ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?
Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?
ভুটানের পাহাড়ে হিমবাহের জল জমে তৈরি হওয়া হ্রদ ভেঙে নেমে এল হড়পা বান। ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তর-পশ্চিম ভুটানের গাসা জেলার শিনতাফু হ্রদ ভেঙে এই বিপর্যয় ঘটে। আচমকা নেমে আসা বিপুল জলরাশির তোড়ে ভেসে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার একাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটকদের পরিচিত গাসা ছাচু উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকার পরিকাঠামো। এই ঘটনার জেরে বন্যার আশঙ্কা ছড়িয়েছে উত্তরবঙ্গেও। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম ব্লকের সংকোশ নদী সংলগ্ন এলাকায় জারি করা হয় সতর্কতা। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে প্রশাসন। তবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সংকোশ নদীর জলস্তর উল্লেখযোগ্য ভাবে না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বাসিন্দাদের মধ্যে।
কীভাবে ভুটানে ঘটল এই বিপর্যয়?
ভুটানের গাসা জেলার লায়া এলাকার কাছে ওয়াকিলা পর্বতের নিচে অবস্থিত শিনতাফু হ্রদ। হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া এই হ্রদটি ভুটানের ১৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদের অন্যতম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হ্রদটি ভেঙে জল বেরিয়ে আসায় মো ছু নদীর অববাহিকায় হড়পা বানের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হিমবাহ গলে পাহাড়ের উপরে বা উপত্যকায় জল জমে এ ধরনের হ্রদ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বরফ, পাথর ও মাটির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পিছনে জল আটকে থাকে। সেই বাঁধ ভেঙে গেলে অথবা কোনও কারণে জল ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল নিচের দিকে নেমে আসে। এই ঘটনাকে বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF।
পাহাড়ি এলাকায় এই জলের স্রোত অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে। জলের সঙ্গে পাথর, মাটি, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ ভেসে এসে নদীর আশপাশের বসতি, সেতু, রাস্তা ও পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।
শিনতাফু হ্রদ থেকে নেমে আসা জল মো ছু নদীর জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলে। এই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সংকোশ নদী ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে ভুটানের পাহাড়ে তৈরি হওয়া বিপর্যয়ের প্রভাব উত্তরবঙ্গের নদী সংলগ্ন এলাকাতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kedarnath Flood: ৩০ ফুটের এক আয়তাকার পাথর পাহাড়ের নিচে গড়িয়ে পড়ে এবং প্রাচীন মন্দিরের ঠিক আগে আটকে যায়
ভুটানে কোথায় কোথায় ক্ষয়ক্ষতি?
হড়পা বানের জেরে ভুটানের গাসা ছাচু এলাকার উষ্ণ প্রস্রবণ সংলগ্ন পরিকাঠামো ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটকদের কাছে পরিচিত এই উষ্ণ প্রস্রবণটি মো ছু নদীর কাছে অবস্থিত। প্রবল জলস্রোতে সেখানকার বিভিন্ন পরিকাঠামো ভেসে গিয়েছে।
এ ছাড়া, লায়া যাওয়ার রাস্তার একটি অংশ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। ফলে ওই পথে যান চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পুনাখা-গাসা সড়কের একাংশে বন্যার জলে ভেসে আসা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
পুনাখা এলাকায় একটি সৌরশক্তিচালিত জলসেচ প্রকল্পও আংশিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি, প্রবল স্রোতে দুটি অস্থায়ী বেইলি সেতু ভেসে গিয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভুটানে এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২১ সালের ২৬ অগস্টও মো ছু নদীতে হড়পা বানের জেরে গাসা ছাচু এলাকার উষ্ণ প্রস্রবণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আলিপুরদুয়ারে কেন বন্যার আশঙ্কা?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Libya Floods: তছনছ হয়ে গেল ডেরনা। শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মৃতদেহ।আর সেইসব মৃতদেহ ঘিরে ভিড় করছে প্রিয়জনদের আকুতি আর কান্না। কেউ লাশ ব্যাগে মুড়ে ত্রাণের প্রার্থনা করছেন, কেউ কেউ গণকবরে দাফন করছেন প্রিয়জনের দেহ।
ভুটানের পাহাড় থেকে নেমে আসা জল সংকোশ নদীর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের নিচু এলাকায় পৌঁছতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম ব্লকে সতর্কতা জারি করা হয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই সংকোশ নদী সংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করতে শুরু করে প্রশাসন। কুমারগ্রাম চা-বাগান, কুমারগ্রাম বনগ্রাম, পাকড়িগুড়ি, ভোলকা-সহ নদীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাঁও সংকোশ নদীর ধারে বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার আবেদন জানান। প্রশাসনের আশঙ্কা ছিল, ভুটানের হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসা জল নদীতে পৌঁছলে আচমকা জলস্তর বেড়ে গিয়ে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
শুধু আলিপুরদুয়ার নয়, উত্তরবঙ্গের অন্যান্য নদী সংলগ্ন এলাকাতেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হয়। কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রক ও রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতরের সতর্কবার্তার ভিত্তিতে নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়।
১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানো
বন্যার আশঙ্কায় কুমারগ্রাম ব্লকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করে প্রশাসন। প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষকে অস্থায়ী ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। স্কুলের ভবন-সহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি, আরও ৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে অনেকে জাতীয় সড়কের উপরেও রাত কাটান বলে খবর। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর পাশাপাশি গবাদি পশুকেও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা SDRF-কে কাজে লাগানো হয়। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF-কেও প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখেন। ত্রাণশিবিরে শুকনো খাবার, পানীয় জল ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়।
এখন কেমন পরিস্থিতি আলিপুরদুয়ারে?
বৃহস্পতিবার রাতের উদ্বেগের পর শুক্রবার সকালে কিছুটা স্বস্তির খবর পাওয়া যায়। সংকোশ নদীর জলস্তর উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়েনি। ফলে কুমারগ্রামের ভুটান সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফেরে। যাঁরা নিরাপত্তার কারণে বাড়ি ছেড়েছিলেন, তাঁদের অনেকে বাড়ি ফেরার কথা ভাবতে শুরু করেন।
আলিপুরদুয়ারের পুলিশ সুপার অমিত কুমার শ জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সমন্বয় রেখে কাজ করছে। তবে নদীর জলস্তর ও জলের প্রবাহের উপর নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।






