চড়কের মেলা ও বছর পয়লা || ভাতের নেশা কি হাঁড়িয়ার চেয়ে কম?

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
চড়কের মেলা ও বছর পয়লা || ভাতের নেশা কি হাঁড়িয়ার চেয়ে কম?

খুব ভোরে আজ থমকে আছে চারদিক। নদী থেকে পাক খেয়ে আসে যে হাওয়াখান, তাও আজ শুনশান। এমন থমকে থাকা ভোরে মেঘশিরীষ গাছের ওপরে ভোরের আলো তার লাল আভাখানি বুলিয়ে দিয়েছে বুঝি সযতনে। কোন সূয্যিডোবা মেঘের পরশ এমন বিহানবেলায় তাই ছায়া বুলিয়েছে মেঘশিরীষের লালচে ফুলে। এমন গাছের নীচে দাঁড়ালে মৌতাত লেগে যায় ছেলে-বুড়ো সক্কলের। ফজরের আজান ফুরোলে বিনুনি বাঁধা তন্বী কিশোরী পাশ ফিরে শোয়। তার মায়ে এসব দেখলে গজরগজর করে। বচ্ছরকার দিনে এমন সূয্যি ওঠা বেলা অবধি শুয়ে থাকে কে! চৈতি সংক্রান্তি পেরনো ভোরে ঘরদোর ঝাটপাট দিয়ে তকতকে করে না তুললে কি চলে! আজ যে বছর পয়লা! দেওতারা এমন সকালে নরম রোদ্দুরের আভা বুলিয়ে দেন মানুষের গায়ে মাথায়। বেলা বাড়লে রোদ চড়চড়িয়ে উঠবে, সে উঠুক না! ভোরখান তো দেওতার ছোঁয়া পেয়েছে!

এমন ভোরে উঠোন নিকিয়ে বড় হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে দিতে হয় সক্কাল সক্কাল। আখা জ্বালিয়ে দিয়ে কিশোরীর মা তাই ব্যস্ত হাতে হাঁড়ি বসায়, মহুলের ফুল দিয়ে গম সেদ্ধ হবে আজ। সে হবে'খন ওবেলায়। মুরগা হবে। কুটুম আসলি কি আর শাকপাতা দিয়ে মেহেমানদারি পোষায়? না কি অমন করলে মান থাকে! এ গাঁয়ে চড়কে বিশান ধুম। বাহিরি, বাগানপাড়া, এ মুলুকের যত যত কুটুম আছে, আজ যে তারা এসে পড়বে না এমন গ্রান্টি কী! পোলট্রির দোকানে তাই সক্কাল থেকে মানুষের ভিড়। ঘরে ঘরে আজ কুটুমের গলার স্বর উঠবে আর পড়বে। চড়কের মেলা বসতে মাঝ দুপুর। কত লোক কত লোক। ঘরে ঘরে ভাতের গন্ধ, হাড়িয়ার গন্ধ আজ ভরে আছে বছর পয়লার গন্ধ মেখে। মহুলঝরানো সকালের মতো সেই গন্ধ নেশা লাগে। হাতে হাতে চটের থলি হাতে ছেলে-বুড়ো মহুল কুড়োয় ঝোপে-ঝাড়ে। মহুলের ডাল খেতে ভারি ভাল। মিঠে মিঠে গন্ধে ভরা।

চড়কের মেলা জমতে বিকেল গড়াবে। মেয়ে মরদ সক্কাল সক্কাল খেয়েদেয়ে দোরে দোরে পেলাস্টিক পেতে বসবে পসরা সাজিয়ে। সময় কী আর বসে আছে! সে তো কেবলই বয়ে চলেছে! তন্বী কিশোরী মেয়ে তাই আজ আটো করে চুল বেঁধেছে মাথার উপরে। ফুল ছাপের জামাখানি ওর শামলা শরীরে মানিয়েছে বেশ। মায়ের হাতে হাতে মেহেমানদারি সামলে মেয়ে এখন মেলায় যাবে সখীসঙ্গে। দোরে দোরে হাঁড়িয়ার কলসি সাজিয়ে ঘুগনি সাজিয়ে দকানদারির সুখ আজ চরম। এমন লু বওয়া দুপুরকে সে আজ বেবাক বুরবক বানিয়ে দিয়েছে বেমালুম। মানুষের হাতে হাতে লাল নীল পেলাস্টিকের গ্লাস ঘুরছে হরদম। রঙিন চোখের বুঢ়া মাথায় গামছা বেঁধে, চেক চেক গেঞ্জি পরে দুলে দুলে হাসছে মৌতাতের সুরে। সে সুর ওকে নিয়ে যাবে এই গাঁ-ঘর পেরিয়ে কোন সে ফেলে আসা ছেলেবেলায়!

