বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড: ছাইয়ের স্তূপে চাপা পড়া রাজকীয় গল্প
Bourne and Shepherd: বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড কেবল ছবি তোলার জায়গা ছিল না, এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। উনিশ শতকের কলকাতায় প্রবাদ ছিল, "বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডে ছবি না তুললে আভিজাত্য প্রমাণ হয় না।" কাদের ছবি ছিল না তাদের আর্কাইভে? ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং থেকে শুরু করে লর্ড কার্জন— ভারতের মসনদে বসা প্রায় সব বড়লাটরাই এখানে পোজ দিয়েছেন।
কলকাতার ধর্মতলা চত্বর। ব্যস্ত শহরের হৃৎপিণ্ড। ট্রামের টিং-টিং, বাসের কালো ধোঁয়া, হকারদের চিৎকার আর নিত্যযাত্রীদের ইঁদুর দৌড়— এই নিয়েই ১৪১, এস এন ব্যানার্জি রোড। এই প্রবল কোলাহলের ঠিক মাঝখানেই, সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মৃতপ্রায় ইমারত। জরাজীর্ণ শরীর, পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে ইটের পঞ্জর। ছাদ নেই, মাথার ওপর আকাশটাই এখন তার একমাত্র আচ্ছাদন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হাজারো মানুষ হয়তো খেয়ালও করেন না, এই হাড়গোড় বের করা বাড়িটি আসলে ইতিহাসের এক বিশাল মহাফেজখানা। নাম— বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড (Bourne & Shepherd)।
একসময় এই বাড়ির গায়ে গর্বের সঙ্গে ঝুলত একটি হলুদ বোর্ড, যাতে লাল হরফে লেখা ছিল নামটা। এটি কেবল কোনো দোকান ছিল না; এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং এশিয়ার প্রাচীনতম সচল ফটোগ্রাফিক স্টুডিও। আজ সেই স্টুডিওর শাটার চিরতরে বন্ধ, কিন্তু তার প্রতিটি ইটের ভাঁজে লুকিয়ে আছে সাহেব-বিবি, রাজা-মহারাজা আর পুরনো কলকাতার সাদা-কালো সোনালী দিনের গল্প।
এই স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়েছিল ক্যামেরার শাটার টেপার অনেক আগে। সালটা ১৮৪০। উইলিয়াম হাওয়ার্ড নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক কলকাতায় প্রথম ফটোগ্রাফি স্টুডিও খোলেন। তখন ফটোগ্রাফি আজকের মতো সহজ ছিল না, ছিল এক জাদুকরি বিদ্যা। এর ঠিক কিছু বছর পর, ১৮৬৩ সালে ভারতে পা রাখেন স্যামুয়েল বোর্ন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার এবং শিল্পী। অন্যদিকে ছিলেন চার্লস শেফার্ড, যার দক্ষতা ছিল ছবি প্রিন্ট করায়।
ভাগ্য বা সময়ের টানে এই দুই প্রতিভাবান মানুষ এবং উইলিয়াম হাওয়ার্ড এক সুতোয় বাঁধা পড়েন। প্রথমে সিমলা, তারপর কলকাতা— ১৮৬৬ সাল নাগাদ জন্ম নিল 'বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড'। হাওয়ার্ড ততদিনে পাট চুকিয়েছেন, তাই স্যামুয়েল আর চার্লসের নামেই শুরু হলো এক ঐতিহাসিক পথচলা। সে যুগে এই স্টুডিওটি ছিল প্রাচ্যের বিস্ময়। ইউরোপের ভিয়েনা বা লন্ডনের নামীদামি স্টুডিওর সাথে পাল্লা দিত কলকাতার এই প্রতিষ্ঠান।
স্যামুয়েল বোর্ন (বাঁদিকে) ও চার্লস শেফার্ড (ডানদিকে), ছবি সৌজন্য: ARTISERA
বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড কেবল ছবি তোলার জায়গা ছিল না, এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। উনিশ শতকের কলকাতায় প্রবাদ ছিল, "বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডে ছবি না তুললে আভিজাত্য প্রমাণ হয় না।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khidirpur Dock: সুকুমার সেন, 'বাংলার স্থাননাম' গ্রন্থে, খিদিরপুরের নামের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছেন, এটি খিঞ্জিরপুরের অপভ্রংশ। আরবি শব্দ খিঞ্জিরের অর্থ হল শুয়োর। একসময় গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে শুয়োর দেখা যেত।
কাদের ছবি ছিল না তাদের আর্কাইভে? ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং থেকে শুরু করে লর্ড কার্জন— ভারতের মসনদে বসা প্রায় সব বড়লাটরাই এখানে পোজ দিয়েছেন। ১৯১১ সালে যখন পঞ্চম জর্জ ভারত সফরে আসেন, তখন তাঁর ও রানী মেরির রাজকীয় ছবি তোলার দায়িত্ব পেয়েছিল এই স্টুডিও। তাদের কাজের নিখুঁত ফিনিশিং আর আলোর ব্যবহার এতটাই রাজকীয় ছিল যে, ব্রিটিশ রাজপরিবার তাদের 'কাইজার-ই- হিন্দ' (Kaiser-i-Hind) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
১৯১১-র দিল্লি দরবার, রাজা পঞ্চম জর্জ ও রানী মেরি মঞ্চে বসে রয়েছেন, ছবি সৌজন্য: ARTISERA
তবে কেবল সাহেবরাই নন, ভারতের নবজাগরণের আইকনরাও ধরা দিয়েছিলেন এদের লেন্সে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত চিন্তামগ্ন ছবি, কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ছোটবেলার ছবি— সবই এদের তোলা। এমনকি শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের যে বিখ্যাত সমাধিস্ত ছবিটি আজ ঘরে ঘরে পূজিত হয়, সেটিও এই স্টুডিওর ক্যামেরাতেই বন্দি হয়েছিল। ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার সেই ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত ছবিগুলোও ছিল এদেরই সৃষ্টি। 'জাঙ্গল বুক'-এর স্রষ্টা রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
