অসমে বন্যা: কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা, এখন কী পরিস্থিতি?
Assam flood 2026: কেন প্রতি বছর বন্যায় ডুবে যায় অসম? ব্রহ্মপুত্রের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অতিবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনের ভূমিকা কতটা? বন্যামুক্ত অসম গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আর এখন রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিই বা কেমন?
অসমে বন্যা নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বছর একই সংকট ফিরে এলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই। কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি, ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। বহু জেলায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে এবং হাজার হাজার পরিবার ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসমের বন্যার মূল কারণ কেবল অতিবৃষ্টি নয়। ব্রহ্মপুত্র বিশ্বের অন্যতম বেশি পলিবাহী নদী। হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি নিয়ে আসায় নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়। ফলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির জল নদী উপচে আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয় ও ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বৃষ্টি। সেই জল অল্প সময়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রে মিশে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এবারের বন্যাকে আরও ভয়াবহ করেছে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার চরিত্র বদলাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টির বদলে অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীগুলি দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং জল নামার সুযোগ কমে যায়। ফলে বন্যা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
অসমে বন্যার আর একটি বড় কারণ নদীভাঙন। ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ প্রায়ই বদলে যায়। প্রতি বছর বহু গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়। একই সঙ্গে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস এবং শহরাঞ্চলে অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। বিশেষ করে গুয়াহাটির মতো শহরে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জল জমে যাওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
North Bengal Flood History: শনিবারের বিপর্যয় মনে করাচ্ছে ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ রাতের কথা। ৪ অক্টোবর রাতের একটানা বৃষ্টি বন্যা ডেকে আনে উত্তরবঙ্গে। সেবারের বন্যায় ২১৬ জন (সরকারি হিসাবে)-এর মৃত্যু হয়।
যদিও ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসম সফরে বলেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যকে বন্যামুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বারবার দাবি করেছিলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ মজবুত করা, ড্রেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু পাঁচ বছর পরেও রাজ্য আবারও বড়সড় বন্যার মুখে পড়ায় সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তবে রাজ্য সরকার বলছে, বন্যার প্রকৃতি আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন, এবারের বিপর্যয়ের মাত্রা কল্পনারও বাইরে। তাঁর বক্তব্য, শুধু বাঁধ নির্মাণ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং উজানের প্রবল জলপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বর্তমানে রাজ্য সরকার উদ্ধার ও ত্রাণকাজে জোর দিয়েছে। সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছে। প্রয়োজনে সেনা ও বায়ুসেনাকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকায় নৌকা ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও করেছেন। মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নগদ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের বই কেনার জন্য বিশেষ অনুদান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন, কেউ শুকনো খাবার, ওষুধ, পোশাক বা বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দিচ্ছেন। অনেক এলাকায় স্থানীয় মানুষ নিজেরাই নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমেছেন। এই সামাজিক উদ্যোগ সরকারি ত্রাণের পাশাপাশি দুর্গতদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭৫-এ পৌঁছেছে। কয়েক লক্ষ মানুষ এখনও বন্যার প্রভাবে রয়েছেন। বহু গ্রাম জলমগ্ন, হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন এবং কৃষি, গবাদি পশু ও পরিকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হয়েছে। কিছু এলাকায় জল নামতে শুরু করলেও বহু জেলায় পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। প্রশাসনের আশঙ্কা, নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।






