অসমে বন্যার দাপট কমলেও সংকট কাটেনি, মৃত ৮০, এখনও ক্ষতিগ্রস্ত ২ লক্ষের বেশি মানুষ
Assam Floods 2026: বন্যার জল নামতে শুরু করলেও অসমের সংকট এখনও কাটেনি। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০। এখনও দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জও রয়ে গিয়েছে।
অসমে বন্যার জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। কিন্তু জল কমলেই যে বিপদ কেটে যায়, বাস্তব বলছে ঠিক তার উল্টো। বহু মানুষের ঘরবাড়ি এখনও কাদায়, চাষের জমি নষ্ট, রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। সরকারি হিসাবে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০। এখনও দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ এই দুর্যোগের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
গত কয়েক দিনের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত সাতটি জেলা ও তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ বন্যার কবলে ছিলেন। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার সংখ্যা কমে চারে নেমেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লক্ষ ১২ হাজার ৪০০। সংখ্যা কমলেও হাজার হাজার পরিবারের দুর্ভোগ এখনও শেষ হয়নি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরাইদেও জেলা। সেখানে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ এখনও বন্যার প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন। এরপরই রয়েছে শিবসাগর, যেখানে প্রায় ৭১ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। জোরহাটেও প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। নদীর জল নামলেও বহু গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
অসমের বন্যা নতুন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই বর্ষার সময় ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলি বিপদসীমা অতিক্রম করে। তবে এ বছরের বন্যা একাধিক জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। প্রবল বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই বহু এলাকা জলের তলায় চলে যায়। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন।
বর্তমানে রাজ্য সরকার ১১২টি ত্রাণ শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালাচ্ছে। সেখানে ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। খাবার, পানীয় জল, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অংশ নিয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Assam flood 2026: কেন প্রতি বছর বন্যায় ডুবে যায় অসম? ব্রহ্মপুত্রের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অতিবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনের ভূমিকা কতটা? বন্যামুক্ত অসম গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আর এখন রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিই বা কেমন?
বন্যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রে। বিস্তীর্ণ চাষের জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। ধান-সহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে। এই ক্ষতির ফলে আগামী কয়েক মাস বহু কৃষকের জীবিকা বড় সংকটে পড়তে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ কৃষিনির্ভর হওয়ায় এই ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অনেক রাস্তা ভেঙে গিয়েছে, ছোট সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। জল নেমে যাওয়ার পরেও কাদা, আবর্জনা এবং দূষিত জল নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ত্রাণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল সম্প্রতি অসমের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেছে। চরাইদেও, শিবসাগর, জোরহাট এবং গোলাঘাটে গিয়ে তারা ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক মূল্যায়ন করেছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
এরই মধ্যে অসম সরকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের আর্থিক স্বস্তি দিতে কিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য ছয় মাসের ঋণ পরিশোধে স্থগিতাদেশ বা লোন মোরাটোরিয়ামের ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বহু ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক এবং সাধারণ ঋণগ্রহীতা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও এগিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পোশাক এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। বলিউড অভিনেতা কার্তিক আরিয়ান অসম মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।
অসমে বন্যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বড় পরিবেশগত সংকট। অতিবৃষ্টি, নদীর চর পরিবর্তন, ভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে প্রতিবছরই বন্যার প্রকৃতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন বন্যা আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদী পরিকল্পনা এবং জলবায়ু অভিযোজন নীতির উপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
যদিও ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসম সফরে বলেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যকে বন্যামুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বারবার দাবি করেছিলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ মজবুত করা, ড্রেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু পাঁচ বছর পরেও রাজ্য আবারও বড়সড় বন্যার মুখে পড়ায় সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
অনেক পরিবার জানে না, তারা কবে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবে। অনেক কৃষক জানেন না, আগামী মৌসুমে কীভাবে চাষ শুরু করবেন। বহু শিশুরা পড়াশোনা করতে পারছেন না। ত্রাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনাই ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয়ের ক্ষতি কমানোর একমাত্র পথ।






