এক দেশ এক ভাষা! দেশজুড়ে হিন্দিতে পঠনপাঠনের সুপারিশের আড়ালে কোন বার্তা দিল কেন্দ্র
Hindi Imperialism: ‘এক দেশ, এক ভাষা’ নীতি রূপায়ণের জন্যই হিন্দিতে পাঠদানের নিদান দেওয়া হয়েছে?

ভারতে জন্মালেও ভারতীয় হয়ে ওঠায় নাকি খামতি রয়ে গিয়েছে! তাই নাগরিকদের প্রকৃত অর্থে ভারতীয় করে তোলার চেষ্টা চলছেই। উঠতে-বসতে দেশভক্তি, জাতীয়বাদের নিত্যনতুন সংজ্ঞা তুলে ধরা হচ্ছে। তারই আওতায় এবার ভারতীয়দের জন্য একটিমাত্র ভাষা নির্ধারণ করার জিম্মা কাঁধে তুলে নিয়েছে সরকার। দেশের সমস্ত কারিগরি এবং অকারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ভারতীয় ভাষা’-য় শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে তারা। ‘ভারতীয় ভাষা’ কথাটি যদিও আলঙ্কারিক মাত্র। আসলে ‘এক দেশ, এক ভাষা’ নীতি রূপায়ণে, হিন্দিতেই পাঠদানের নিদান দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি হিন্দি বাধ্যতামূলক করার পক্ষে সুপারিশ করেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে সেইমতো রিপোর্ট জমা পড়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘দেশের সমস্ত কারিগরি এবং অকারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান এবং যাবতীয় কাজকর্মের মাধ্যম হতে হবে হিন্দি। ইংরেজির ব্যবহার ঐচ্ছিক হতে হবে।' কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে যে যে প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে দেশের সমস্ত আইআইটি, ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট এবং অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটউট অফ মেডিক্য়াল সায়েন্সেস (এইমস)। অকারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধরা হয়েছে সমস্ত কেন্দ্রীয় ও নবোদয় বিদ্যালয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে।
শুধুই হিন্দিতে পাঠদান বাধ্যতামূলক করার কথাই বলা হয়নি ওই রিপোর্টে, চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজি ভাষার প্রশ্নপত্র তুলে দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, ‘অনেক চাকরির পরীক্ষায় হিন্দিতে প্রশ্নপত্র তৈরি হয় না। বরং ইংরেজিকেই বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরা হয়। ফলে চাকরিপ্রার্থীও হিন্দির পরিবর্তে ইংরেজিকেই গুরুত্ব দেন। তাই ইংরেজিতে প্রশ্নপত্র তৈরির বাঁধাধরা রেওয়াজ তুলে দিয়ে হিন্দিকেও রাখতে হবে। চাকরির পরীক্ষায় যোগ্যতম প্রার্থী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ঝালিয়ে নিতে হবে। তাই ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দিতে প্রশ্নপত্র তৈরি বাধ্যতামূলক করতে হবে।'
হাই কোর্টের রায় থেকে আদালতের কাজকর্মের ক্ষেত্রেও হিন্দিকে মাধ্যম করে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কাছে। শুধু তাই নয়, হিন্দিভাষী রাজ্যে থেকেও যে সমস্ত সরকারি কর্মী হিন্দি ব্যবহারে অনাগ্রহী, তাঁদের সতর্ক করতে হবে বলেও মত শাহের কমিটির। বলা হয়, ‘কিছু অফিসার এবং সরকারি কর্মীরা হিন্দি ব্যবহারে অনাগ্রহী বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের সতর্ক করে দিতে হবে। কেন এমন আচরণ, তার কৈফেয়ত চাইতে হবে। জবাব সন্তুষ্টজনক না হলে, বার্ষিক কাজের মূল্যায়নে (Annual Performance Assessment Report) বিষয়টির উল্লেখ রাখতে হবে।' রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্যতম আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত আধিকারিক, মন্ত্রকের চিঠি, ফ্যাক্স, ইমেল লিখতে, সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তৃতার ক্ষেত্রেও হিন্দি এবং স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mulayam Singh Yadav: ১৯৯৭ সালে দেবগৌড়া সরকারকে হটানোর পর তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সীতারাম কেশরী যখন প্রধানমন্ত্রী খুঁজছেন, সিপিএম নেতা হরকিষাণ সিং সুরজিৎ মুলায়মের নাম সুপারিশ করেন।
