পরাঙ্মুখ, হৃদয়ে দূরগামী; বেলা তার
Bela Tarr: তিনি চলচ্চিত্রকে কোনো মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর অন্তর্গত বেদনার কথা— আমরা যারা বেদনার সন্তান, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত এক গূঢ় ভাষায়।
সম্ভবত ধ্রুপদী অর্থে আধুনিক পৃথিবীর শেষ চলচ্চিত্র— 'শয়তানের নৃত্য', সাত ঘণ্টার এক মহাকাব্য যিনি বানিয়েছিলেন, তিনি অস্তমিত হলেন। এই প্রস্থান যন্ত্রণাবিধুর হতে পারে, কিন্তু তা নিতান্ত কয়েকজনের কাছে, সংখ্যালঘুর কাছে। সিনেমা ক্রমশই স্পেকটাকুলার হয়ে উঠছে। তার নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী এবং তার দ্রুততা তাকে পরিণত করছে মানুষের ক্ষণিকের বিহ্বলতা ও বিনোদনে। বস্তুত সিনেমার সূচনাও সেভাবেই হয়েছিল। তার থেকে ডিজিটাল যুগে আর কী বেশি আশা করা যাবে? 'আমরা যাইনি মরে আজও, তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়'— আর বেলা তার চেয়েছিলেন তার উচ্চারণ যেন দৃশ্যের অত্যাচার মুক্ত হয়।
তাই বেলা তার প্রচলিত অর্থের সেরকম চলচ্চিত্রকার নন। তিনি চলচ্চিত্রকে কোনো মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর অন্তর্গত বেদনার কথা— আমরা বেদনার সন্তান যারা, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত এক গূঢ় ভাষায়। এবং তিনি যখন চলচ্চিত্র করেছেন, তাতে নয়নশোভন যুবক-যুবতী বা দেহক্রীড়া অথবা চমকপ্রদ কৌশল কিছুই নেই। আমার মনে হয় বেলা তার অনেক বেশি ভারতীয়, মজ্জায় ও মননে। তাঁর ছবি দেখে সবসময়ই আমার মনে হয়েছে যে মন্থর কিংবা গতিসম্পন্ন সিনেমা যাই হোক না কেন, আসলে তিনি শরশয্যার ভীষ্ম, সূর্য উত্তরায়ণে প্রবেশ না করলে যিনি স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করবেন না। এই কুরুক্ষেত্রের রণরক্ত কোলাহল শেষ হয়ে গেছে। তেমন কোনো নাটক আর পৃথিবীতে নেই। তেমন কোনো ঘটনাও ঘটবে না। অথচ ভীষ্ম অপেক্ষা করে থাকেন এক নিবিড় আস্তিক্য পর্বের অপেক্ষায়। দিন যায়, রাত যায়, ভীষ্ম কখনোই কাতর হন না। অবশেষে একদিন দিনমণি তাকে দয়া করেন। বেলা তার, যথার্থই, তাই।
বেলা তারের 'দ্য টিউরিন হর্স' ছবির দৃশ্য
বেলা তার যখন ছবি করেন তখন ছবির প্রাথমিক শর্ত, অর্থাৎ হলিউডের শর্ত বলতে, যে দ্রুতগতির মন্তাজের কথা আমাদের মনে হয়, তার সম্পূর্ণ বিপরীত আবর্তে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর দেখা, এক দীর্ঘ অবলোকন। এই অবলোকনের সঙ্গে বরং জীবনানন্দ দাশের সাদৃশ্য আছে। আমাদের পরিচিত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশাহীন বিবরণ, নীরব প্রতীক্ষা যেমন সহসা আকুল হয়ে ওঠে কোনো নির্দিষ্ট একটি শব্দের মধ্যে জীবনানন্দের, বেলা তার ঠিক সেভাবেই জানেন তাঁর দীর্ঘ অচঞ্চল দৃষ্টিপাত একটি বিন্দুতে পৌঁছে নিজেই ক্রম-উন্মোচনশীল হয়ে উঠবে। তিনি ক্যামেরাকে বিরতিহীন করে তোলেন। তাঁর প্রথম ছবি থেকে শেষ ছবি সর্বত্রই লং টেক। এবং সেই লং টেক অবিশ্বাস্য— সাত-আট মিনিট করে, এমনকি এগারো মিনিট পর্যন্ত চলে গেছে। তবু বেলা তারের প্রতীক্ষা শেষ হয়নি। তাঁর ছবি হয়ে উঠেছে সময়ের সাংখ্যদর্শন। সময়ের অবিনশ্বর গ্রন্থি বা বলা চলে, এইসব নিরঞ্জন অবলোকনই সেই প্রহর পুঁথি, যা আসলে মানুষের ইতিহাস। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত শুধু উড্ডীন বিশেষণটি খুঁজে পাওয়ার জন্য একটি সন্ধ্যা ব্যয় করেন, বেলা তার সমগ্র জীবন ব্যয় করতে পারেন একটি শটের জন্য।
