AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?
Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।
চারদিকে এখন যা শুরু হয়েছে, তাকে অনায়াসে উনিশ শতকের সেই পুরনো ‘গোল্ড রাশ’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। ১৮৪৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ সেখানে ছুটে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগই ফিরেছিল খালি হাতে।
আসল লাভ করেছিল তারাই, যারা বুঝেছিল সোনা খোঁজার চেয়ে সোনা খোঁজার সরঞ্জাম বিক্রি করা অনেক বেশি লাভজনক ব্যবসা।
আজকের এআই (AI) যুগেও গল্পটা ঠিক একই রকম। আসল সোনা ক’জন পাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় আছে; কিন্তু চ্যাটবটের সাবস্ক্রিপশন আর নানা ধরনের ‘এআই কোর্স’ বিক্রি করে যারা কোদাল বিক্রেতা হয়ে উঠেছে, তাদের ব্যবসা এখন রমরমা।
মহাবিশ্বের মতো জটিল ব্যবস্থার কথা বাদ দিলেও, মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা বা তথাকথিত ‘হিউম্যান ইনটেলিজেন্স’ এখন নিজের ক্ষেত্রেও শর্টকাট খুঁজছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শব্দটি এখন পানের দোকান থেকে পার্লামেন্ট—সব জায়গাতেই শোনা যাচ্ছে। তবে একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায়, গোটা বিষয়টি আসলে মানুষের আদিম আলস্য আর লোভের এক নতুন মোড়ক মাত্র।
ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।
এই আশঙ্কা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৩০ সালে অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স তাঁর ‘ইকোনমিক পসিবিলিটিজ ফর আওয়ার গ্র্যান্ডচিলড্রেন’ (Economic Possibilities for our Grandchildren) প্রবন্ধে অনুমান করেছিলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে মানুষকে সপ্তাহে হয়তো মাত্র পনেরো ঘণ্টা কাজ করতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nobel Prize in Chemistry 2024: কম্পিউটারকে ব্যবহার করে প্রকৃতিতে অনুপস্থিত এমন কিছু নতুন ধরনের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকেই বলে কম্পিউটেশনাল প্রোটিন ডিজাইন।
প্রায় একশো বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ভবিষ্যৎ আসেনি। প্রযুক্তি কাজের ধরন বদলেছে, কিছু কাজ কমিয়েছে আর অনেক কাজের গতি বাড়িয়েছে ঠিকই; কিন্তু মানুষকে অবসর দেওয়ার বদলে তৈরি করেছে নতুন কাজের বোঝা। এখন মানুষের সেই নতুন কাজেরই একটা বড় অংশ হলো মেশিনকে ঠিকঠাক নির্দেশ দেওয়া।
সৃজনশীলতার একটা বড় অংশ এখন চলে যাচ্ছে অ্যালগরিদমের হাতে। মানুষ ভেবেছিল সে ঈশ্বরের মতো কিছু একটা তৈরি করবে। অথচ নিউরাল নেটওয়ার্ক বানাতে গিয়ে সে যেন নিজের ভাবনার ক্ষমতাকেই কিস্তিতে কিস্তিতে ক্লাউডে তুলে দিল।
প্রযুক্তি শীর্ষে পৌঁছলেই যে মানুষের চিন্তাশক্তিও শীর্ষে থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যন্ত্র যত বেশি মানুষের হয়ে কাজ করতে শুরু করে, নিজের ভাবনার দায়িত্বটুকু তার উপর ছেড়ে দেওয়ার প্রলোভনও তত বাড়ে। আমরা হয়তো এখন সেই জায়গাটার কাছাকাছি।
২০০৬ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ ক্লাইভ হাম্বি বলেছিলেন, “ডেটা হলো নতুন তেল।” কথাটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও এর মধ্যে একটা সতর্কবার্তাও ছিল। মাটির নিচের তেলের মতো ডেটার আসল মূল্য কেবল মজুত করায় নয়, তাকে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ক্ষমতায়।
আজ সেই নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু প্রযুক্তি সংস্থার হাতে। তারা শুধু তথ্য জমিয়ে রাখছে না; কোন তথ্য মানুষের সামনে আসবে আর কোনটা আড়ালে হারিয়ে যাবে, তা-ও ঠিক করে দিচ্ছে তাদের তৈরি অ্যালগরিদম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Intelligence: যদি প্রযুক্তির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, AI যদি নিজের মতো করে চিন্তা করতে শুরু করে, তখন কী হবে? আমরা AI-কে ঠিক কতটা বিশ্বাস করতে পারি?
