হাথরস, শোনভদ্রার পরে উত্তরপ্রদেশের দলিত ভোটাররা কাকে ভোট দিলেন ?

উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন অনেকাংশেই পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দেয়। ওয়াকিবহালদের কথায়, দিল্লির রাস্তা যায় উত্তরপ্রদেশের উপর দিয়েই। যদি শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশের ভোটাররা মিলে একটি দেশ তৈরি করতেন, তাহলে সেটাই হতো বিশ্বের পঞ্চম সবথেকে জনবহুল দেশ। বলাই বাহুল্য, উত্তর প্রদেশ ভারতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে সবসময়। ১৫ কোটির থেকেও বেশি ভোটার ৪০৩ জন বিধায়কের ভাগ্য নির্ধারণ করেন এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে। আজ যখন উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের সব কটি দফা সাঙ্গ হতে চলেছে, তখন বিজেপি থেকে শুরু করে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে। 

এতদিন পর্যন্ত ওবিসি, জাঠ, মুসলিম এবং ব্রাহ্মণরা উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে সবথেকে বড় ভূমিকা গ্রহণ করলেও, এবারের নির্বাচনে এক্স-ফ্যাক্টর হতে চলেছে উত্তরপ্রদেশের দলিত সম্প্রদায়ের ভোট। এই দলিত সম্প্রদায়ের উপরে ওবিসি সম্প্রদায়ের বেশ ভালো মত একটা প্রভাব রয়েছে। উত্তর প্রদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির জন্য এই ওবিসি এবং দলিত সম্প্রদায়ের ভোট এই মুহূর্তে একটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচনে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সমাজবাদী পার্টি মাসখানেকের মধ্যেই একাধিক ওবিসি নেতাদের দলের প্রধান মুখ হিসেবে সামনে এনেছে, যা সমাজবাদী পার্টিকে উত্তরপ্রদেশের অন্যতম ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অন্যদিকে, মায়াবতীর দল বহু জন সমাজ পার্টি প্রথম থেকেই দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। উত্তরপ্রদেশের দলিল সম্প্রদায়ের কন্ঠ হিসেবে বহু বছর ধরে নিজেকে সু-প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন মায়াবতী। তবে এবারের নির্বাচনে মায়াবতী কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন সেই নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারেও মায়াবতীকে তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। তাই এই নির্বাচনে হয়তো মায়াবতী দলিত ভোটারদের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলবেন না। এতদিন পর্যন্ত দলিতদের ভোট মায়াবতী অনেকটা কেটে নিয়ে যেতেন। কিন্তু, বিগত কয়েক বছরে মায়াবতী কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারেননি, তাই সেই নির্বাচনগুলিতে দলিত ভোটের হার তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারতো না। তবে এবারে ব্যাপারটা আলাদা। এবারের নির্বাচনে মায়াবতী অনেকটাই নখদন্তহীন। ফলে দলিল ভোট এবারের নির্বাচনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে চলেছে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, এবারের নির্বাচনে যারা দলিতদের মন জয় করতে পারবে, তারাই জিতে নেবে উত্তরপ্রদেশের মসনদ। এখন প্রশ্নটা হলো, এই নির্বাচনে দলিতদের ভোট যাবে কোন দিকে, লাল টুপি সমাজবাদী পার্টি নাকি গেরুয়া বিজেপি?