সংসদের এই কমিটি সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি করে রিপোর্ট জমা দেয়। এবার গত তিন বছরে এই নিয়ে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার সপক্ষে দু’টি রিপোর্ট জমা দিল ওই কমিটি। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে জমা দেওয়া রিপোর্টে এবার ১১২টি সুপারিশ রয়েছে। অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ আউন, ১৯৬৩-র আওতায় ১৯৭৬ সালে সংসদের ৩০ জন সদস্য, লোকসভা থেকে ২০ জন এবং রাজ্যসভা থেকে ১০ জন সদস্যকে নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়। এই মুহূর্তে কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান বিজু জনতা দলের ভ্রাতৃহারি মাহতাব। তিনি জানিয়েছেন, নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী হিন্দির সপক্ষে সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে হিন্দির সপক্ষে এই সুপারিশ নতুন কিছু নয়। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি-র অভিভাবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ যেমন আগাগোড়া ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিপন্ন করতে মরিয়া, একইভাবে গোড়া থেকে হিন্দিকে ভারতের প্রধান ভাষা করে তোলার সপক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে শাহকেও। এ বছর এপ্রিল মাসে সংসদীয় ভাষা কমিটির ৩৭তম বৈঠকে তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক করেছেন যে, সরকার চালানোর ক্ষেত্রে হিন্দিই হবে মাধ্যম। এতে হিন্দির গুরুত্বও বাড়বে। দেশের ঐক্য অটুট রাখতে হিন্দির দুরুত্ব বাড়ানোর এটাই আদর্শ সময়।’’ শাহ যখন বলেছেন, ধরে নেওয়া যায় প্রধানমন্ত্রীরও এই হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ায় সায় রয়েছে।
কিন্তু ভারত নামক যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ভাষাভাষীর ১৪০ কোটি নাগরিকের ওপর নিজেদের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে চাপিয়ে দেওয়া কি আদৌ যুক্তিযুক্তি? দেশের সংবিধান কি তার অনুমতি দেয়? এই প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক পর পর, রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ নিয়ে জোর তর্ক-বিতর্ক দেখা দেয় সংসদে। সেখানে ঔপনিবেশিক সূত্রে পাওয়া ইংরেজি ভাষার দখল ভাঙিয়ে সুফল লাভের কথা বলতে শোনা যায় জওহরলাল নেহরুকে। তাঁর যুক্তি ছিল, ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হয়ে উঠেছে। শেখা জিনিস ভুলতে হবে, সেই সুবাদে প্রাপ্য সুবিধা নেওয়া যাবে না, এই ধারণা অবাস্তব। পুরাতনকে ধরে রেথেই বিজ্ঞান, শিক্ষায় সমৃদ্ধ আধুনিক ভারতের মধ্যে সেতুবন্ধনের কথা বলেছিলেন তিনি।
