অসমে বন্যা: কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা, এখন কী পরিস্থিতি?

Assam flood 2026: কেন প্রতি বছর বন্যায় ডুবে যায় অসম? ব্রহ্মপুত্রের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অতিবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনের ভূমিকা কতটা? বন্যামুক্ত অসম গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আর এখন রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিই বা কেমন?

inscript
৩ মিনিট
অসমে বন্যা: কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা, এখন কী পরিস্থিতি?

অসমে বন্যা নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বছর একই সংকট ফিরে এলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই। কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি, ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। বহু জেলায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে এবং হাজার হাজার পরিবার ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসমের বন্যার মূল কারণ কেবল অতিবৃষ্টি নয়। ব্রহ্মপুত্র বিশ্বের অন্যতম বেশি পলিবাহী নদী। হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি নিয়ে আসায় নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়। ফলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির জল নদী উপচে আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয় ও ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বৃষ্টি। সেই জল অল্প সময়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রে মিশে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এবারের বন্যাকে আরও ভয়াবহ করেছে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার চরিত্র বদলাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টির বদলে অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীগুলি দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং জল নামার সুযোগ কমে যায়। ফলে বন্যা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।

অসমে বন্যার আর একটি বড় কারণ নদীভাঙন। ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ প্রায়ই বদলে যায়। প্রতি বছর বহু গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়। একই সঙ্গে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস এবং শহরাঞ্চলে অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। বিশেষ করে গুয়াহাটির মতো শহরে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জল জমে যাওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৬৮ থেকে ২০২৫: যেভাবে বারবার বন্যায় লণ্ডভণ্ড উত্তরবঙ্গ

North Bengal Flood History: শনিবারের বিপর্যয় মনে করাচ্ছে ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ রাতের কথা। ৪ অক্টোবর রাতের একটানা বৃষ্টি বন্যা ডেকে আনে উত্তরবঙ্গে। সেবারের বন্যায় ২১৬ জন (সরকারি হিসাবে)-এর মৃত্যু হয়।

যদিও ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসম সফরে বলেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যকে বন্যামুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বারবার দাবি করেছিলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ মজবুত করা, ড্রেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু পাঁচ বছর পরেও রাজ্য আবারও বড়সড় বন্যার মুখে পড়ায় সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

তবে রাজ্য সরকার বলছে, বন্যার প্রকৃতি আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন, এবারের বিপর্যয়ের মাত্রা কল্পনারও বাইরে। তাঁর বক্তব্য, শুধু বাঁধ নির্মাণ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং উজানের প্রবল জলপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বর্তমানে রাজ্য সরকার উদ্ধার ও ত্রাণকাজে জোর দিয়েছে। সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছে। প্রয়োজনে সেনা ও বায়ুসেনাকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকায় নৌকা ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও করেছেন। মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নগদ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের বই কেনার জন্য বিশেষ অনুদান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন, কেউ শুকনো খাবার, ওষুধ, পোশাক বা বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দিচ্ছেন। অনেক এলাকায় স্থানীয় মানুষ নিজেরাই নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমেছেন। এই সামাজিক উদ্যোগ সরকারি ত্রাণের পাশাপাশি দুর্গতদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭৫-এ পৌঁছেছে। কয়েক লক্ষ মানুষ এখনও বন্যার প্রভাবে রয়েছেন। বহু গ্রাম জলমগ্ন, হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন এবং কৃষি, গবাদি পশু ও পরিকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হয়েছে। কিছু এলাকায় জল নামতে শুরু করলেও বহু জেলায় পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। প্রশাসনের আশঙ্কা, নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় চালের দাম প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

Rice Price Increase: এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় চালের দাম কেন দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হলো? ভারত ও থাইল্যান্ডে উৎপাদন কমায় কি বিশ্বব্যাপী সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে? ফিলিপাইনে চালের দাম ২১ শতাংশ বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে? খাদ্য মূল্যস্ফীতি কি আরও বাড়বে? ২০২৭ সাল পর্যন্ত দাম কি এভাবেই চড়া থাকবে?

কীভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নের দাম দিচ্ছে ভারতের নবজাতকরা?

Heatwave effect on Newborn babies: জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে ৮,৮৩০টি শিশুর নির্ধারিত সময়ের আগে অকাল জন্ম হয়েছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে এই সংখ্যা সর্বাধিক। গবেষকদের আশঙ্কা, কিছু বছরের মধ্যে ভারতে এই পরিস্থিতি, আরও বাড়বে।

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।