আমরা তাঁর ছবি নিয়ে আলোচনা করতেই পারি। 'তুরিনের অশ্ব' বা 'শয়তানের নৃত্য'। কিন্তু এই আলোচনার সময় মনে রাখতে হবে যে, 'শয়তানের নৃত্য' উত্তর-ইউরোপীয় বার্গম্যানের 'সেভেন্থ সিল'-এর অন্তিম দৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এক অন্ধকার থেকে অন্ধকারে চলে যাওয়ার সময় বেলা তার পৃথিবীর অন্ত্যেষ্টি স্থিরতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর সম্পর্কেই আমরা বলতে পারি, 'গতি তবে স্তব্ধতার মতো'। সিনেমা যা গতির শিল্প, তাকে তিনি অবলীলায় পাল্টে দিয়েছেন। এ বিষয়ে রোবের ব্রেসোঁ বা অ্যাঞ্জেলোপুলাস এ জাতীয় নাম আমি করতে চাই না। কারণ এটা শুধু দীর্ঘ টেকের বিষয় নয়। এটা শুধু সম্পাদনার প্রতি এক ধরনের বিরাগ নয়। এটা বরং এক অপলক ও অচঞ্চল দৃষ্টিপাত, যা ছবির অন্তরালে আরেকটি ছবি খুলে দেবে। যেমন দালির পটগুলি, তারা ক্রমশই একটি অর্থ থেকে অন্য অর্থে চলে যায়, এক ছবি থেকে অন্য ছবি গঠন করে। বেলা তারের ছবি প্রায় সেইরকম। তাঁকে আমরা অন্যান্যদের সঙ্গে তো তুলনা করতে পারবই না, যদিও হিচকক তাঁর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এমনকি তারকোভস্কির যে নন্দনতত্ত্ব, তার সঙ্গেও পারব না। বেলা তার একটি ভাবনার শরীর।
বেলা তারের 'স্যাটানট্যাঙ্গো' ছবির দৃশ্য
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nadharer Bhela Review: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবিতে বারবার উঠে এসেছে গ্রাম্য লোকের ছাপোষা জীবন, মফসসলের মানুষদের খুচরো পয়সার যাপন, সর্বহারাদের এক মহাকাশ ভালবাসার কথা।
তিনি দৃশ্যের আধিপত্যের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন সিনেমা থেকে। এবং সিনেমার ইমেজ তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে ভাবনার বাহক বা স্বয়ং ভাবনা। তাঁর ভাষা নেই। তিনি চিত্রভাষাতেই চিন্তা করা যায় কিনা এরকম একটা অনুমান করতে চেয়েছিলেন। এই ধারণার ঐতিহ্য তাঁর দেশে ছিল। মিকলোস ইয়াঞ্চো প্রমুখ এই ধরনের মন্থর ছবির সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ইতিহাস অনেক বড় অর্থে, ম্যাক্রো ইতিহাস ইয়াঞ্চোর ছবিতে পরিস্ফুট হয়। তাঁর অশ্বসমূহ, তাঁর নগ্ন নারীরা যে অর্থে বিচ্ছুরিত হয়, বেলা তারের পূরবী বিধুর অপরাহ্ণ বা বিষাদাশ্রিত অন্ধকার তেমন নয়। পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার বন্দনায় তিনি অন্তহীন অপেক্ষা করতে পারেন। তাঁর প্রতিবাদ নেই। কেননা তিনি সান্ত্বনা আশা করেন না। বোদলেয়ার যে নির্বেদ বা 'অঁনুই' (Ennui)-এর কথা বলেছিলেন, বেলা তার, তার একটি চূড়ান্ত প্রমাণ। হাঙ্গেরি এক ছোট্ট দেশ। কিন্তু সেখানে সিনেমা তার কথা বলার উৎস মুখ।
