স্কুলশিক্ষিকার যকের ধন! অনুব্রত-কন্যার সম্পত্তির হিসেব চোখ কপালে তুলবেই
একজন স্কুলশিক্ষিকার এই পাহাড়প্রমাণ সম্পত্তি যে তাঁকে আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন সম্পত্তি করার দায়ে কাঠগড়ায় তুলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

এ যেন কোনও ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্য।
পার্থ-পর্বে এমনটাই মনে হয়েছিল রাজ্যবাসীর। পার্থ চট্টোপাধ্যায় সিবিআইয়ের কবলে আসতেই তাঁর ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার। (অনেকে আবার ফেসবুকে তামাশা করে 'নায়ক' ছবিতে উত্তমকুমারের টাকার ঢিবিতে ডুবে যাওয়ার ছবিও তুলে ধরে ধরেন)। হবে না-ই বা কেন! সিনেমার থ্রিল এতে ছিল পুরোদস্তুর। সেই পর্বেই পরতে পরতে ছিল রহস্য-রোমাঞ্চ। তা হজম হওয়ার আগেই আসরে অনুব্রত। অনেকটা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের মতো টিভিতে চোখ রেখে রাজ্যবাসী গোগ্রাসে গিলছেন দুর্নীতির সিরিজ। সিরিজই বটে! পরের পর এপিসোডে চমক! কারণ পার্থ অধ্যায় নিভে যাওয়ার আগে জ্বলে উঠল অনুব্রত কাণ্ড। রাজ্য জ্বলছে। দুর্নীতির আগুনে জ্বলছে। প্রতিদিন নিত্যনতুন চমক। আগেই সিবিআইয়ের স্ক্যানারে এসেছেন অনুব্রত-কন্যা সুকন্যা। এবার তাঁর নামে থাকা সম্পত্তির হদিশ পেয়ে খোদ তদন্তকারী অফিসারদের চোখ কপালে।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা-সূত্রে খবর, ২০১১ সালে বোলপুর এলাকায় পৃথক ৬টি জমি কেনেন সুকন্যা। ২টি জমি বোলপুরের মকরমপুর মৌজায়। ৪টি জমি বোলপুর ব্লকের বল্লভপুর মৌজায়। জমি কেনার টাকার উৎস কী? তদন্ত শুরু করেছেন সিবিআইয়ের গোয়েন্দারা। অনুব্রত মন্ডলের মেয়ে সুকন্যার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও নজর রয়েছে গোয়েন্দাদের। বাবার সঙ্গে বেশ কয়েকটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট আছে। তদন্তে নেমে জানতে পেরেছেন অফিসাররা। এছাড়া তাঁর নিজের নামে থাকা অ্যাকাউন্টগুলি পরীক্ষা করছেন গোয়েন্দারা। তাঁর নিজের নামে কত সম্পত্তি রয়েছে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এবার সিবিআইয়ের স্ক্যানারে আবদুল লতিফ। অনুব্রতর বেনামি সম্পত্তির হদিশ পেতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তি। কে এই লতিফ?
গরু পাচারের টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টেও জমা পড়ত বলে তদন্তকারীদের অনুমান। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। অনুব্রতর কর্মচারী দেহরক্ষী-সহ ১২ থেকে ১৫ জনের ওপর ইতিমধ্যে নজর রেখেছে সিবিআই।
সূত্রের খবর, চিনার পার্কেও অনুব্রতর বেশ কয়েকজন পরিচিত রয়েছে, তাঁদের ওপরেও নজর রয়েছে তদন্তকারীদের। অনুব্রতর ঘনিষ্ঠদের নামে সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। গরু পাচার মামলায় ইতিমধ্যেই সিবিআই ৮০ পাতার সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট তৈরি করেছে। তাতে ৪৫টি সম্পত্তির উল্লেখ রয়েছে। জানা যাচ্ছে, এই সম্পত্তিগুলির বেশ কিছু অনুব্রতর নিজের নামে রয়েছে। কিছু সম্পত্তি অনুব্রত ও সায়গলের নামে, কিছু সম্পত্তি অনুব্রতর পরিবারের সদস্যদের নামে আছে রয়েছে। এবার সেই নামগুলির একটি তালিকা তৈরি করেছেন তদন্তকারীরা।
সূত্রের খবর, সিবিআই মোট ৪৫টি সম্পত্তির খোঁজ পেযেছে, যা অনুব্রত মন্ডলের পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর মেয়ের নামে অনেক সম্পত্তি রয়েছে। কিছু জমি সায়গল হোসেনের নামে রয়েছে। এছাড়াও অনুব্রতর আত্মীয়দের নামে রয়েছে গুদামঘর, রাইস মিল। বোলপুরের বিখ্যাত ব্যোমভোলে রাইস মিলও অনুব্রতর আত্মীয়ের নামে। সূত্রের খবর, বাপ-বেটির বেনামে বহু সম্পত্তি রয়েছে। এ-ব্যাপারে তাঁদের সাহায্য করছেন আত্মীয় ও পরিচিতরা। জানা গিয়েছে অনুব্রতর মেয়ের নামে রয়েছে ৬ কোটি টাকার সম্পত্তি। ফলে সিবিআইয়ের শ্যেনদৃষ্টি এখন সুকন্যার দিকে।
