‘হাত বাঁধা অবস্থায় কীভাবে বন্দুক ছিনিয়ে নিল?’ গাইঘাটায় ছেলের এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন মায়ের

Gaighata case: গাইঘাটায় কিশোরী ধর্ষণ ও খুনে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশের দাবি আত্মরক্ষার্থে গুলি, তবে হাত বাঁধা অবস্থায় পালানোর তত্ত্ব উড়িয়ে ‘খুন’-এর অভিযোগ তুলেছে পরিবার।

inscript
৩ মিনিট
‘হাত বাঁধা অবস্থায় কীভাবে বন্দুক ছিনিয়ে নিল?’ গাইঘাটায় ছেলের এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন মায়ের

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ১৭ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে বিতর্ক। একদিকে অভিযুক্তের মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছে নির্যাতিতার পরিবার। অন্যদিকে, প্রহ্লাদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক প্রশ্ন। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের পর ফেরার পথে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল প্রহ্লাদ। আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। সেই গুলিতেই মৃত্যু হয় তার। তবে পুলিশের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রহ্লাদের মা রেখা দাস। তাঁর অভিযোগ, হাত বাঁধা অবস্থায় পুলিশের হেফাজতে থাকা ছেলের পক্ষে কীভাবে বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালানো সম্ভব, তা স্পষ্ট নয়। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার। পরিবারের দাবি, গাইঘাটা থানা এলাকার ১৭ বছরের ওই কিশোরী বাড়ির কাছেই একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল। সেখানে তার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যেরাও উপস্থিত ছিল। রাত প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ একটি ফোন আসার পর অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায় সে। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। সারা রাত খোঁজাখুঁজির পর রবিবার সকালে উদ্ধার হয় কিশোরীর বিবস্ত্র ও ক্ষতবিক্ষত দেহ। পরিবারের অভিযোগ, কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় রবিবারই পরিবারের আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে প্রহ্লাদকে নিয়ে থানায় ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে গাড়ি থামানো হয়। প্রস্রাব করার জন্য গাড়ি থামাতে অনুরোধ করেছিল অভিযুক্ত। অভিযোগ, সেই সময় কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালায় অভিযুক্ত। একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে। এই ঘটনায় এক পুলিশকর্মী জখম হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ চার রাউন্ড গুলি চালায় বলে দাবি। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে প্রহ্লাদের গায়ে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। জখম পুলিশকর্মীরও সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা হয়।

প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর নির্যাতিতার পরিবার পুলিশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে। কিশোরীর বাবা জানান, মেয়েকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। পুলিশের পাল্টা গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলেও শুনেছেন তাঁরা। এই পরিণতি থেকে অন্যেরা শিক্ষা নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বারুইপুর থেকে গাইঘাটা, সামশেরগঞ্জ: তিন এনকাউন্টারেই একই বয়ান?

West Bengal police encounter: বারুইপুর, গাইঘাটা থেকে সামশেরগঞ্জ—প্রতিটি ঘটনাতেই অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা এবং পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর একই কাহিনি। এই ঘটনাগুলি নিছক আত্মরক্ষা, নাকি বিচার এড়ানোর কোনো ছক? আদালতের বদলে পুলিশের গুলিতেই শেষ হবে ন্যায়বিচারের পথ?

তবে প্রহ্লাদের পরিবারের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর প্রথমে তার বাবা রামপ্রসাদ দাস পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে বারাসাত মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের পর ছেলের দেহ নিতে এসে ভেঙে পড়েন তিনি। ছেলের অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার না করেও তাঁর বক্তব্য, আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়া যেত। তাঁর কথায়, ছেলের অন্যায় ক্ষমার অযোগ্য হলেও এইভাবে মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

প্রহ্লাদের মাও প্রথমে জানিয়েছিলেন, নাগরিক হিসেবে ছেলের শাস্তিতে তিনি খুশি। তবে পুলিশের ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ছেলেকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবি জানালেও পুলিশের গুলিতে মৃত্যু তিনি চাননি। এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে ছেলে কীভাবে পালানোর চেষ্টা করলেন, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন রেখা দাস। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আর কেউ যেন এমন অপরাধ না করেন।