মেলাচলতি মেয়ের খোঁপায় পেলাস্টিকের এই এত্ত বড় ফুল দেখে ও তাই হাসবে। অকারণে হাসবে। দোকানদার এসব দেখেও দেখবে না, পেলাস্টিকের গেলাস ভরে দিতে দিতে কড়ায়গণ্ডায় লাভ-ক্ষতি বুঝে চাইবে কেবল। আমাদের তন্বী কিশোরী ততক্ষণে মেলা ঘুরে নিয়ে দু’পাক। মাটিতে মাটিতে ঢেলে বিকোচ্ছে তরমুজ আর আধবুড়ো শসা। এমন ধুলো ওড়ানো বৈশাখী দিনে মানষে মেলায় এসে এই খাবে না তো কী খাবে বলো! মায়ের কোল পোঁছা ছেলে তবু বায়না ধরে। লাল টুকটুকে আমিত্তি বিকোচ্ছে গরম গরম। গজা বিকোচ্ছে চূড়া করে। মায়ে কয়, আমিত্তি কত করে গো? রসিক দাসের বাড়ি এই আমাদের যাদবপুরেই। কত বচ্ছর ধরে যে চড়কের মেলা কচ্ছে রসিক দাস সে আর কী বলি! বলে, একশো কুড়ি টাকা কেজি। ক'কিলো নেবে গো? মড়মড়ে শাড়ি জড়ানো মায়ে কয়, দিন দুইখান। রসিক দাস লোক ভাল, কয় তিনখানই দিলাম ধরো, দুইখানের পয়সা দাও। এসব বলে একখান কড়া ভাজা আমিত্তি মায়ের হাতে গুঁজে দেয় সে।

মানুষ কি কেবল এমন চড়কের মেলায় লাভ করতি আসে গো! কার যে কীসে আনন্দ কথা কেমনে বোঝাই! এমন ধুলো ওড়ানো মেলায় লালটুকটুকে আমিত্তি বেঁচে খানিক খানিক পয়সা হয় বটেই তো! তবে কেবল পয়সা নয় গো, মানুষের কি সাধ্যি আছে! তিনি না টানলে কি আর রসিক দাস এমনি এসেছে! রসিক দাসের দোকান পেরোলে বাদাম ভাজা, কটকটি ভাজা, ঘুঙনি আর ফুচকার সারি। আমাদের কিশোরীকে ওই দ্যাখোনা কেমন ফুচকা খাচ্ছে টপাটপ। হলুদ আলোয় আর চাঁদ ঢাকার মেঘের তাপে ওর মুখখান চকচক করছে। ঘামতেল মাখানো দেবী প্রতিমে যেন! এস্টেজে এখন গান শুরু হবে, আসর গরম কচ্ছে জুড়ির দল। আমাদের মেয়ের সেদিকে ভুরুক্ষেপ থাকলে তো! মায়ে যে ক্যামনে এমন মেলা ফেলে কুটুমের মেহেমানদারি করে! আমাদের মেয়ে যখন মা হবে, ও কিন্তু তখন মোটেও অমন করবে না। হলুদ আলো আর রাঙা ধুলোয় মেলার মাঝখানে যেন থমকে আছে আস্ত একখান মেঘশিরীষের গাছ। সেই যে দেওতার ছোঁয়া বোলানো ভোরের মতো। মানুষের ভিড়ে মিশে আছে কল্লোরের কোলাহল। এ তো আর বাবুদের মেলা নয়, এ মেলা মানুষের। এ মেলায় তাই খয়েরি হয়ে যাওয়া বুড়ো বুড়ো শসা বিকোয় কত্ত! মানুষেরা বড় ভালবাসে এমন শসা। কঙ্কালীওতলার মোচ্ছবের চেয়েও এই মেলার মজা বেশি। পুজোর থানখান কেমন আলো দিয়ে সাজিয়েছে মানুষেরা। রাত-ভোর এই মেলা চলবে এখন। কুটুম আসা বাড়িতে পোল্ট্রি রান্না হয়ে গেছে এতক্ষণে। কুটুমরা টুল টুল করে হাড়িয়া খাবে আর মুরগা খাবে। খাওয়া ফুরোলে মাটির দাওয়া আছে না! এমন মেলা জাগা রাতে চাঁদ উঠবে গোল থালার মতো। আমাদের তন্বী শ্যামা কিশোরী চাঁদের আলো মেখে ঘরে ফিরবে। ওর চোখে-মুখে আশনাইয়ের রঙ ঝরে পড়ছে ওই। মেয়ে বলবে, মা ভাত দে। কড়কড়া ভাতে মুরগা মেখে চাঁদের মধ্যে ও ডুবে যাচ্ছে ওই।

বছর পয়লার দিনে মানুষে এর বেশি আর কী চায়! চায় না তো কিছু! চাইবে কেন! ভাতের পাতে নাড়াচাড়া করে যে আঙুল সে বুঝি আশনাইয়ে ডুবে যায়নি! সে নেশা কি হাঁড়িয়ার চেয়ে কম? বল না মা! বল না তুই!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।