বিজেপি বিরোধী রাজ্য মানেই সিবিআই-ইডি-র সাঁড়াশি চাপ! কলকাতা থেকে কাশ্মীর- গল্পটা একই

আমি আজ হেড অফিসে পাঠাব না ফ্যাক্স
বসের দু'কান মুলে করব রিল্যাক্স
দোল খেয়ে বসে যাব স্টেনোটির কোলে
একটাই ভয়, যদি জুজু ফোন তোলে!

 

বিরোধীদের বারবার তাড়া করেছে সিবিআই, ইডি জুজু। এই অস্ত্রে বিরোধীদের চমকে দিতে বারবার শান দিয়েছে তারা! এখনও বিজেপি এবং কেন্দ্রের মরণকামড়ের নাম সিবিআই ও ইডি। আবার তার প্রয়োগ দেখা গেল। তাদের ডেস্টিনেশন এখন কাশ্মীর।

বিরোধীরা যখন দিল্লির মসনদ থেকে বিজেপিকে সরাতে মরিয়া, তখন বিজেপিও বারবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জুজু কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের ঘায়েল করছে। এবার ইডির নিশানা জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লাহ। তাঁকে ডেকে পাঠাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। আগামী ৩১ মে দিল্লিতে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে তাঁকে। জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের আর্থিক তছরুপের মামলায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় ইডি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি থাকাকালীন নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন কিছু লোকজনকে কমিটিতে নিয়োগ করেছিলেন, যাতে বরাদ্দ অর্থ তছরুপ করা যায়।

আরও পড়ুন: বাংলায় আবার শূন্য থেকে শুরু! শাহি পরিকল্পনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বঙ্গ বিজেপির দাপুটে নেতারাই

১১৩ কোটি টাকার মামলায় এর আগেও বেশ কয়েকবার তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইডি। মূলত এক্ষেত্রে অভিযুক্ত হিসেবেই ডাকা হয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। ইতিমধ্যেই জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম খান, প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ আহসান আহমেদ মির্জার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে ইডি।

শিবকুমারকে ইডির থাবা

ডাকসাইটে নেতার নাম শিবকুমার। তিনিও ইডির থাবা থেকে রেহাই পাননি। কর্নাটকে কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি ডিকে শিবকুমারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দায়ের করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। ২০১৮ সালের একটি আর্থিক তছরুপের মামলায় শিবকুমারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দায়ের করা হয়েছে। কর্নাটকের এই প্রাক্তন মন্ত্রী এবং কংগ্রেস নেতা একই মামলায় আপাতত জামিনে মুক্ত আছেন।

এর আগে ২০১৯ সালে ইডি শিবকুমারকে গ্রেফতার করে। আর্থিক তছরুপের এই একই মামলায় দিল্লির কর্নাটক ভবনের কর্মী হুমানথাইয়া এবং আরও কয়েক জন ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যদিও শিবকুমারের দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। কর্নাটকের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে বলতে হয়, এই দাবি নেহাত অমূলক নয়।

লোকসভা ভোটের আগে টার্গেট 'বুয়া’
লোকসভা ভোটের আগেই ইডি থাবা বসায় মায়াবতীর ঘাড়ে। এর জের যায় বিধানসভা ভোটে। শোনা যায়, মায়ার খেলাতেই সেখানে সুবিধে করেন আদিত্যনাথ, হালে পানি পায় না বিরোধীরা। আবার সেই ইডি জুজু। মায়াবতী ইডির ভয়েই কি এই চাল চেলেছিল?

লোকসভা ভোটের আগে মায়াবতীর অস্বস্তি বাড়িয়ে ‘সৌধ কেলঙ্কারি’-র তদন্তে উত্তরপ্রদেশে হানা দেয় ইডি-র দল। মায়াবতীর আমলে রাজ্যে সৌধ তৈরিতে ১১১ কোটিরও বেশি টাকা তছরুপের অভিযোগের তদন্তে সেরাজ্যের ৭টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালায় ইডি।

২০০৭-'১২ সালে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বসপা-র প্রতিষ্ঠাতা কাঁসিরাম ও দলের প্রতীক হাতির মূর্তি ও পার্ক বানান মায়াবতী। লখনউ, নয়ডা-সহ উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই মূর্তি বানান বসপা সুপ্রিমো। এজন্য খরচ হয় প্রায় ২,৬০০ কোটি টাকা। হাতি ও কাঁসিরামের মূর্তি নির্মাণে আর্থিক তছরুপ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৪ সালের রাজ্য ভিজিল্যান্স কমিশনের রিপোর্টে। অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্তে নামে ইডি। পিএমএলএ আইনে মামলা দায়ের করে তারা।