উত্তরপ্রদেশ এবং দলিত ভোটার

উত্তরপ্রদেশে যেমন মুসলিম ভোটারদের সংখ্যাটা বেশ ভালোই, তেমনই কিন্তু বেশ ভালো সংখ্যায় রয়েছে দলিত ভোটার। উত্তরপ্রদেশে আগাগোড়াই দলিত সম্প্রদায়ের ভোট গিয়েছে মায়াবতীর দিকে। যার ফলে এতদিন সমাজবাদী পার্টি কিংবা বিজেপি, কারো পক্ষেই এই বিশাল সংখ্যক ভোটারদের মন জয় করা সম্ভবপর ছিল না। ৬৫-টিরও বেশি সম্প্রদায় একসাথে মিলে উত্তরপ্রদেশের দলিত সম্প্রদায় গঠন করে। উত্তরপ্রদেশের সম্পূর্ণ ভোটার সংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশই এই দলিত ভোটার। ১৯৮০ পর্যন্ত দলিতদের এই ভোট যেত কংগ্রেসের দিকে। তবে তারপর থেকে উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রবেশ করতে শুরু করেন মায়াবতী এবং কাঁশিরাম। ১৯৮১ সালে উত্তরপ্রদেশে দলিত নেতা কাঁশিরাম গঠন করেন দলিত শোষিত সমাজ সংঘর্ষ সমিতি, যা মূলত দলিত কেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৮৪ সালে বহুজন সমাজ পার্টির মাধ্যমে উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে শুরু করেন মায়াবতী। তবে প্রথমেই উত্তরপ্রদেশে তিনি নিজের ছাপ ফেলতে পারেননি। ১৯৯১ সালে সমাজবাদী পার্টি প্রণেতা মুলায়ম সিং যাদব এর সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেন মায়াবতী। ১৯৯৫ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন মায়াবতী। বহু জন সমাজ পার্টির এই অভূতপূর্ব উত্থান উত্তরপ্রদেশে দলিতদের ক্ষমতায়নে অনেকাংশে সাহায্য করেছিল। মাত্র ১১ বছরের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ক হয়ে ওঠেন দলিতরা।

​​​​​​দলিত সংরক্ষিত আসন এবং উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে একটা বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে দলিত ভোটাররা। উত্তরপ্রদেশে এই মুহূর্তে দলিতদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে ৮৬ টি আসন, যার মধ্যে ৮৪টি সংরক্ষিত রয়েছে তপশিলি জাতির জন্য এবং বাকি দুটি রয়েছে তপশিলি উপজাতির জন্য। উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে কে জিতবে, সেটা অনেকাংশে নির্ভর করে এই সমস্ত আসনগুলির উপরেই। এতদিন পর্যন্ত দলিত ভোটের সিংহভাগই যেত মায়াবতীর দিকে। ২০০৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সকলকে চমকে দিয়ে ৮৬ আসনের মধ্যে ৬২টি আসন ছিনিয়ে নেন মায়াবতী নিজেই। 

কিন্তু তারপর থেকে ছবিটা কিছুটা পাল্টাতে থাকে। ২০১২ সালে সমাজবাদী পার্টির ঝড়ে কার্যত উড়ে যান মায়াবতী। ৮৬ আসনের মধ্যে ৫৮টি আসনে জয়লাভ করে বহুজন সমাজ পার্টিকে অনেকটাই পিছনে ফেলে দেন অখিলেশ যাদব। ২০১৭ সালে ছবিটা পাল্টে দেন যোগী আদিত্যনাথ। ৮৬টি আসনের মধ্যে ৭৬টি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি, উত্তরপ্রদেশের ভারতীয় জনতা পার্টির ইতিহাসে এর আগে কখনো হয়নি। দলিত এবং তপশিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত আসনে মায়াবতী এবং অখিলেশ যাদবকে নাস্তানাবুদ করে দেন যোগী আদিত্যনাথ। সেই বছরের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এবং তার সহযোগী দলগুলি পেয়েছিল ৭৬টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৭১টি আসনে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি জিতেছিল তিনটি আসনে এবং আপনা দল (সোনেলাল) জিতেছিল দু'টি আসনে। যেখানে মায়াবতী পেয়েছিলেন মাত্র দু'টি এবং অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি পেয়েছিল মাত্র ৭ টি আসন। 

যদিও, বিজেপির প্রতি উত্তরপ্রদেশের দলিতদের বিশ্বাস স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে তপশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত ১৭টি আসনের মধ্যে সবকটি জিতে নেয় বিজেপি। ২০১৯ সালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, তবে সেবারে বিএসপি দুটি আসন জয়লাভ করতে পেরেছিল। ২০০৯ সালে যখন সমাজবাদী পার্টি উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতায় রয়েছে এবং লোকসভায় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছে, সেই সময় তারা ১০ টি আসনে জয় পেয়েছিল ১৭টির মধ্যে। মাত্র ৮ বছরের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের দলিত ভোটের সিংহভাগ ছিনিয়ে নিতে পেরেছিল বিজেপি, যা তাদের কাছে উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের থেকেও বড় বিষয় ছিল। 

২০২২-এ দলিত ভোট যাবে কোনদিকে?

