ভাত না থাকলে মানচিত্র খেয়ে পেট ভরবে? আজাদির ৭৫-এও ঘোচেনি অনাহারের অন্ধকার
স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়েও এক পেট খিদে নিয়ে অপেক্ষা করে প্রান্তিক ভারত। তার ডাক কি ‘অমৃত মহোৎসবের’ কাণ্ডারিদের কানে পৌঁছবে?

পঁচাত্তরে পা দিল ভারতের স্বাধীনতা। তাই দেশজুড়ে চলছে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। কিন্তু পঁচাত্তর বছরের আজাদি ঠিক কেমন? ১৯৫০-এ যখন ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়, তাতে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের মধ্যে প্রথমেই ছিল খাদ্যের অধিকার। অর্থাৎ, স্বাধীন ভারতরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের পাতে অন্ন পৌঁছে দেওয়ার গুরুভার নিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন দেশের নির্মাতারা। তারপর পেরিয়ে গিয়েছে পঁচাত্তর বছর। আজাদির অমৃত মহোৎসবে অমৃত তো দূরে থাক, একবেলা সামান্য খাবার জোটাতে না পেরে এখনও প্রতিদিন মরে যাচ্ছে স্বাধীন ভারতের নাগরিক।
এই তো সেদিন, ২০২২-এর ১৫ অগাস্ট যেদিন পঁচাত্তর পূর্ণ করল স্বাধীনতা, ঠিক তার কয়েকদিন আগেই ১৩ অগাস্ট পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রান্তিক গ্রামে অনাহারে ভুগে মরে গিয়েছেন দু'-জন। পশ্চিম মেদিনীপুরের বুলাবেদা গ্রাম এমনিই উন্নয়নের নিরিখে পিছিয়ে। বেশিরভাগ পরিযায়ী শ্রমিকের বাস। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার করোনা ও লকডাউনে কাজ হারিয়ে বেকার। এমনই একজন ছিলেন সঞ্জয় সর্দার। করোনার ফলে যখন ফিরেছিলেন গ্রামে, ধরা পড়েছিল টিবি। তারপর থেকেই কাজ বন্ধ। প্রায় দুই বছর ধরে সামান্য সঞ্চয় ভাঙিয়ে খেলেও শেষ দু'-তিন মাসে পাতে পড়েনি সামান্য চাল-ডালও। তাঁর মৃত্যুর কারণ বলছে দীর্ঘদিনের অনাহার ও অপুষ্টিই কেড়ে নিয়েছে প্রাণ। মেদিনীপুরের সঞ্জয়ের মতোই পরিণতি মালবাজারের দীনেশ ওঁরাও-এর। লোকসানে চলা চা বাগান বন্ধ করে দিয়েছে মালিক। বেকার দীনেশ শত চেষ্টা করে অন্য কোনওভাবে অন্নের সংস্থান করে উঠতে পারেনি। দীর্ঘ ২-৩ মাসের অনাহারের ফলশ্রুতি মৃত্যু।
‘ক্ষুধার রাজ্যে’ ভারত
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২১-এর তথ্য বলছে ১১৬টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০১। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালের থেকেও পিছিয়ে। ২০১৯-'২০ সালের হিসেব যদি ধরা হয়, ভারতে মোট উৎপাদিত খাদ্যশস্যর পরিমাণ ২৯১.৯৫ মিলিয়ন। তারপরেও ইউনিসেফের হিসেব বলছে, ভারতে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুদের মৃত্যু ৬৯ শতাংশই অপুষ্টি ও অনাহারের কারণে হয়। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে ১০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন অনাহারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জনতার দ্বারা নির্বাচিত স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার। তাহলে আজও এই দেশে কেন গলা তুলে ক্ষমতাকে সত্যি কথাটা শোনাবেন না সাংবাদিকরা? কেন ভারভারা রাওদের দমন করা হবে?
