পরিচালনা করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ১০০ জন শিশু সেখানে আসে। কেউ বই পড়ে, কেউ নতুন কিছু শেখে, আবার কেউ অংশ নেয় বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে। এ ভাবেই লাইব্রেরিটি ধীরে ধীরে শিশুদের শেখার একটি পরিচিত জায়গা হয়ে উঠেছে।
শুধু বই পড়লেই যে সব শিশু সহজে শিখতে পারবে, এমনটা মনে করেন না অনিন্দিতা। কেউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে, কেউ খেলতে খেলতে নতুন বিষয় বুঝতে পারে, আবার কারও আগ্রহ হাতের কাজের দিকে। তাই লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ধরনের কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিশুরা ছবি আঁকা, হস্তশিল্প, ধাঁধা ও বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতে পারে। অসমের ঐতিহ্যবাহী মুখোশ তৈরি বা ‘মুখা’, মণ্ডল আর্ট, ওয়ারলি আর্ট এবং লিপ্পন আর্টের মতো কাজও শেখানো হয়। বিভিন্ন বিষয় সহজে বোঝানোর জন্য সিনেমা দেখানো এবং ক্লাসের ব্যবস্থাও রয়েছে। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের পছন্দের কাজ শেখার সুযোগ পায় শিশুরা। লাইব্রেরিতে ১৯৪৭ সাল থেকে প্রকাশিত অসমিয়া পত্রিকাও সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। ফলে পুরনো দিনের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Longest time to write Books : সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে লেখা হয়েছিল বিখ্যাত কিছু বই, এক নজরে দেখে নিন তালিকা...
এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পিছনে অনীন্দিতার পরিবারের বড় অবদান রয়েছে। গত ছয় বছরে লাইব্রেরির কাজে পরিবারের বিনিয়োগ ৪০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়েছে। তাঁর মা ও বাবা দু'জনেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। লাইব্রেরির জন্য আলাদা ভবন তৈরি করতে তাঁর মা অবসরকালীন প্রাপ্তি থেকে ১৪ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। তাঁর বাবাও এই কাজে সহযোগিতা করেছেন। বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য উপযুক্ত জায়গা তৈরি করা এবং নিয়মিত শিক্ষামূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া—সব ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়। পরিবারের সাহায্যে সেই কাজ আরও বড় পরিসরে চালিয়ে যেতে পারছেন অনিন্দিতা।
শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনের দিকেও নজর দিয়েছে তাঁর সংস্থা। সেখানে একটি ‘ক্লথ হাউস’ রয়েছে, যেখানে দান করা পুরনো পোশাক প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু ও তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী একটি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাতেও সাহায্য করা হয়েছে। অনাথ শিশুদের সরকারি মাসিক বৃত্তি পেতে সহযোগিতা করা হয়। এ ছাড়া সর্বশিক্ষা অভিযানের অধীনে লামিচুক এলাকায় একটি শিক্ষা স্বেচ্ছাসেবক কেন্দ্র চালানো হয়। যেসব শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি বা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের আবার শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়াই এই কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Reading List : মাঝে-মাঝে ভাবি হয়তো-বা আমার নিজের বিপন্নতার সময়ে যার কাছে আশ্রয় পেয়েছি সেই বইটাই অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে আমার জীবনে। তা হলেই বা ক্ষতি কী। পড়া তো আমার একার।
তবে এত কাজের পরেও চা-বাগানের প্রতিটি শিশুর কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। অনিন্দিতার মতে, চা-শ্রমিক পরিবারের সব শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসতে আরও প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। পরিবারের আর্থিক অনটন এবং বাবা-মায়ের দীর্ঘক্ষণ কাজের কারণে অনেক সময় শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সংসার চালানোর চাপের মধ্যে শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করাও সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না।
মাত্র ১০০টি বই নিয়ে শুরু হওয়া লাইব্রেরি আজ প্রায় ১০ হাজার বইয়ের সংগ্রহে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অনিন্দিতার কাছে এই কাজের সাফল্য শুধু বইয়ের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। আরও কত শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারল, কতজন মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার বদলে তা চালিয়ে যেতে পারল, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লাইব্রেরির কাজের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন অনিন্দিতা।