স্টুডিওর চার দেওয়ালের বাইরেও বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের অবদান ছিল অসামান্য। স্যামুয়েল বোর্ন ছিলেন একজন অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের প্রকৃত রূপ কেবল স্টুডিওর কৃত্রিম আলোয় নয়, লুকিয়ে আছে দুর্গম পাহাড়ে।
১৮৮০ সালের দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের লুপ, ছবি সৌজন্য: Tasveer
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।
১৮৬০-এর দশকে, যখন যাতায়াতের সুব্যবস্থা ছিল না, তখন তিনি প্রায় ৩০০০ থেকে ১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় হিমালয়ে অভিযান চালান। সঙ্গে ছিল বিশাল ক্যামেরার সরঞ্জাম, কাঁচের প্লেট আর রাসায়নিকের বোতল— যা বহন করতে লাগত জনা পঞ্চাশেক কুলি। তাঁর তোলা হিমালয়ের সেই ল্যান্ডস্কেপগুলো আজও ফটোগ্রাফির ইতিহাসে বিস্ময়। ভারতের ভূ-প্রকৃতিকে বিশ্বের দরবারে প্রথম তুলে ধরেছিল এই স্টুডিওটিই।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত স্টুডিওটির রমরমা ছিল দেখার মতো। কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলো। ইংরেজরা চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল তাদের স্মৃতি। বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড তখন ভারতীয়দের হাতে। মালিকানা বদল হতে হতে একসময় এর দায়িত্ব নেন জয়ন্ত গান্ধী।
ততদিনে প্রযুক্তি পাল্টাচ্ছে। বড় বড় বক্স ক্যামেরা আর কাঁচের প্লেটের জায়গা নিচ্ছে ফিল্ম রোল। এরপর এল রঙিন ছবি। বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগের ঝড়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি এই প্রবীন প্রতিষ্ঠানটি। তবুও, পুরনো দিনের এক বিশ্বস্ত অভিভাবকের মতো সে দাঁড়িয়ে ছিল।
১৮৬৪ সালে শিমলায় ভাইসরয়ের এক্সেকিউটিভ কাউন্সিল এবং সেক্রেটারিরা, ছবি সৌজন্য: thewire.in
বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। এক অভিশপ্ত সকাল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল এস এন ব্যানার্জি রোডের এই ঐতিহাসিক বাড়িটি। আগুনের লেলিহান শিখা কেবল কাঠ আর পাথর পোড়ায়নি, পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল প্রায় দেড়শ বছরের সঞ্চিত অমূল্য ইতিহাস।
আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় স্টুডিওর মূল আর্কাইভ। যেখানে সংরক্ষিত ছিল ১৮৪০ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত তোলা হাজার হাজার দুর্লভ গ্লাস নেগেটিভ। পুড়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের পোট্রেট, পুরনো কলকাতার দুর্লভ দৃশ্য এবং রাজকীয় সব নথি। দমকল কর্মীরা যখন আগুন নেভাল, তখন পড়ে আছে কেবল ছাই। সেই ছাইয়ের স্তূপে চাপা পড়ে গিয়েছিল বাঙালির এক বড় আবেগের অধ্যায়। যে ক্ষতি সেদিন হয়েছিল, তা পূরণ করার ক্ষমতা কারোর ছিল না।
আগুনের পরেও ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে ছিল স্টুডিওটি। নিচতলায় টিমটিম করে জ্বলত আলো। কিন্তু বিপদ পিছু ছাড়েনি। বাড়ির মালিকানা নিয়ে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (LIC)-র সঙ্গে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় সেই মামলা। লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন দাবি করে, বাড়িটি বিপজ্জনক এবং মেরামতের অযোগ্য।
২০১১-র কলকাতার বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড স্টুডিও বিল্ডিং , ছবি সৌজন্য: thewire.in
দীর্ঘ ১৪ বছর মামলা চলার পর, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে আসে সেই চূড়ান্ত রায়। আদালতের নির্দেশে চিরতরে বন্ধ করে দিতে হয় বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের দরজা। ১৬ এপ্রিল, ২০১৬— যেদিন শেষবারের মতো তালা ঝুলল গেটে, সেদিন হয়তো নীরবে কেঁদেছিল কলকাতার ফটোগ্রাফি প্রেমীরা। এশিয়ার প্রাচীনতম স্টুডিওটি হার মানল রিয়েল এস্টেট আর আইনি জটিলতার কাছে।
আজ ১৪১, এস এন ব্যানার্জি রোডের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় এক কঙ্কালসার অট্টালিকা। জানলা দিয়ে উঁকি মারে বটগাছের শিকড়। ভেতরে এখন আর ফ্ল্যাশবাল্ব জ্বলে না, কেউ বলে না "স্মাইল প্লিজ"। কিন্তু বাতাসে কান পাতলে হয়তো শোনা যায় স্যামুয়েল বোর্নের ক্যামেরার খচখচ শব্দ, কিংবা চার্লস শেফার্ডের ব্যস্ত পায়ের আওয়াজ।
বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড আজ শুধুই ইতিহাস। কিন্তু এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কলকাতা একদিন কতটা রাজকীয় ছিল। নতুন শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্সের ভিড়ে এই ভাঙা বাড়িটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।