শুধু নেহরুই নন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও হিন্দি ভাষার সুতোয় গোটা দেশকে বাঁধার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মত ছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞান, কারিগরি, সব ক্ষেত্রে হিন্দির ব্যবহার শুধুমাত্র হিন্দিভাষীদেরই সাহায্য করবে। বাংলা, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মাদ্রাজের মতো রাজ্যে শিক্ষা, জ্ঞানের আন্তঃরাজ্য আদানপ্রদান বিঘ্নিত হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর জন্য সমস্যায় পড়তে হবে ভারতকে। কিন্তু নেহরু বা শ্যামাপ্রসাদ, কারও মতামতই আজকের ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়নি। দ্বিতীয় ভাষা তো বটেই, মাতৃভাষা হিসেবেও দীর্ঘ সময় হিন্দির আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন দেশের একটি বড় অংশের নাগরিক। আধিপত্যের সামনে সেই মাথা নোয়ানোর উপরই এ বার আইনি সিলমোহর দেওয়ার পথে হাঁটছে মোদি-শাহর সরকার।
এই নিয়ে বিরোধীরা সরব হলেও, বিজেপি-র নেতা-মন্ত্রী এবং তাঁদের অনুগামীরদের আস্ফালনের সামনে ওজর-আপত্তি কার্যতই ফুৎকারে উড়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতেও পিছপা হচ্ছেন না সমাজের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল নাগরিকরা। সম্প্রতি তেমনই উদাহরণ তৈরি করেন বলিউড অভিনেতা অজয় দেবগণ। দক্ষিণের অভিনেতা কিচ্চা সুদীপের সঙ্গে বিতণ্ডা চলাকালীন হিন্দিকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অজয় একা নন, হিন্দির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে প্রায়শই এমন দাবি উঠতে দেখা যায়। এই মিথ্যে প্রচারের নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় চক্র। হিন্দিই দেশের প্রধান এবং জাতীয় ভাষা, এই ধারণাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য। আমাদের অবজ্ঞা, অজ্ঞতারই সুযোগ নিচ্ছে তারা।
হিন্দির এই জয়গানের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সংঘ-র ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ স্বপ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে হিন্দিভাষাও। বর্তমানে বিজেপি-র পক্ষে সমর্থনও আবর্তিত হচ্ছে হিন্দি বলয়ে। তার প্রতিদান হিসেবেই শিক্ষা, কর্মে হিন্দির গুরুত্ব বাড়িয়ে আসলে হিন্দিভাষীদের আধিপত্য কায়েম এবং অন্যদের কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, বহু ভাষাভাষীর দেশে পৃথক ভাষা পাঠদান অসম্ভব। তাই মাতৃভাষার বিকল্প হিসেবে একটি মাত্র জাতীয় এবং সর্বভারতীয় ভাষা নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু এর পিছনে যে হিন্দির আগ্রাসন জড়িয়ে, তা বুঝতে বাকি নেই ভাষা এবং অধিকার সচেতন মানুষ। তাই দক্ষিণ ভারতে হিন্দির এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। কিন্তু দেশের একটি বড় অংশের মানুষ নীরব থেকে এই আগ্রাসনকেই বৈধতা দিচ্ছেন।
ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি বিরোধিতার নেপথ্যে সরকার তো বটেই, তাদের নীতি-নিয়মের সমর্থকেরা ঔপনিবেশিক মানসিকতার ইঙ্গিত দেখতে পান। সেই নিরিখে বলে রাখা ভাল যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে অদ্বিতীয় ভাষা হিসেবেই বিরাজ করছে ইংরেজি। জার্মানি, জাপান, ফ্রান্সের মতো দেশ, যারা একসময় ঘোষিত ভাবে ইংরেজিকে পরিহার করে চলত, প্রয়োজনীয়তা বুঝে তারাও উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্রে ইংরেজিকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে। চিন, কোরিয়ার মতো দেশে ইংরেজি শিক্ষকের চাহিদা তুঙ্গে। সেখানকার মানুষ জন ছেলেমেয়েকে যত্ন করে ইংরেজি শেখাচ্ছেন। ইংরেজির প্রতি অমোঘ আকর্ষণ রয়েছে বলে নয়, তার ব্যবহারিক গুরুত্ব বুঝে। ঠিক তার উল্টোপথে হেঁটে হিন্দি এবং হিন্দুত্বকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে মাতৃভাষা এবং বৈশ্বিক ভাষা থেকে গোটা দেশকে বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা চলছে।






