দেশদ্রোহিতার অভিযোগে যাবজ্জীবন, কাশ্মীরে সমর্থকও প্রচুর, কে এই ইয়াসিন মালিক

আইনজীবী নিয়োগ করতে চেয়েছিল আদালত। অন্তত আইনি পরামর্শটুকু যাতে কানে পৌঁছয়, তৎপরতা দেখিয়েছিলেন বিচারপতি। কিন্তু কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাকামী নেতা ইয়াসিন মালিক রাজি হননি তাতে। রাষ্ট্রদ্রোহ, বেআইনি কার্যকলাপে যুক্ত, সন্ত্রাসে আর্থিক মদত জোগানো, সন্ত্রাস সংগঠনের সদস্য হওয়া, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, একের পর এক গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও, আদালতে আগাগোড়া নিস্পৃহই ছিলেন তিনি। নিজের পক্ষ রাখতে আইনজীবী নিয়োগে, এমনকী, বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতেও আগ্রহ দেখাননি কোনও। একটি অভিযোগও খণ্ডনের ওপর জোর দেননি। বরং কোনওকিছুর বিরোধিতা করবেন না, আদালত যা রায় দেয়, স্বীকার করে নেবেন বলে আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিলেন।

 

খাতায়-কলমে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত ইয়াসিনের এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী, তা জানার বা জানতে চাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তদন্তকারীদের আনা অভিযোগের ভিত্তিতেই এগিয়েছে ‘একতরফা’ শুনানি। ভারত রাষ্ট্রকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার গুরু অপরাধে সরাসরি তাঁর মৃত্যুদণ্ডের দাবি করেন জাতীয় তদন্তকারীরা। আদালত যদিও যাবজ্জীবনই দিয়েছে, কারণ ইয়াসিন যে গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাতে যাবজ্জীবনই সর্বনিম্ন সাজা। সঙ্গে প্রত্যেকটি মামলায় পৃথকভাবে জরিমানাও করা হয়েছে তাঁকে। আইনজীবী নিয়োগ না করা নিয়ে ইয়াসিনের সমালোচনা করেছেন তাঁর কাছের লোকজনও।

 

কিন্তু বরাবরই দ্বৈত সত্ত্বা দেখা গিয়েছে ইয়াসিনের মধ্যে। কখনও ভারতের বিরুদ্ধে লড়েছেন, কখনও আবার হাত মিলিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন, সরকারি প্রতিনিধি হয়ে প্রতিবেশী দেশে গিয়েছেন। তাই তদন্তকারীদের আনা কোনও অভিযোগ খণ্ডন না করলেও, নিজের পক্ষের আইনজীবী নিয়োগ না করলেও, আদালতে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, “মূল স্রোতে ফেরার পর মহাত্মা গান্ধীর অহিংস রাজনীতির পথেই হেঁটেছি।” কটাক্ষ শুনতে হবে জেনেও একথা বলতে শোনা গিয়েছে ইয়াসিনকে। তবে এই দ্বৈত সত্ত্বার মধ্যেও একটি বিষয়ে কখনও এক পা এদিক-ওদিক হতে দেখা যায়নি তাঁর, যা হল নিজের মতাদর্শ।

 

আরও পড়ুন: বিজেপি বিরোধী রাজ্য মানেই সিবিআই-ইডি-র সাঁড়াশি চাপ! কলকাতা থেকে কাশ্মীর- গল্পটা একই

 

জম্মু-কাশ্মীর প্লেবিসাইট ফ্রন্ট (JKPF), অধুনা জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF)-এর নিয়ামক সংগঠন। তার ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন থাকার পর ১৯৬৫ সালে আলাদা JKPF-এর প্রতিষ্ঠা করেন মির্জা আফজল বেগ। গণভোটের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারণই ছিল ওই সংগঠনের লক্ষ্য। তার ১০ বছর পর কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া মকবুল ভাট এবং আমানউল্লা খান মিলে তৈরি করেন JKLF। যেনতেন প্রকারে কাশ্মীরকে ভারতের হাত থেকে মুক্ত করতেই ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। তখন ইয়াসিনের বয়স ১০ বছর, ১৯৬৬ সালে জন্ম তাঁর। বর্তমানে JKLF-এর চেয়ারম্যান তিনিই।

 

