শেষ দফার আগে নতুন ‘উদ্বেগ তালিকা’: হাজারের বেশি নাম, অধিকাংশই মুসলিম

West Bengal voter list controversy: শেষ দফার ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের গোপন ‘উদ্বেগ তালিকা’তে কেন হাজারের বেশি নাম? কেন অভিযোগ, তালিকার অধিকাংশই মুসলিম ও বিরোধী ঘনিষ্ঠ? হাইকোর্টের আপত্তির পরও এই নতুন প্রিভেন্টিভ অ্যাকশন কি বাংলার ভোটে ভয় ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির আরেক বিতর্কিত অস্ত্র?

inscript
২ মিনিট
শেষ দফার আগে নতুন ‘উদ্বেগ তালিকা’: হাজারের বেশি নাম, অধিকাংশই মুসলিম

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোটের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন একটি গোপন ‘উদ্বেগ তালিকা’ তৈরি করে রাজ্য পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম, যাঁদের বিরুদ্ধে প্রিভেন্টিভ অ্যাকশন—অর্থাৎ আগাম আটক বা অন্যান্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, তালিকায় অধিকাংশ নামই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত এবং অনেকের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) যোগাযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে। চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

মাত্র কয়েকদিন আগে কলকাতা হাইকোর্ট একই ধরনের ‘ট্রাবলমেকার’ তালিকা স্থগিত করে দিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ করেছিল। আদালত জানিয়েছিল, কমিশনের ‘অসীম ক্ষমতা’ নেই এবং এমন ‘ব্ল্যাঙ্কেট ডিরেকশন’ দেওয়ার অধিকার কমিশনের নেই। তার পরেও নতুন এই ‘উদ্বেগ লিস্ট’ তৈরি করায় বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, কমিশনের পাঠানো গোপন মেমোর সঙ্গে যুক্ত তালিকায় হাজারের বেশি নাম রয়েছে। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চল ও শহরতলির বাসিন্দা। কমিশনের তালিকায় রাজা গাজি, জাহাঙ্গির-সহ বহু নাম রয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সৌজন্যে ভোটের দিন যাতে কোনও ধরনের অশান্তি বা বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। তালিকাটি গোপন রাখা হয়েছে বলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা এই তালিকাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, নির্বাচন কমিশন বিজেপির ইশারায় কাজ করছে। শেষ দফার ভোট যেসব এলাকায় হবে—যেখানে তৃণমূলের শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে—সেখানে প্রভাব বিস্তার করতেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। আইএসএফ নেতারাও একই সুরে কথা বলেছেন এবং এটিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কমিশন বনাম তৃণমূল, যে ৬ সিদ্ধান্তে পক্ষপাতের অভিযোগ

election commission vs tmc: পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের একের পর এক সিদ্ধান্ত কি সত্যিই নিরপেক্ষ? এসআইআর-এ ২৭ লক্ষ ভোটার, ৪৮৩ আধিকারিক বদলি, হাজার হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী, বাইক নিষেধাজ্ঞা—কেন সব বিতর্কের কেন্দ্র শুধু বাংলা?

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে শান্তিপূর্ণ ও নির্ভয়ে ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার স্বার্থে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘উদ্বেগজনক’ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশন সূত্রের দাবি, ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের প্রতিফলন। এর আগে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)-এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, আধিকারিকদের ব্যাপক বদলি, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং দুই চাকার যানবাহনে নিষেধাজ্ঞা—একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপ দেখা গিয়েছে। এখন নতুন তালিকা কমিশনের আরও এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ।

বিশেষ করে মুসলিম-প্রধান এলাকাগুলিতে এই তালিকার প্রভাব বেশি পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, যাঁরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন, তাঁদেরই এখন আগাম আটকের ভয় দেখানো হচ্ছে কেন?

কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও কমিশনের এই পদক্ষেপকে অনেকে আদালতের নির্দেশের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। আইনজীবী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এই তালিকা নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজেপি এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। দলের নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছে। তৃণমূলের ‘দুষ্কৃতি’ ও ‘বহিরাগত’দের কার্যকলাপ রুখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ৩৬ ঘণ্টায় ১৫০০-র বেশি গ্রেফতারির ঘটনা ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন ইতিমধ্যে একাধিক বিতর্কের সাক্ষী। ভোটার তালিকা সংশোধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এখন এই ‘ওয়ারি লিস্ট’—সব মিলিয়েপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটারদের আস্থা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ দফার ভোটের আগে এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। দেখার বিষয়, আদালত এই নতুন তালিকা নিয়ে কোনও হস্তক্ষেপ করেন কি না।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।

এসআইআর: মূল টার্গেট ছিল বাংলা?

SIR West Bengal controversy: এসআইআরের নামে বাংলার নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কতটা সুপরিকল্পিত? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল কারচুপি ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

শ্রমিক বিক্ষোভের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা?

Garment Workers' Protest in Bangladesh: বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, আন্দোলনের পিছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু শ্রমিকদের অসন্তোষের নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাকি মূল্যবৃদ্ধি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার ক্ষোভ? সরকারের দাবির পক্ষে কতটা প্রমাণ রয়েছে?

সকালে জমা বিকেলে খরচ: আইনের শাসনের অবমাননা

Gaighata incident: গাইঘাটার ঘটনার পরমুহূর্তে শাসক দলের মন্ত্রী, নেতাদের প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার করে দেয়, বন্দি অভিযুক্তকে হত্যার ঘটনা সরকারি নীতির ('সকালে জমা, বিকালে খরচ')—নগ্ন প্রয়োগ।

৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত, মোদীর দাবির আড়ালে কোন পরিসংখ্যানগত বিতর্ক?

World Bank's claim about India's poverty decline: বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩-এ ভারতের চরম দারিদ্র্য ২৭.১% থেকে ২.৬%-এ নেমেছে বলে দাবি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক প্রচারের কাজেও লাগাচ্ছেন। কিন্তু, পরিসংখ্যানের আড়ালে আসল সত্য কি? কি বলছেন অর্থনীতিবিদরা?