করপোরেট দুনিয়া মানুষকে যেন শেখাতে চাইছে যে আলাদা করে আর চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। চিন্তা করার জন্য চ্যাটবট আছে, শুধু সাবস্ক্রিপশনটা প্রতি মাসে রিনিউ করলেই হলো।
তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। বিবর্তন ঠিক এভাবেই কাজ করে; পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বদলালে মানুষকেও নিজের অভ্যাসে বদল আনতে হয়।
এখানে একটা মজার তথ্য বলে রাখা ভালো, ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ কথাটি কিন্তু চার্লস ডারউইনের নিজস্ব নয়। দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সার ডারউইনের ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ পড়ার পর প্রথম এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তী সংস্করণে ডারউইন নিজেই কথাটি গ্রহণ করেন।
ইতিহাস অনেক সময় এভাবেই ভুল কৃতিত্ব বিলিয়ে দেয়। ঠিক যেমন এআইয়ের তৈরি লেখা দেখে মানুষ আজ ভুলে যাচ্ছে আসল কৃতিত্ব কার—লেখকের, অ্যালগরিদম মডেলের, নাকি সেই কোটি কোটি মানুষের, যাঁদের লেখা দিয়ে মডেলটি প্রশিক্ষিত হয়েছে?
ডারউইন বেঁচে থাকলে হয়তো আজ লিখতেন, ‘সার্ভাইভাল অব দ্য স্মার্টেস্ট অ্যালগরিদম’।
দিনশেষে এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) কোনো জাদু নয়। মানুষের তৈরি বিপুল পরিমাণ ভাষা থেকে শেখা বিন্যাস, সম্পর্ক আর ব্যাকরণের কাঠামোর উপর দাঁড়িয়েই তার এই ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাই একে এক অর্থে মানুষেরই তৈরি এক সুবিশাল আয়না বলা যায়। আয়নায় নিজেকে হঠাৎ অন্য রূপে দেখে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, এআইয়ের ক্ষমতা দেখেও ঠিক তা-ই হচ্ছে।
কথাটা নেহাত কল্পনা নয়। ২০২৩ সালে গুগলের প্রাক্তন গবেষক জিওফ্রি হিন্টন—যাঁকে অনেকে আধুনিক এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বলেন—চাকরি ছেড়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছিলেন এই প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে। যে মানুষটি নিজে এই প্রযুক্তির বিকাশে এত বড় ভূমিকা নিয়েছেন, তিনি যখন এর সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন সেই সতর্কবার্তাকে লঘু করে দেখার আর কোনো সুযোগ থাকে না।
আসল লড়াইটা মেশিনের বুদ্ধি বাড়ানোর নয়। আসল লড়াই হলো এই আর্টিফিশিয়াল ঝড়ের মধ্যে মানুষের সহজাত কাণ্ডজ্ঞান আর শুভবুদ্ধিটুকুকে বাঁচিয়ে রাখা। তা না হলে মানুষ হয়তো নিজেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে উত্তর দেওয়ার জন্য হাজারটা মেশিন থাকবে, কিন্তু সঠিক প্রশ্ন করার মতো মানুষ আর থাকবে না।
১৯৭৯ সালে পিংক ফ্লয়েডের কালজয়ী অ্যালবাম ‘দ্য ওয়াল’ (The Wall) প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই অ্যালবামের কেন্দ্রে ছিল বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব আর নিজের চারপাশে গড়ে তোলা মানসিক দেওয়াল। আজকের প্রেক্ষাপটে গানটা গেয়েও হয়তো আর কোনও লাভ হবে না। কারণ সেই দেওয়ালে আমরা নিজেরাই ইটের পর ইট গেঁথে ফেলেছি। এবার প্রতিটা ইট তৈরি হচ্ছে এক একটা প্রম্পট থেকে।
যন্ত্র প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। হয়তো এমন প্রশ্নেরও উত্তর দেবে, যার উত্তর খুঁজতে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিংবা কয়েক বছর লেগে যেত। কিন্তু ঠিক প্রশ্নটা করার বুদ্ধি, উত্তরের উপর সন্দেহ করার সাহস, আর নিজের মাথায় চিন্তা করার অভ্যাসটুকু যদি হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেই হাজার হাজার সঠিক উত্তরেরও শেষ পর্যন্ত কোনো মূল্য থাকবে না।