আগামী নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি অনেকটাই ব্রাহ্মণ কেন্দ্রিক হলেও দলিত ভোটের দিকে নজর রয়েছে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের। যেহেতু দলিতদের মধ্যে ওবিসি জনগোষ্ঠীর প্রভাব একটু বেশি, তাই তাদের প্রতিও লক্ষ্য রাখছে প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলি। বেশ কয়েকদিন অভিনেতাকে দলে নিয়ে এসে এবং নির্বাচনের মুখ হিসেবে স্থাপন করে বিজেপিকে কড়া চ্যালেঞ্জ দিয়েছে সমাজবাদী পার্টি। ২০০৯ সালের পরে দলিত ভোটাররা মায়াবতীর উপরে আস্থা হারানো শুরু করেন। এখনো যদিও উত্তরপ্রদেশে ২০ শতাংশ ভোট ব্যাংক রয়েছে মায়াবতীর, তবুও দলিত ভোটের বিচারে তিনি এখন অনেকটাই ব্যাকফুটে। মায়াবতীর নিজের জাতের ভোটার অর্থাৎ যাদব ভোটাররা এখনো মায়াবতী-পন্থী। তবে যাদব নন এমন ভোটারদের কাছে কিন্তু মায়াবতীর তেমন একটা গুরুত্ব নেই। সেই জায়গায় আবার সমাজবাদী পার্টি এবং ভারতীয় জনতা পার্টি সবসময়েই একটু বেশি সুবিধা পেয়ে এসেছে। 

এবারের নির্বাচনে দলিত ভোটারদের কাছে সমাজবাদী পার্টি একটু বেশি সুবিধা পেতে পারে। যুবদলের নেতা চন্দ্রশেখর আজাদের উত্থান সমাজবাদী পার্টিকে একটা সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে আসতে পারে। যদি জাটভ ভোটাররা মায়াবতীর সঙ্গে এখনো থাকেন, তবুও চন্দ্রশেখর আজাদ এক্স-ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেন, তাহলে বিজেপি এবারের নির্বাচনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে। বিশেষত, মুসলিম ভোটাররা সমাজবাদী পার্টির দিকে ঝুঁকে যেতে পারে এবারের নির্বাচনে। 

এই তালিকায় রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও। মহিলা এবং দলিতদের উপরে নির্ভর করেই এবারে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছে কংগ্রেস। হাথরস এবং শোনভদ্রার ঘটনাকে সামনে রেখে দলিত ভোট দখল করার চেষ্টায় রয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। দলিত অধ্যুষিত এলাকায় বারংবার সভা করে কংগ্রেসকে দলিত এবং দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। মহিলা এবং দলিত এই দুয়ের ওপরেই এবারে ভরসা রেখেছে হাত।

তবে, বিজেপির প্রচারে দলিতদের জন্য তেমন একটা সুবিধার কথা উল্লেখ নেই। শৌচালয় নির্মাণ, এলপিজি কানেকশন, গরিবদের জন্য ঘর তৈরি, এই সমস্ত প্রকল্পের উপরেই আবারো ভরসা রাখছেন যোগী আদিত্যনাথ। ২০১৪ সালে মোদি হাওয়ায় তপশিলি জাতি সংরক্ষিত আসনগুলিকে দখল করেছিল বিজেপি। এরপর থেকেই তপশিলি জাতি এবং উপজাতির জন্য সংরক্ষিত আসনে বিজেপির ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ২০১৭ এর পরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচন এবং লোকসভা নির্বাচনের ধারা দেখলেও বোঝা যায়, দলিতরা এখনো বিজেপির পাশেই রয়েছেন। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং ব্রাহ্মণ নির্ভরতা একটু বেশি থাকলেও দলিত সমাজের কাছেও তাদের প্রাধান্য রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের শক্ত হাতে রাজ্য শাসন, বিনামূল্যে করোনা ভ্যাকসিন, উজ্জ্বলা যোজনার মতো একাধিক স্কিম, সবকিছুই বিজেপিকে এখনো দলিতদের কাছে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। বিজেপিতে উচ্চ জাতের নেতাদের গুরুত্ব বেশি পাওয়া, দলিতদের প্রতি অন্য উচ্চ বর্ণের অত্যাচার, শোনভদ্রার জমি নিয়ে হত্যাকাণ্ড, সমস্ত ইস্যু নিয়ে প্রচার করে, এবারের নির্বাচনে হয়তো সমাজবাদী পার্টি বা কংগ্রেস কিছু আসন পেতে পারে। তবে, দলিত ভোটারদের কাছে বিজেপির জনপ্রিয়তা যে কমবে সেটার সম্ভাবনা প্রায় ক্ষীণ বললেই চলে।

More Articles

;