ভারত সরকারের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র রিপোর্টও কম চমকপ্রদ নয়। সেই রিপোর্ট বলছে, ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে অপুষ্টি। এখনও ভারতের ৫১.৪ শতাংশ মহিলা গর্ভবতী অবস্থায় রক্তাল্পতায় ভুগছেন। ‘নীতি আয়োগ’-এর রিপোর্টও বলছে প্রায় একই কথা। যেখানে ভারত থেকে অনাহার দূর করার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র, সেখানে দেশের প্রায় ১১টি রাজ্যই অনাহার মোকাবিলায় কিছুই করে উঠতে পারেনি।
করোনা ও অপুষ্টি
এই অনাহার, অপুষ্টি, রক্তাল্পতাকে আরও বেআব্রু করে দিয়েছে করোনা। করোনার প্রথম পর্যায়ে অনাহারে, অপুষ্টিতে দেশজুড়ে মারা গিয়েছে প্রায় ১০০০ জন। অন্নের সংস্থান করতে না পেরে আত্মঘাতীও হয়েছেন অনেকে। মোদি সরকারের পরিকল্পনাহীন নীতি আরও বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হঠাৎ লকডাউনে ভিনরাজ্যে আটকে পড়া মানুষ ঘরে ফেরার তাড়নায় খালি পেটে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। ২০২০ সালের মে মাসে মহারাষ্ট্র থেকে উত্তরপ্রদেশ হেঁটে আসার পথে অনাহারে, ক্লান্তিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন বছরষাটেকের পরিযায়ী শ্রমিক বিক্রম। খাবার না পেয়ে লকডাউনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন আগ্রার বছর পাঁচেকের শিশু সোনিয়া কুমারী। এদের মৃত্যুর দায় কার? সেই সময় মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন ‘অমৃত মহোৎসব’-এর উদ্যোক্তারা।
নীতির গেরো
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে এসেও কেন ভারতে এখনও অপুষ্টি, অনাহারে লোক মরে? খাদ্যের জোগান দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার কি তাহলে কিছুই করতে পারেনি? অথচ অপুষ্টি, অনাহার দূর করতে হরেকরকম প্রকল্প চালায় কেন্দ্রীয় সরকার। পিছিয়ে নেই রাজ্যগুলিও। পশ্চিমবঙ্গের কথাই যদি ধরা যায়, ‘খাদ্যসাথী’, ‘রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা’, এমন বিভিন্ন প্রকল্প আছে, যা অন্তত সাধারণ মানুষের পাতে ভাত নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সব প্রতিশ্রুতিই যে সার। ‘অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা’ দরকার ছিল যে পরিবারের, তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বরাদ্দ করেছে ‘রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা’। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র নতুন নিয়মে আধার ও রেশন যুক্ত না করলে আমার-আপনার হাতে পৌঁছবে না মাসের রেশন। যে মানুষের পেটে খাবার নেই, তার কাছে কি এই আধার-রেশন লিংক বাতুলতা নয়? তাই আর রেশন পাওয়া হয়ে ওঠেনি সঞ্জয় সর্দারের। এমন অনেক সঞ্জয় সর্দার আছে, যাদের নীতির ফাঁসে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে রাষ্ট্র।
ভারত থেকে অনাহার দূর করতে সরকারের প্রকল্পের অভাব নেই। মহিলা ও শিশুদের পুষ্টির জন্য আছে ন্যাশনাল নিউট্রিশন মিশন। আছে ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি মিশন, যার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ভারতে খাদ্য শস্যের উৎপাদন বাড়ানো, যাতে প্রত্যেকের পাতে পৌঁছয় খাবার। তাছাড়াও আছে জিরো হাঙ্গার প্রোগাম, ইট রাইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট এবং সর্বোপরি ‘মিডডে মিল’। কিন্তু এত সবকিছুর পরেও নীতির জটে আটকে যায় খাবার। মানুষের পাত অবধি আর পৌঁছনো হয় না। যেমন ধরুন, কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ। এই বিবাদের ফলে না সঠিকভাবে কেন্দ্রের খাদ্য প্রকল্পগুলির সুযোগ পায় সাধারণ নাগরিক, না পায় রাজ্যের। তারপরেও আছে কেবল চাল-ডাল দিয়ে দায় সারার কাজ। কেবল চাল, ডাল দিয়ে যে অপুষ্টি ঘুচবে না, তা বিলক্ষণ জানেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু জানাই সার। মিড ডে মিলে ডিমের বরাদ্দ আছে, কিন্তু ডিম নেই। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় এক। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলো থেকেই এই খাবার পাওয়ার কথা মা ও শিশুর। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খাতায়-কলমে ডিমের হিসেব থাকলেও পাতে তার হিসেব মেলে না। মাঝে মাঝে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর’ মতো ছোলা, সোয়াবিনের ব্যবস্থা থাকলেও তা থেকে ডিমের প্রোটিন আসে না। সরকারের দেওয়া কোন খাদ্যে কতটা গুনাগুণ, তার সঠিক হিসেব মেনেই সেই খাবার বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বরাদ্দ খাবার আর পাওয়া হয়ে ওঠে না। সরকারি নীতি আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌলতে অনাহার বেড়ে চলে। ঘাতক হয়ে ওঠে অপুষ্টি। সরকারও শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে।
কিন্তু স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়েও এক পেট খিদে নিয়ে অপেক্ষা করে প্রান্তিক ভারত। তার ডাক কি ‘অমৃত মহোৎসবের’ কাণ্ডারিদের কানে পৌঁছবে?