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট-বাল্টিস্তানের বাসিন্দা আমানউল্লা JKLF-এর প্রথম চেয়ারম্যান। সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে ১৯৮৪ সালে প্রথম খবরের শিরোনামে উঠে আসে ওই JKLF। ব্রিটেনে সংগঠনের সদস্যরা মিলে ভারতীয় কূটনীতিক হরেশ্বর মাত্রেকে অপহরণ করে। মকবুলকে জেলমুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু মাথা নত করেনি ভারত সরকার। অপহরণের তিন দিন পর বার্মিংহামে হরেশ্বরের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এর পর মকবুলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর মামলা দায়ের হয়। শেষমেশ ১৯৮৪ সালে তিহার জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তাঁকে। এক সিআইডি আধিকারিককে খুনের অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

 

এর পর প্রায় পাঁচ বছর সাড়াশব্দ ছিল না JKLF-এর। কিন্তু ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর তদানীন্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সইদের মেয়েকে অপহরণ করে ওই সংগঠন। শ্রীনগর মেডিক্যাল কলেজে যাওয়ার পথে বিকেল পৌনে ৪টে নাগাদ তাঁকে অপহরণ করা হয়। এমন কিছু যে ঘটতে পারে, কাশ্মীরি পুলিশ, এমনকী গোয়েন্দারাও তার আঁচ পাননি। তাঁদের কার্যত চমকে দিয়েই মন্ত্রীর মেয়েকে অপহরণের দায় স্বীকার করে JKLF। সংগঠনের জেলবন্দি সদস্য মুক্তির বিনিময়ে মন্ত্রিকন্যাকে জীবিত রাখার শর্ত দেয়।

 

মন্ত্রিকন্যার প্রাণ বাঁচাতে সেইসময় JKLF-এর পাঁচ বন্দিকে তড়িঘড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতেই কাশ্মীরে কার্যত জমি খুঁজে পায় JKLF। কাশ্মীরি আবেগকে সামনে রেখে সদস্য সংগ্রহ শুরু করে তারা। ১৯৮৮ সালে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা ISI-এর কাছ থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরা হামিদ শেখ, আশফাক মজিদ ওয়ানি, জাভেদ আহমেদ মির এবং ইয়াসিন মালিক (HAJY Group) উপত্যকায় JKLF-এর সন্ত্রাসী কাজকর্মের পোস্টার বয় হয়ে দাঁড়ান।

 

সেই সময় উপত্যকায় এই চার জনের জনপ্রিয়তা দেখে কাশ্মীর-নীতি পুনর্বিবেচনা করে দেখতে বাধ্য হয় পাকিস্তানও। তারই ফলস্বরূপ একে একে হিজবুল মুজাহিদিনের মতো সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। তবে JKLF এবং তাদের মধ্যে ফারাক ছিল মতাদর্শের। JKLF স্বাধীন কাশ্মীরের লক্ষ্য অর্জন করতে নামে। হিজবুলের লক্ষ্য, কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা।


মন্ত্রিকন্যাকে যখন অপহরণ করে JKLF, সেই সময় উপত্যকার মুখ্যসচিব ছিলেন মুসা রাজা। নিজের লেখায় তিনি জানিয়েছেন, মন্ত্রিকন্যার অপহরণ নিয়ে আশফাকের বাবার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটি মেয়েকে তুলে আনা, তাঁর সঙ্গে পাশবিক আচরণ করার পরিণাম ভাল হবে না, বলে ছেলেকে বোঝাতে বলেন। সেই সময় বাড়ির নিচের ঘরেই আস্তানা গেড়েছিলেন ইয়াসিনরা। তাঁদের সঙ্গে কথা সেরে বেরিয়ে আশফাকের বাবা জানান, মন্ত্রিকন্যাকে বোনের চোখে দেখছেন ইয়াসিনরা। তাঁর সঙ্গে কোনও রকম খারাপ আচরণ করার কথা মাথাতেও আসেনি কারও।

 

হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার আগে সাধারণ পরিবারের ছেলে ইয়াসিন পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। সেই সময় ছাপ্পা ভোট ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কাশ্মীর। তাতে বহু ছেলেমেয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের রাস্তা বেছে নেন।। ইয়াসিনও সেখান থেকেই সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে গ্রেফতার হন ইয়াসিন। তার আগে থেকেই মূল স্রোতে ফেরার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিলেন। তার জন্য রাজনৈতিক স্তরে দেখা-সাক্ষাতের পালাও শুরু করে দেন। পশ্চিমি দেশের কূটনীতিবিদ ছাড়া বামপন্থী নেতা-ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। এমনকী, গোয়েন্দা আধিকারিকদের সঙ্গেও দফায় দফায় বৈঠক হয় তাঁর।