রেহাই পাননি 'ভাতিজা’-ও

গত লোকসভা ভোটের আগে ইডি 'ভাতিজা’-র অস্বস্তি বাড়ায়। অখিলেশ যাদব উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০১৭ সালের বিধানসভা ভোটের আগে আগেই গোমতী নদীর দুই পাড়ের সৌন্দর্যায়নে ১,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু ওই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, ইডি ময়দানে নামে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে। ২০২১-এর মার্চে মামলা দায়ের হয়। রাজ্য সরকার এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি অলোককুমার সিংহের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০২১-এর মে মাসে রিপোর্ট পেশ করে কমিটি। রিপোর্টে প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতির ইঙ্গিত মেলে। তার আগে মার্চ মাসেই অবশ্য আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করে ইডি। যোগী সরকার ক্ষমতায় এসে তদন্তভার দেয় সিবিআই-কে। এফআইআর দায়ের হওয়ার পর আলাদা করে তদন্ত শুরু করে ইডি-ও।

টার্গেটে চিদাম্বরমও

২০১৯ সালের ২১ অগস্ট পি চিদাম্বরমকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। তারপর থেকে দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে মেলে স্বস্তি। আইএনএক্স মিডিয়া দুর্নীতি মামলায় জামিন পান প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। তাঁর জামিন মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্ট। তবে এরপরেও তাঁকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হেফাজতে থাকতে হয়। সেই কারণে জামিন মঞ্জুর হলেও মুক্তি পাননি তিনি। ৭৪ বছরের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হেফাজতেই থাকবেন বলে জানিয়েছিল শীর্ষ আদালত।

৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন চিদম্বরম। আইএনএক্স মিডিয়া মামলায় এই কংগ্রেস নেতাকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হেফাজতে পাঠায় দিল্লির একটি বিশেষ আদালত। তার আগে তিহার জেলে ছিলেন চিদম্বরম। এরপর সেখান থেকে ইডি হেফাজতে যান তিনি।

মমতাকে বিড়ম্বিত করতে অভিষেক?

দিল্লির আঙিনায় বিরোধী ঐক্য তৈরি করতে সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে বিরোধীরা এক হচ্ছিল। বিজেপি যে তাতে জল ঢেলে দেবে, এ আর কী আশ্চর্যের! মোদি-শাহরা ভালোই জানেন, অভিষেকের কান টানলে মমতাকে ভালোই বিড়ম্বিত করা যাবে। নিপুণভাবে এই কাজে সিবিআই এবং ইডি-কে নিয়োগ করেন তাঁরা, অভিযোগ এমনটাই। তবে ২৮ মে সিবিআই ও ইডি নিয়ে রুখে দাঁড়ান 'ভাইপো'।

এদিন হলদিয়ায় অভিষেক বলেন, "ইচ্ছেমতো যার পিছনে খুশি ইডি-সিবিআই লাগিয়ে দিচ্ছে। আমার পিছনেও লাগিয়েছিল। কী করেছে? কাঁচকলা। আমার ২ বার মাথা নত করিয়েছে। আমিও ওদের ২টো সাংসদ ভাঙিয়ে এনে ২ বার মাথা নত করিয়েছি।"

বিজেপির বহু পুরনো ও চেনা হাতিয়ার হিন্দুত্ব। সম্প্রতি প্রাচীন স্মৃতিসৌধের ইতিহাস পরিবর্তন করে গায়ে হিন্দুত্বের তকমা লটকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রামমন্দির হচ্ছে। এদিকে মোদি ক্ষমতায় এসে বুঝেছিলেন, নতুন ভারতের মন হিন্দুত্বে ভিজবে না। নতুন ভারত কাজ চায়। তাই মোদিকে বারবার বলতে হয়েছে উন্নয়নের কথা। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, এত কিছুর পরেও সিবিআই ও ইডি-র মতো 'ভোঁতা অস্ত্রে’ কেন বারবার শান দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র? এইটা ছিদ্রযুক্ত পাত্রে জল ভরার বৃথা চেষ্টার শামিল হবে না তো? তবে বিজেপির বিরোধীদের বোল্ড আউট করার চেষ্টাকে ব্যর্থ করতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।

More Articles

;