মানুষ কি চুম্বক হয়ে উঠতে পারে?

Biomagnetism: আমাদের হৃদযন্ত্র, মাথা যে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, তো লোহা বা কোনও চৌম্বক পদার্থকে তো কখনও আকর্ষণ করে না, কেন?

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
মানুষ কি চুম্বক হয়ে উঠতে পারে?

এই যে আমরা ছুটির দিন অলস মস্তিষ্কে ড্রয়িং রুমে বসে অখণ্ড অবসর কাটাই, তখন আমাদের শরীর যতই আরামে থাকুক না কেন, তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্রিয়াকলাপ চলতেই থাকে। বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখেছেন, বেশিরভাগ মানবকোষ বিশ্রাম নেওয়ার সময় ১০০ ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে! আমরা জানি, গতিশীল তড়িৎআধান চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। মানবদেহে, বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংযোগকারী চ্যানেল এবং পাম্পগুলি তড়িৎগ্রস্থ পরমাণুগুলিকে অর্থাৎ আয়নগুলিকে চারপাশে ঠেলে সরিয়ে দেয়, ফলে চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Bio magnetism’ বা ‘জৈব চৌম্বকতত্ত্ব’।

১৯৬৩ সালে জি. বাউলে এবং আর. ম্যাকফি নামে দুই বিজ্ঞানী সর্ব প্রথম জৈব চৌম্বকত্বের সন্ধান পান। তাঁরা ইন্ডাকশন কয়েল ব্যবহার করে মানুষের হৃৎপিণ্ডের চারপাশে বিরাজমান চৌম্বকক্ষেত্র শনাক্ত করছিলেন। সেই সময় সন্ধান মেলে জৈব চৌম্বকতত্ত্বের। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিটি হৃদস্পন্দনেই তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎপত্তি হয় এবং মানবশরীর থেকে প্রায় ০.৯ মিটার দূরে হৃদস্পন্দনের ফলে সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র শনাক্ত করা সম্ভব; এককথায় হৃৎপিণ্ড মানবশরীরের চৌম্বকক্ষেত্র তৈরির অন্যতম একটি উৎস।

কেবল হৃৎপিণ্ড নয়, আমাদের মস্তিষ্কও চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যার পারিভাষিক নাম ‘নিউরোম্যাগনেটিক ক্ষেত্র’। দরকার পড়লে ডাক্তাররা এটি পরিমাপ করে থাকেন — যেটি ‘ম্যাগনেটোএনসেফালোগ্রাফি’ (MEG) নামে পরিচিত। এটি একটি নন-ইনভেসিভ ইমেজিং কৌশল যা মস্তিষ্কের নিউরন দ্বারা উৎপাদিত চৌম্বক ক্ষেত্র পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়। এটি সরাসরি মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপ করে। মস্তিষ্কের আভ‍্যন্তরীণ কার্যকলাপ কখন এবং কোথায় ঘটে সে সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য প্রদান করে এই MEG। সেইজন্য মৃগীরোগ এবং খিঁচুনির কারণ নির্ধারণের জন্য এটি বিশেষভাবে কার্যকরী। এছাড়া চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের টিউমার অথবা নিউরোসার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারের আগে রোগীদের মস্তিষ্কের ম্যাপিংয়ের জন্য MEG ব্যবহার করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এলইডি-তে বহুল ব্যবহার, যে প্রযুক্তির আবিষ্কার বিজ্ঞানী-ত্রয়কে এনে দিল রসায়নে নোবেল

Nobel Prize 2023 in Chemistry: যে কোয়ান্টাম ডট বিপুলভাবে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক এলইডি টিভিস্ক্রিন ও মনিটরে, সেই কোয়ান্টাম ডট আবিষ্কার ও নির্মাণের জন্যে ২০২৩ সালে রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পাচ্ছেন তিন বিজ্ঞানী।