 

মালিকের দাবি, ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন নিয়ে পড়াশোনার পরই কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের অন্য রাস্তা খুঁজতে শুরু করেন তিনি। সংগঠন এবং অনুগামীদের ওজর-আপত্তি উপেক্ষা করেই ১৯৯৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে আসেন ইয়াসিন। তার পর দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় JKLF, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে আমানাউল্লার আলাদা সংগঠন এবং কাশ্মীরে মালিকের আলাদা সংগঠন। তাতে পাকিস্তানের তরফে ঘৃণা জুটলেও, ভারতে অনেকের আস্থা অর্জনে সফল হন ইয়াসিন।

 

১৯৯২-এর মধ্যে শ্রীনগরে পৃথক এনকাউন্টারে এনকাউন্টারে মৃত্যু হয় ইয়াসিনের সতীর্থ হামিদ শেখ এবং আশফাক ওয়ানির। তার পর শীর্ণকায় ইয়াসিন উপত্যকার ক্ষুব্ধ, বঞ্চিত, শোষিত যুবসমাজের প্রতিমূর্তিতে পরিণত হন। কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহে রাশ টানতে সেই সময় ইয়াসিনকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু যে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে মূল স্রোতে ফেরা ইয়াসিনের, উল্লেখযোগ্যভাবে কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সেই চুক্তি এবং শর্তাবলির কোথাও কোনও রেকর্ড নেই। তা সত্ত্বেও এত বছর ধরে কোনও সরকারই ইয়াসিনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে উদ্যোগী হয়নি।

 

ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ইয়াসিনের বোঝাপড়া অলিখিতভাবেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে ২০০৯ সালে আগে থেকে ইয়াসিনের বিরুদ্ধে দায়ের বায়ুসেনা কর্মী খুন এবং মন্ত্রিকন্যাকে অপহরণের মামলার শুনানিতে স্থগিতাদেশ দেয় বিশেষ টাডা আদালত। কিন্তু ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সবকিছু কার্যত উল্টে দেয়। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে উপত্যকাবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে বিচ্ছিন্নতাকামীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার রীতিরও অবসান ঘটে একইসঙ্গে।

 

২০১৪-র আগে কাশ্মীর নিয়ে যে কোনও ধরনের আলোচনার আগে ইয়াসিনই ছিলেন দিল্লির ভরসা। ২০০৬ সালে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন ইয়াসিন। তার জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের তরফে ইয়াসিনকে পাকিস্তান পাঠানো হয়, দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ফোর পয়েন্ট ফর্মুলা’-কে সামনে রেখে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করার।

 

এই ‘ফোর পয়েন্ট ফর্মুলা’-র আওতায় চার পদক্ষেপের কথা হলা হয়, ক) কাশ্মীরের যে যে এলাকা নিয়ে বিবাদ, সেগুলোকে চিহ্নিত করা, খ) নিরস্ত্রীকরণ, গ) স্বশাসন এবং ঘ) পরামর্শদাতা হিসেবে ভারত-পাকিস্তানের যৌথ সহযোগ। কোনও রকম আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস না ঘটিয়ে কাশ্মীর সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছিল পাকিস্তানের সামনে। ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতায় লিপ্ত পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নির্মূলের প্রতিশ্রুতিও আদায় করতে চেয়েছিল দিল্লি। তার আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী, দেশের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানিও ইয়াসিনকে সামনে রেখে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। বছরপাঁচেক আগে, সেই নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইয়াসিন বলেন, “অটলবিহারী বাজপেয়ী কাশ্মীরিদের ভালবাসা পেতে চেয়েছিলেন। মোদি চান, কাশ্মীরিরা তাঁকে ভয় পান।” অটল তাঁকে পাসপোর্ট দেন জানিয়েছেন ইয়াসিন।

 

ইয়াসিনকে দোষী সাব্যস্ত করতে গিয়ে আদালত জানিয়েছে, ভারত সরকার ইয়াসিনকে বিশ্বাস করলেও, তার মর্যাদা রাখেননি তিনি। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, কোনও দেশের সরকারকেই কখনও কাশ্মীরি আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেননি ইয়াসিন। ২০০০ সালে পাকিস্তানি ধনকুবের মনসুর ইজাজকে লক্ষ্য করে জুতো ছোড়েন ইয়াসিন। আমেরিকা-নিবাসী ইজাজ সেদেশের সরকারের হয়ে ভারত, পাকিস্তান এবং বিচ্ছিন্নতাকামীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিলেন। ইজাজ কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ওয়াকিবহাল নন বলে জানিয়ে দেন ইয়াসিন।

