বিজিবিএস নিয়ে শুভেন্দু যা বলছেন, তার নেপথ্যে কী ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ?
BGBS controversy: বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট (বিজিবিএস) ঘিরে নতুন বিতর্ক। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, তৃণমূল আমলে একটি ইভেন্ট সংস্থাকে প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের প্রসঙ্গ উঠলেই যে উদ্যোগটির কথা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে, সেটি হলো বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট বা বিজিবিএস (Bengal Global Business Summit)। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল দেশ-বিদেশের শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। রাজ্য সরকার বারবার দাবি করেছে, এই সম্মেলনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে এবং বহু কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, বিজিবিএস যতটা শিল্পায়নের জন্য পরিচিত, তার চেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছে বিপুল সরকারি ব্যয় এবং বিনিয়োগের দাবি নিয়ে বিতর্কের কারণে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিজিবিএসকে কেন্দ্র করে নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে বিজিবিএস আয়োজনের নামে একটি নির্দিষ্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকে প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই বিপুল অর্থ কী ভাবে ব্যয় হলো, কোন প্রক্রিয়ায় চুক্তি দেওয়া হলো এবং এর বিনিময়ে রাজ্য কতটা লাভ পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি তদন্তের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। রাজ্য প্রশাসন বিজিবিএসের ব্যয় সংক্রান্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। অভিযোগ, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন বিজিবিএস আয়োজনের জন্য একটি বেসরকারি ইভেন্ট সংস্থাকে মোট প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ শুধু বিজিবিএস নয়, সরকারের আরও কয়েকটি বৃহৎ অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে বিরোধীদের দাবি, বিজিবিএসের মতো একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের জন্য এই অঙ্ক অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Banerjee defeat 2026: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের প্রধান কারণ হলো মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাদ পড়ে যাওয়া।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, সরকারি টাকার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ ছিল। দ্বিতীয়ত, চুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল কি না। তৃতীয়ত, এই ব্যয়ের তুলনায় রাজ্যের শিল্পায়নে প্রকৃত ফলাফল কতটা এসেছে।
দুর্নীতির অভিযোগের প্রথম স্তরটি হলো, ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ বা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের আশঙ্কা। বিরোধীদের মতে, যদি কোনো ইভেন্ট আয়োজনের প্রকৃত খরচের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা থাকে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনো তদন্তে এমন অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি, তবু ৬৩৫ কোটির অঙ্কটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
দ্বিতীয় অভিযোগটি ‘স্বজনপোষণ’ বা ফেভারিটিজম ঘিরে। বিরোধীদের প্রশ্ন, কেন বারবার একই সংস্থা সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পেল? প্রতিবার কি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল? নাকি নির্দিষ্ট সংস্থাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তের অন্যতম উদ্দেশ্যও হলো চুক্তি প্রদানের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
EVM destroyed: আলিপুরের একটি সরকারি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৪ হাজার ইভিএম পুড়ে নষ্ট হয়েছে। আগুনের উৎস ও বিস্তারের ধরন নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। পুলিশ ও ফরেন্সিক তদন্ত শুরু হয়েছে। নাশকতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি হলো ‘ফলহীন ব্যয়’। বিজিবিএসের মঞ্চ থেকে প্রতি বছর লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং শিল্প পর্যবেক্ষকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলেছেন, ঘোষিত বিনিয়োগের কত শতাংশ বাস্তবে শিল্প প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ প্রস্তাব বা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিরোধীদের বক্তব্য, যদি শিল্প না আসে এবং কর্মসংস্থান না বাড়ে, তাহলে এত বিপুল সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?
এই প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো বিনিয়োগ সম্মেলনে ঘোষিত সমস্ত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয় না। এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের প্রায় সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই সত্য। কারণ বিনিয়োগ প্রস্তাব একটি প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি, যা পরে জমি, অনুমোদন, বাজার পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার উপর নির্ভর করে বাস্তবায়িত হয়। তাই ঘোষিত বিনিয়োগ এবং বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য থাকলেই তা দুর্নীতি প্রমাণ করে না। কিন্তু বিরোধীরা দাবি করছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বড় অঙ্কের সংখ্যা প্রচার করে সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেছে।
রাজ্য সরকারের অবস্থান অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের দাবি, বিজিবিএসের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মানচিত্রে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন, অবকাঠামো, লজিস্টিক্স এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে একাধিক প্রকল্প এসেছে।
তবে শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির অভিযোগ রাজনৈতিক পরিসরে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ বিষয়টি সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। সাধারণ মানুষের প্রশ্নও একই, যদি সত্যিই শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকে, তাহলে তার পূর্ণ হিসাব কি প্রকাশ্যে আনা হবে? কোন সংস্থাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে? কী ধরনের কাজের জন্য সেই অর্থ ব্যয় হয়েছে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সেই ব্যয়ের ফলে রাজ্যের অর্থনীতি কতটা উপকৃত হয়েছে?
বর্তমানে যে তদন্তের কথা সামনে এসেছে, তার মাধ্যমে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তদন্তে যদি দেখা যায় সমস্ত অর্থ নিয়ম মেনেই ব্যয় হয়েছে, তাহলে বিরোধীদের অভিযোগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে। আবার যদি চুক্তি প্রদান, বিল পরিশোধ বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলে, তাহলে তা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অভিযোগ এবং প্রমাণকে আলাদা করে দেখা। শুভেন্দু অধিকারী যে ৬৩৫ কোটি টাকার প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন, সেটি একটি গুরুতর অভিযোগ বটে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো আদালত, নিরীক্ষা সংস্থা বা সরকারি তদন্ত এই অর্থকে দুর্নীতির টাকা বলে ঘোষণা করেনি। ফলে বিষয়টি আপাতত অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। তবে তদন্তের সিদ্ধান্তই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এতটাই জোরালো হয়েছে যে সরকারকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।