MEG মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের ফলে উৎপন্ন ক্ষুদ্র চৌম্বকক্ষেত্রকে শনাক্ত করে। এই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি পরিমাপ করতে ব‍্যবহার করা হয় ‘সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম ইন্টারফেরেন্স ডিভাইস’ বা SQUIDs নামের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র, যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে কোটি কোটি গুণ ছোট চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন পর্যন্ত শনাক্ত করতে সক্ষম। এতে যেহেতু বিকিরণ জনিত সমস্যা নেই, তাই এটি বিভিন্ন ক্লিনিকাল এবং গবেষণার ক্ষেত্রে নিরাপদে ব্যবহার করা হয়।

তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে মনে যে, আমাদের হৃদযন্ত্র, মাথা যে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, তো লোহা বা কোনও চৌম্বক পদার্থকে তো কখনও আকর্ষণ করে না, কেন? আসলে ধাতব পদার্থকে কাছে টানতে গেলে যে তীব্রতার চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রয়োজন পড়ে, সেই তুলনায় আমাদেরটা অনেক কম। হৃৎপিণ্ডের চৌম্বক ক্ষেত্রের মান ৫০ থেকে ১০০ পিকোটেসলা পর্যন্ত হয়। একটি ম‍্যাগনেটিক রেসোন‍্যান্স ইমেজিং (এমআরআই) মেশিন এক পিকোটেসলার শক্তির এক মিলিয়নেরও কম মাত্রার চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। যদিও বিশ্বজুড়ে এমন অনেক মানব চুম্বক রয়েছেন, যাঁরা দাবি করেন যে তাঁদের ত্বক ধাতু আঁকড়ে রাখতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এটি কেবল চর্বিযুক্ত স্তরের একটি উদাহরণ যা ত্বককে ঢেকে দেয় এবং চামচ ও কাঁটার মতো জিনিসগুলিকে আঁকড়ে রাখতে সহায়তা করে মাত্র।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আপনার শরীরের প্রেমে পড়তে পারে মশারাও! 'মশক চুম্বকে'র গবেষণায় মিলল অবিশ্বাস্য তথ্য

Mosquito Magnet: মশার জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে, ঘ্রাণশক্তিকে বিনষ্ট করে তার মানুষ চেনার ক্ষমতা নষ্ট করা এখনও সম্ভব হয়নি।

শুধু মানুষ বা প্রাণীরাই নয়, উদ্ভিদরা চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে কিনা, ২০২১ সালে সেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিলেন একদল গবেষক। তাঁরা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ নামক একটি উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করেন, যেটি শিকার ধরতে বৈদ্যুতিক সংকেত বা electric signal ব্যবহার করে। জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত জাতীয় মেট্রোলজি ইনস্টিটিউটে পরীক্ষার সময় একটি চৌম্বকীয়ভাবে সুরক্ষিত ঘরে তাঁরা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ স্থাপন করেন। এর ফলে বাইরের কোনও চৌম্বক ক্ষেত্র বা তড়িৎ ক্ষেত্রের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে কেবল উদ্ভিদের দ্বারা উৎপন্ন চৌম্বক ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের চেষ্টা করেন। শিকার ধরার মুহূর্তে চৌম্বক ক্ষেত্রের সম্ভাব্য মান পরিমাপের জন্য তাঁরা অ‍্যাটমিক ম‍্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করেন।তাঁরা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের ট্রাপ বা ফাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ মিলিমিটার দূরে প্রায় ০.৫ পিকোটেসলা মান বিশিষ্ট চৌম্বকক্ষেত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পান।

চৌম্বকীয় ক্ষেত্র শনাক্ত করতে সক্ষম এমন প্রাণীও অনেক আছে। এই বিশেষ ক্ষমতার নাম ম‍্যাগনেটো বিসেপশন। এই ক্ষমতার ডানায় ভর করে পরিযায়ী পাখিরা তাদের রাস্তা খোঁজে।

ছোটবেলায় পড়া যে, পৃথিবী একটি বিশাল চুম্বক। দণ্ড চুম্বক বা চুম্বক শলাকার মতো এটির ও উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থাকে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে কেবল আমাদের পৃথিবী একা নয়, বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী, এমনকী আমরা নিজেরাও বিভিন্ন মাত্রার চুম্বকক্ষেত্রের উৎস।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।