 

২০১৬ সালে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে কড়া ভাষায় চিঠি লেখেন ইয়াসিন। চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের নামে শরিফ আসলে গিলগিট-বাল্টিস্তানকে বলপূর্বক পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন ইয়াসিন। কার্যত হুঁশিয়ারির সুরে শরিফকে ইয়াসিন লেখেন, পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে গিলগিট-পাকিস্তান দখল করে আসলে ভারতকে সুযোগ করে দিচ্ছে, যাতে কাশ্মীরবাসীর স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন কখনও পূরণ না হয়।

 

উপত্যকায় রাজনৈতিক আন্দোলনে বরাবরই অগ্রভাগে থেকেছেন ইয়াসিন। ২০০৭ সালে ‘সফর-ই-আজাদি’ (স্বাধীনতার যাত্রা) চলাকালীন কাশ্মীরের সর্বত্র ঘুরে ৭০ হাজার সই জোগাড় করেন ইয়াসিন। কাশ্মীর নিয়ে যে কোনও ধরনের আলোচনায় সেখানকার বাসিন্দাদের সংযুক্ত করতে হবে বলে তাতে দাবি জানানো হয়। বর্তমানে ইয়াসিন নেতৃত্বাধীন JKLF নিষিদ্ধ দেশে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে হামলা চালায় পাকিস্তানের জইশ-ই-মহম্মদ। তার একমাস পরই JKLF-কে নিষিদ্ধ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। সংগঠনের দপ্তর সিল করে গ্রেফতার করা হয় ইয়াসিনকে।

 

উপত্যকায় সন্ত্রাসী কাজকর্মে আর্থিক মদত জোগানো-সহ একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে তাঁকে। ১২০-বি ধারায় ১০ বছরের সাজা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। ১২১ ধারায় যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। ১২১-এ ধারায় ১০ বছরের সাজা এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে আদালত। এ ছাড়াও UAPA আইনের ১৮ ধারায় ১০ বছরের সাজা, ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে ইয়াসিনকে। ২০ নম্বর ধারায় ১০ বছরের সাজা এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩৮ ও ৩৯ নম্বর ধারায় ৫ বছর করে জেল এবং ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

 

২০১৬ সালের জুলাই মাসে হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানি-র মৃত্যুর পর উপত্যকা অশান্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় ইয়াসিন বিক্ষোভে মদত জুগিয়েছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে ৮৯টি পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন তদন্তকারীরা। তল্লাশিতে ইয়াসিনের বাড়ি থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন স্বাক্ষরিত চিঠি, হিজবুল নামাঙ্কিত লেটারহেডের চিঠিতে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার বার্তা পাওয়া গিয়েছে বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু এনকাউন্টারে বুরহানের মৃত্যুর ৩০ মিনিট পরই তিনি গ্রেফতার হন বলে জানিয়েছেন ইয়াসিন। সেক্ষেত্রে তিনি বিক্ষোভে মদত জোগানোর সময় কোথা থেকে পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ইয়াসিনের ১২ কোটি টাকার বেনামি সম্পত্তির কথাও আদালতে জানান তদন্তকারীরা। কিন্তু তাঁর গোটা পরিবারের সম্পত্তির হিসেবই ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ ইয়াসিন অনুগামীদের।

 

আদালতে নিজের কোনও আইনজীবী রাখেননি ইয়াসিন। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (NIA) আনা কোনও অভিযোগের বিরোধিতা করেননি। আদালতের তরফে অখণ্ডপ্রতাপ সিং নামের একজন আমিকোস কোরিয়াই নিয়োগ করা হয়, যিনি মামলায় কোনও পক্ষের হয়েই অংশ নেন না। শুধু নিরপেক্ষ মতামত জানান। তিহার জেলে ইয়াসিনের সঙ্গে দু’বার দেখা করেন তিনি। অখণ্ড জানিয়েছেন, আইনজীবী নিয়োগ করে বিচার প্রক্রিয়ায় যাওয়ার জন্য হাজারবার তিনি অনুরোধ করে। কিন্তু রাজি হননি ইয়াসিন। বরং সাফ জানিয়ে দেন, দোষী সাব্যস্ত হতেই চান। কোনওরকম বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা নেই তাঁর।

More Articles

;