বুধবার সেই প্রশ্ন আরও জোরালো করে প্রহ্লাদের মায়ের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য সোমবার গভীর রাতে যখন ছেলেকে বাড়িতে আনা হয়েছিল, তখন তার হাত বাঁধা ছিল। সঙ্গে পাঁচ জন পুলিশকর্মীও ছিলেন বলে দাবি রেখার। তাঁর প্রশ্ন, ওই অবস্থায় প্রহ্লাদ কীভাবে বন্দুক বের করে গুলি চালাতে পারেন? ছেলের মৃত্যুকে তিনি খুন বলে দাবি করেছেন। একইসঙ্গে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে তাঁর বক্তব্য,

ওই মেয়েও খুন হয়েছে। আমার ছেলেও খুন হয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।

অন্যদিকে, প্রহ্লাদের ভাইও পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, ওই কিশোরী তাঁর দাদার দোকানে এসে একাধিকবার ঝামেলা করার চেষ্টা করেছিল। পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে তার দাদার পালানোর চেষ্টা করার দাবিও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না বলে জানান।

কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। নির্যাতিতার পরিবার অভিযুক্তের মৃত্যুকে স্বাগত জানালেও প্রহ্লাদের পরিবারের সদস্যদের একাংশ পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। পুলিশের দাবি, আত্মরক্ষার জন্যই গুলি চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে, হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালানোর অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে অভিযুক্তের পরিবার। উত্তরপ্রদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও এনকাউন্টার সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে দাবি করছেন নাগরিকদের একাংশ। পুলিশ তদন্ত করতে পারে, কিন্তু বিচার করতে পারে কি? এই প্রশ্ন উঠছে নাগরিকমহলে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

হামলার অভিযোগের এক মাস পরেও বিচার অধরা? যে যে প্রশ্ন তুলছেন SRFTI-র পড়ুয়ারা

SRFTI Student Protest: আন্দোলনের এক মাসে ছাত্রদের অভিযোগ, তাঁদের দাবি পূরণের পরিবর্তে প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হচ্ছে। শোকজ নোটিশ, বহিষ্কার এবং এফআইআরের মাধ্যমে আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

পুলিশি এনকাউন্টার কি ন্যায়বিচার? যা বলছে সুপ্রিম কোর্ট

Justice or Execution: সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান স্পষ্ট, এনকাউন্টার কোনো ‘বিচার’ নয়। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং), যা সরাসরি সংবিধানের ২১ নং ধারার লঙ্ঘন।

বিজেপির মডেলেই কংগ্রেসের মুখে 'রেজিম চেঞ্জ'? কী বলে ইতিহাস?

SIR voter list protest: একদিন ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে পথে নেমেছিল জনসংঘ ও আরএসএস। আজ বিজেপি ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলছে কেন?

হলদিরামের রান্নাঘরে আরশোলা! নামী রেস্তোরাঁয় খাবেন কী ভরসায়?

Cockroaches in Haldiram Prabhuji: নামী রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়েও কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়? কৈখালির ভিআইপি রোডের ধারে হলদিরাম প্রভুজিতে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে রান্নাঘরে আরশোলা ও অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ সামনে এসেছে। দু’দিন রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। এর আগে কলকাতার একাধিক খাবারের প্রতিষ্ঠানেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। তাহলে নিরাপদ খাবারের ভরসা কোথায়?

ইজরায়েল ভোট: ক্ষমতা হারাতে পারেন নেতানিয়াহু?

Benjamin Netanyahu: দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটকে ধাক্কা দিয়েছে সাম্প্রতিক নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষা।

বিচারপতি নিয়োগে আগাম সরকারি সম্মতি? চন্দ্রচূড়কে নিয়ে কী বললেন কৌল?

Sanjay Kishan Kaul vs DY Chandrachud: বিচারপতি নিয়োগের আগে সরকারের মতামত নেওয়া হয়েছিল? কলেজিয়ামের অন্দরমহলে কী ঘটেছিল? প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়কে ঘিরে সঞ্জয় কৌলের অভিযোগ বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে?

একদিনে জোড়া এনকাউন্টার: গাইঘাটা থেকে সামশেরগঞ্জ, কী ঘটেছিল?

Double encounter: একই দিনে গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই অভিযুক্তের। উত্তরপ্রদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কি এবার বাংলায়? অপরাধ দমনের নামে পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু কি আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?