সুতোয় ঝুলছে জীবন, তবুও দিনের শেষে ফুটবলই বেঁচে থাকার সঙ্গী পেলের
Pele Health Condition : ফুটবল মাঠে যেভাবে রাজত্ব করেছেন, ব্রাজিলকে তিনটে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, সেভাবেই এই লড়াইটাও জিতে যাবেন।

হাসপাতালের ছিমছাম একটা ঘর। সেখানেই সাদা বিছানায় শুয়ে আছেন ক্লান্ত এক ব্রাজিলিয়ান। চেহারা একটু ভারী হয়ে গিয়েছে, নাকে নল। তিনি শুয়ে আছেন, আর বুকের ওপর মাথা রেখে তাঁকে জড়িয়ে ধরে আছে একজন। তাঁর মেয়ে। প্রাণপণে তিনি জাপটে ধরে আছেন তাঁর বাবাকে। ক্রিসমাসের একদিন আগে এমন ছবি দেখে মন ভারাক্রান্ত। ছবিতে থাকা মানুষটি যে আর কেউ নন, স্বয়ং পেলে।
বিশ্বকাপ ফুটবল তখন সবে শুরু হয়েছে। হঠাৎই খবর এল, পেলে হাসপাতালে ভর্তি। সাও পাওলোর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে গিয়েছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের উৎকণ্ঠা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বকাপের মুহূর্তে হঠাৎ কেন এমন খবর? ভক্তদের আকুতিতে শেষমেশ উত্তর দেন ফুটবল সম্রাট। ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি ফুটবলার হাসপাতাল থেকেই ভিডিও করে ফ্যানদের আশ্বস্ত করেন। রুটিন চেকআপ মাত্র; প্রায়ই যেমন হাসপাতালে আসতে হয়, সেরকমই। তাঁর মেয়ে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বলে, চিন্তার কোনও কারণ নেই।
কিন্তু পরিস্থিতি যে সেরকম নয়, বোঝা গেল কয়েকদিন পর। হঠাৎই খবর আসে, পেলের অবস্থা সংকটজনক। ক্যানসারে আক্রান্ত পেলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কেমোথেরাপি কোনও কাজ করছে না। ক্যানসার কোষের ওপর কোনও প্রভাব ফেলছে না। বাধ্য হয়ে তাঁকে হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়। বিশ্বকাপের মধ্যেই গোটা বিশ্ব তাঁর সুস্বাস্থ্যের প্রার্থনা শুরু করে। কাতারের স্টেডিয়ামে পেলের বিশাল কাট আউট, খেলার আগে ফুটবল সম্রাটের সুস্থতা কামনায় ব্রাজিল দল। ফিফা নিজেও পেলের মঙ্গলকামনা করে পোস্ট দিয়েছিল। যাই হয়ে যাক, পেলের যেন কিছু না হয়, গোটা বিশ্বের প্রার্থনা ছিল এটি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2022 : ম্যাচ শেষের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে এল তাঁর লেখা। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে তিনি মনে করছেন তাঁর আর্জেন্টাইন বন্ধুকে।
কিন্তু শরীর যেন সেই কথা শুনছে না। ক্যানসার অ্যাডভান্সড স্টেজে চলে গিয়েছে। কিডনি, শ্বাসনালিতেও সংক্রমণ হয়েছে। অবস্থা একটু একটু করে খারাপ হচ্ছে। স্পেনের সংবাদমাধ্যম মার্কা জানাচ্ছে, পেলের মেয়ে কেলি নাসচিমেন্তো সবসময় বাবার সঙ্গে রয়েছেন। তিনিও লড়ছেন, তাঁর সঙ্গে লড়ছে গোটা পরিবার। অদৃশ্যে রয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। লড়াইয়ের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন না কেলি। প্রবল বিশ্বাস রেখেছেন, বাবা জিতে যাবেন। ঠিক জিতবেন। ফুটবল মাঠে যেভাবে রাজত্ব করেছেন, ব্রাজিলকে তিনটে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, সেভাবেই এই লড়াইটাও জিতে যাবেন।
A lot of news coming out about Pelé, but so far nothing official.
Pelé’s daughter published this picture saying, “We continue in the fight and in faith”.
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2022 : ডাক্তাররাও চিন্তিত তাঁকে নিয়ে। কিন্তু ব্রাজিলের ম্যাচ থাকলে পেলে যেন অন্য এক গ্রহের বাসিন্দা হয়ে যান।
— Diego Montalvan (@DMontalvan)
জীবনের এমন দোলাচলে পেলে কিন্তু রয়েছেন ফুটবলেই। শয্যাশায়ী, শরীরে যন্ত্রণা, ক্যানসারের অত্যাচার – তবুো মনে মনে এখনও ছোটবেলার সেই মাঠে ছুটছেন। পায়ে বল নাচাচ্ছেন। ফুটবল, সেই ফুটবলই পেলের জিয়নকাঠি। তার প্রমাণ দেখা গিয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপে। হাসপাতালের রোগশয্যায় শুয়েও কাতারের যাবতীয় খবর রাখছেন তিনি। ফুটবল দেখছেন। দেখছেন ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দ।
কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে অকস্মাৎ হার ব্রাজিলের। মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নেইমার। কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন তিতে। আন্তর্জাতিক জার্সি গায়ে আর নামবেন কিনা, সেই ধন্দ রাখলেন নেইমারও। এমন ভারাক্রান্ত পরিস্থিতিতেই অভিভাবকের মতো এসে দাঁড়ালেন পেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন লম্বা একটি পোস্ট। নেইমারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তিনি, ব্রাজিলের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। সাম্বা ঠিক ফিরবে, আবার ময়দান মাতাবে, হাসপাতাল থেকে ভরসা দিচ্ছেন পেলে।
তারপর বিশ্বকাপ ফাইনাল। মেসিরা জেতার পর ফের পেলের পোস্ট। তাঁর কেবল মনে পড়ছে এক আর্জেন্টাইন বন্ধুর কথা। দিয়েগো মারাদোনা। ২০২০ সালের নভেম্বর যাকে অকালে কেড়ে নিয়ে গেল। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ। মেসির হাতে সেই বিশ্বকাপ দেখে পেলে লিখলেন, “দিয়েগো এবার শান্তিতে হাসবে।” বুকে জড়িয়ে ধরলেন কিলিয়ান এমবাপেকে। স্যালুট জানালেন মরক্কোকে।
ফুটবল… সেই ফুটবলই ছিল তাঁর জীবনের মন্ত্র। অক্সিজেন। ফুটবল আর পেলে যেন হরিহর আত্মা। কখন কেমন খবর আসবে, কেউ জানে না। কিন্তু এটা সবাই জানেন, পেলে এখনও নিজের মনে মনে দুরন্ত ভলি মারছেন। জোরালো শটে বল জড়িয়ে পড়ছে জালে। জীবনযুদ্ধও যেন এরকম তুড়ি মেরে জিতে আসেন, সেটাই প্রার্থনা। মেয়ে কেলি জড়িয়ে আছেন। জড়িয়ে আছে ফুটবল দুনিয়া। একটাই বাক্য, পেলে, সুস্থ হয়ে উঠুন।