সূত্রের খবর, বীরভূমের গয়েশপুর মৌজায় অনুব্রত মন্ডলের স্ত্রী ছবি মন্ডলের নামে ৫টি সম্পত্তির হদিশ পাওয়া গেছে। তাঁর স্ত্রী প্রয়াত। ফলে সেইসব সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে সুকন্যার কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এছাড়া অনুব্রত-কন্যা সুকন্যার নামে রাজারহাট নিউটাউনে ২টি ফ্ল্যাটের হদিশ মিলেছে। ইতিমধ্যে অনুব্রতর মেয়ের নামে ২টি কোম্পানির সন্ধান পেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অফিসাররা। উল্লেখ্য, যার একটি কোম্পানির ডিরেক্টর পদে রয়েছেন বোলপুর পুরসভার কর্মী বিদ্যুৎবরণ গায়েন। সিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২টি কোম্পানি অনুব্রত মন্ডলের চাল মিলের ঠিকানায় রেজিস্টার্ড। আসলে এই দুই কোম্পানির আলাদা কোনও অফিস নেই। বাবার চাল মিলকে ব্যবহার করে খোলা হয়েছিল এই দুই কোম্পানি। অনুব্রতর আয়ের উৎস কী, তা জানার জন্য লাগাতার তল্লাশি চালাচ্ছে সিবিআই। সুকন্যার দুই কোম্পানির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মণীশ খোঠারিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে সিবিআই। পাশাপাশি কোঠারি ছাড়াও এসবিআই ব্যাঙ্ক কর্মীদের পূর্বপল্লির গেস্টহাউজে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
সুকন্যার টাকার উৎস কী? কোথা থেকে এসেছে ওই টাকা? কীভাবে ওই টাকার আইটি ফাইল করা হয়েছে? কী কাগজপত্র দেখানো হয়েছে? তার সবটাই এখন আতসকাচের তলায়। সূত্রের খবর, অনুব্রত মন্ডলের একাধিক নথিতে মেয়ের নাম পাওয়া গেছে। সুকন্যার নামে বহু সম্পত্তি রয়েছে বলে অনুমান সিবিআইয়ের। তদন্তকারী সংস্থার নজরে তাই সুকন্যা মণ্ডলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। সিবিআইয়ের হাত থেকে এখন রেহাই পাচ্ছেন না সুকন্যা। সুকন্যা পেশায় স্কুলশিক্ষক। সেখানেও গরমিল! অভিযোগ, টেট পাশ না করেই চাকরি পেয়েছিলেন সুকন্যা। বাড়ি বসে সই করে বেতন তুলতেন অনুব্রতর মেয়ে। অভিযোগ, টেট পাশ না করেই প্রাথমিক স্কুলে চাকরি পেয়েছিলেন সুকন্যা। শুধু তাই নয়, কোনওদিন স্কুলে যাননি তিনি, অধিকাংশ দিন হাজিরা খাতায় সই করতেন বাড়িতে বসেই। আবেদনকারীদের দাবি, ২০১২ সালে বাড়ির পাশেই কালিকাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পান অনুব্রত মন্ডলের মেয়ে সুকন্যা। কিন্তু সেবার টেট পাশ করতে পারেননি তিনি। টেট পাশ না করেও নিয়োগ পেয়ে যান অনুব্রতর মেয়ে। শুধু তাই নয়, ওই সময় প্রাথমিকে চাকরি পেয়েছেন অনুব্রতর পরিবারের আরও ৫ সদস্য। তাঁরা হলেন, অনুব্রতর ভাই সুমিত মন্ডল, অর্ক দত্ত, সাত্যকি মণ্ডল, কস্তুরী চৌধুরী ও সুজিত বাগদি। অভিযোগ এই বেনিয়ম যখন চলছে, তখন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতির পদে রয়েছেন অনুব্রতর ভাগ্নে রাজা ঘোষ।
একজন স্কুলশিক্ষিকার এই পাহাড়প্রমাণ সম্পত্তি যে তাঁকে আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন সম্পত্তি করার দায়ে কাঠগড়ায় তুলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। সিবিআই এর মধ্যে প্রমাণ পেয়েছে, রোজগার তাঁর আয়ের উৎস হতে পারে না। তাহলে অনুব্রতর গরু পাচার কাণ্ড আর তাতে সুকন্যার যোগ- এই নিয়ে এখন যে আরও কাঁটাছেঁড়া চলবে, তা বলাই বাহুল্য। অর্থাৎ সিবিআইয়ের র্যাডারের নিচে সুকন্যা।






