ভাতা বাড়ায় সন্তুষ্ট বিশেষ ভাবে সক্ষমরা?

specially abled citizens West Bengal: ভাতা বেড়েছে, কিন্তু বিশেষভাবে সক্ষম মানুষরা কি সত্যিই সন্তুষ্ট? বাড়তি অর্থে কি তাঁদের চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও সহায়ক যন্ত্রপাতির খরচ মেটানো সম্ভব? কী বলছেন বিশেষ ভাবে সক্ষম নাগরিকরা?

Sonia Sarban
৩ মিনিট
ভাতা বাড়ায় সন্তুষ্ট বিশেষ ভাবে সক্ষমরা?

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনই প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই আবহে রাজ্য সরকারের একাধিক ভাতা প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্নপূর্ণা ভান্ডার, যুবশক্তি প্রকল্প, বার্ধক্য ভাতা এবং বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকদের জন্য মাসিক ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। উপভোক্তাদের একাংশের বক্তব্য, এই পদক্ষেপ স্বস্তি দিলেও তা এখনও যথেষ্ট নয়।

বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণ মানুষের তুলনায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। চিকিৎসা, ওষুধ, বিশেষ শিক্ষা, সহায়ক যন্ত্রপাতি, যাতায়াত—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। ফলে মাসিক ভাতা তাঁদের কাছে অত্যন্ত জরুরি আর্থিক সহায়তা।

দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ ভাবে সক্ষমদের সংগঠন এবং সমাজকর্মীরা ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এতদিন যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া হতো, তা দিয়ে ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব ছিল না। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল।

দৃষ্টিহীনদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী দ্বীপ মণ্ডলের বক্তব্যে এই অসন্তোষ স্পষ্ট। তিনি বলেন,

আরপি ডব্লিউ অ্যাক্ট (Rights of Persons with Disabilities Act)-এর নিয়ম অনুযায়ী, ভিজুয়ালি ইমপেয়ারড পারসন সাধারণ ভাতার তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা। সেই হিসাব অনুযায়ী তাঁদের ভাতা হওয়া উচিত ছিল ৩,৭৫০ টাকা। অন্তত অন্য ভাতাগুলির সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হোক, এই দাবিই আমরা জানিয়েছি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভোট চাইতে ব্যস্ত নেতারা বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষের কথা ভাবছেন? মুখোমুখি শম্পা সেনগুপ্ত

West Bengal elections 2026: রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতির ফাঁক, ভোটদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক হয়রানি, সামাজিক মানসিকতা এবং বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের নেতা হিসেবে উঠে আসার পথে বাধা—সব কিছু নিয়েই আলোচনা করলেন শম্পা সেনগুপ্ত। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন পৌলমী মণ্ডল।

দ্বীপ মণ্ডলের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হলেও অধিকারভিত্তিক দাবির সঙ্গে বাস্তব বরাদ্দের এখনও ফারাক রয়ে গিয়েছে।

সাধারণ মানুষের একাংশও এই বিতর্কে সরব। জাকির হোসেনের মতে, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি। তাঁর কথায়,

এখন অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থে কাজ খুব কমই হয়। নিজেদের স্বার্থ পূরণ হয়ে গেলে যা কিছু পড়ে থাকে তা সাধারণ মানুষকে ভাতার নাম করে ছুঁড়ে দেওয়া হয়।

এই বক্তব্যের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে এক ধরনের হতাশার ইঙ্গিত রয়েছে। বিশেষ ভাবে সক্ষম অনন্যা পাত্রের প্রতিক্রিয়ায় ধরা পড়েছে মিশ্র অনুভূতি। তিনি বলেন,

ভাতা বৃদ্ধি হওয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই।

আসলে অর্থের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও, বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের জীবনের মূল সমস্যাগুলি এখনও রয়ে গিয়েছে। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পরিকাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, সরকারি হাসপাতালে বিশেষ পরিষেবার অভাব রয়েছে এবং সহায়ক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির দাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাগালের বাইরে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত চিকিৎসা ও সহায়তা ব্যয়ের মুখোমুখি হন, তখন সাধারণ ভাতা কাঠামো যথেষ্ট কার্যকর হয় না। তাই বিশেষ ভাবে সক্ষম নাগরিকদের জন্য শুধু ভাতা বাড়ালেই হবে না, তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবার সুযোগও বাড়াতে হবে।

অনেক পরিবার জানিয়েছে, ভাতা বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। অন্তত মাসের কিছু খরচ মেটানো সহজ হবে। কেউ ওষুধ কিনতে পারবেন, কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচে সাহায্য পাবেন, আবার কেউ সহায়ক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে সেই অর্থ ব্যবহার করবেন। কিন্তু এই সহায়তা এখনও সীমিত।

সমাজকর্মীদের মতে, বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি আনা প্রয়োজন। যেখানে ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত সংশোধিত হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষিত চাকরি, দক্ষতা বাড়ানো, সহজলভ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

ভাতা বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে, আশাও জাগিয়েছে। এখন দেখার, এই আশাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে সরকার কতটা আন্তরিক এবং কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

লিখেছেন
Sonia Sarban
Sonia Sarban
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।

সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ

Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।