এই যে আমরা ইয়াঞ্চোর কথা বললাম, বা আমরা ইস্তভান জাবো এবং মেসজারোস-এর কথা বলি, আমরা আলেকজান্ডার কর্ডা থেকে যে ইতিহাস শুরু করি, তাতে দেখতে পাই যে আসলে হাঙ্গেরি তার নিজের ইতিহাসকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। তারা এক মায়াবীর মতো জাদুবলে সেই তাস উন্মোচন করে দেয়। হেগেল বলেছিলেন, মিনার্ভার পেঁচা শুধু রাতেই ওড়ে। বস্তুত অধিকৃত হাঙ্গেরিতে যখন ইতিহাস অবলুপ্ত হলো, তখন ইয়াঞ্চো বা বেলা তার বা মেসজারোস প্রমুখ চলচ্চিত্রকারদের আর কী-ই বা করার ছিল? তারা প্রকাশ্যেই যদি আধিপত্যের বিরোধিতা করেন, তার প্রামাণ্য নথি তেমনভাবে জনসাধারণের সামনে গৃহীত নাও হতে পারে। তাই তিনি শান্তিপর্বের জবানবন্দি রেখে গেলেন। উপরন্তু সেই জবানবন্দিতে যে ছবি, যে মন্থরতা, তা আমাদের ধৈর্য দাবি করে।
বেলা তারের 'ড্যামনেশন' ছবির দৃশ্য
সবাই বেলা তারের ছবি দেখে না, দেখবেও না। তাঁর এই মৃত্যু আমাদের কাছে এল খানিকটা সমাপতন হিসেবে। এই মুহূর্তে বাংলা সিনেমায় যা সচরাচর হয় না, তেমন এক তথাকথিত 'ক্লান্তিকর' ছবি, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের 'নধরের ভেলা' প্রদর্শিত হতে চলেছে প্রেক্ষাগৃহে।
এই 'নধরের ভেলা'-র মধ্যে যে বিলম্ব, যে সময়ের ক্ষয়, তার আদিপুরুষ হিসেবে তো বিশ্ব শতকে বিরাজ করছেন বেলা তার।
অনেক সময় তারকোভস্কিও। এবং মিকলোস ইয়াঞ্চো তো বটেই। এ যেন জীবনানন্দের পয়ার, যাকে ক্রমশই মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
যা ছাব্বিশ মাত্রাতেও ক্ষান্ত হয় না। যা শুধুমাত্র গ্রন্থের সীমাবদ্ধতার জন্য আর বিস্তৃত হতে পারে না। বা যেন কোনো রবীন্দ্রসংগীত:
'মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে / আমায় কেন বসিয়ে রাখো একা দ্বারের পাশে।'
বেলা তারের ছবি দেখতে দেখতে আমরা এই প্রশ্নটাই করি। আমরা বুঝতে পারি না এই স্রষ্টা কেন অমরতার পথে হেঁটে যেতে যেতে
তার সঙ্গী সারমেয়টির বদলে আমাদের বেছে নেন। আমরা যাতে নরক থেকে স্বর্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পথে অন্তত কোনো প্রদর্শক পাই— এইটি কারণ বেলা তার চলে গেলেন। কিছুদিন আগে গোদার চলে গেছেন। পৃথিবী প্রায় চলচ্চিত্রকার শূন্য হয়ে পড়ছে। অন্তত সিনেমার সঙ্গে যে দর্শনের যোগাযোগ আছে, সিনেমা যে ইতিহাসের কথা বলে, তা বলার লোক আর নেই। এখন সিনেমা শুধুই একটি কৃৎকুশলতার মতলব। সেই মতলব তো আমরা রোজই পর্দায় দেখছি। আজকের চলচ্চিত্রকার ধুরন্ধর। আর বেলা তার আমাদের মধ্যে শেষ প্রজ্ঞানময় দার্শনিক। লাসলো ক্রাসনোহরকাই তাঁর রচনার সাহিত্য প্রেক্ষাপট তৈরি করতেন, অথচ কোনো ঔপন্যাসিক বেলা তারের পক্ষে জরুরি ছিল না। তিনি নিজেই দৃশ্যের ঔপন্যাসিক। দৃশ্যের স্বয়ম্ভরতা অর্জন তাঁর কাছে অর্জুনের গাণ্ডীব ধ্বনি। 'অপর' চলচ্চিত্রের অভিযাত্রীকে প্রণাম।








