ভারতীয়ত্বের খোঁজে রতন থিয়ামের ‘রবীন্দ্রনাথ’
Ratan Thiyam: একসময়ের শান্তিনিকেতনের নিত্যযাত্রী রতন থিয়ামের জীবনে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন নাট্যকার নন, এক দার্শনিক মার্গদর্শক।
মঞ্চের উপর গাঢ় অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে কখনো এক চিলতে আলো এসে পড়ে, কখনো বা বেজে ওঠে মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী পেনা বা মৃদঙ্গ। আর সেই মায়াবী আলো-আঁধারির খেলায় দর্শকের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠেন এক অদৃশ্য রাজা। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজা’—যিনি ‘অরূপ’, যাঁকে দেখা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। আর মঞ্চের নেপথ্যে যিনি এই জাদুকরী জগৎ তৈরি করছেন, তিনি আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম ঋত্বিক, ‘কোরাস রেপার্টরি থিয়েটার’-এর উদ্গাতা রতন থিয়াম।
ভারতীয় নাট্যকলার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রতন থিয়াম—এই দুটি নাম দুই ভিন্ন সময়ের প্রতিনিধি হলেও, এক গভীর আত্মিক ও দার্শনিক সুতোয় তাঁরা বাঁধা। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় নাটককে পাশ্চাত্য রিয়েলিজম বা বাস্তবতার একঘেয়ে অনুকরণ থেকে মুক্তি দিতে। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক মঞ্চভাষার, যা হবে কাব্যিক, সাংকেতিক কিন্তু বহুজন সুখায় চ। মণিপুরের মণিপদ্ম রতন থিয়াম যেন রবীন্দ্রনাথের সেই অধরা স্বপ্নকেই তাঁর ‘টোটাল থিয়েটার’ বা সামগ্রিক নাট্যকলায় বাস্তবায়িত করলেন।
‘শকুদাবা শকনাইবা’: অরূপের রূপসন্ধান
একসময়ের শান্তিনিকেতনের নিত্যযাত্রী রতন থিয়ামের জীবনে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন নাট্যকার নন, এক দার্শনিক মার্গদর্শক। ১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘রাজা’ (The King of the Dark Chamber) লিখেছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে, একশ বছর পরে এই নাটকটি মণিপুরী ভাষায় এক নতুন মাত্রা পাবে। ২০১১ সালে রতন থিয়াম যখন রবীন্দ্রনাথের এই জটিল সাংকেতিক নাটকটি মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘অদৃশ্য’ রাজাকে দৃশ্যপ্রধান মাধ্যম থিয়েটারে উপস্থাপন করা। তাঁর প্রযোজনা ‘শকুদাবা শকনাইবা’ (Shakudaba Shaknaiba)-তে তিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন।
রবীন্দ্রনাথের টেক্সটকে হুবহু অনুসরণ না করে, তাঁর দর্শনকে মঞ্চের ভাষায় অনুবাদ করলেন রতন থিয়াম। তাঁর নির্দেশনায় অন্ধকার ঘরটি আর কেবল রাজপ্রাসাদের কক্ষ রইল না, তা হয়ে উঠল মানুষের অবচেতন মন বা ‘Inner Self’। রতন থিয়াম ‘রাজা’-র মঞ্চভাষায় ভাবানুবাদ করলেন ‘Eternal Quest for Truth and Beauty’ বা সত্য ও সুন্দরের অনন্ত অন্বেষণ। আলোর জ্যামিতিক ব্যবহার এবং ছায়ার মায়াজাল (Chiaroscuro) দিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করলেন, যে ‘অন্ধকার’ ভীতিপ্রদ নয়; সত্যদর্শী। আলোকসম্ভব। তিনি দেখালেন, বস্তুবাদী পৃথিবীর চাকচিক্যে আচ্ছন্ন মানুষের মনের অজ্ঞানতাই রবীন্দ্রনাথের চিত্রিত ‘অন্ধকার’।
রানি সুদর্শনার যে ভুল—বাইরের চাকচিক্য বা সুবর্ণকে সত্য বলে মনে করা—তা আসলে আধুনিক মানুষেরই সংকট। রতন থিয়াম দেখালেন, রবীন্দ্রনাথের রাজা কোনো রক্তমাংসের ব্যক্তি নন, তিনি এক পরম সত্য বা ‘Supreme Reality’, যাকে চর্মচক্ষে দেখা যায় না, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করতে হয়। নাটকের ক্লাইম্যাক্সে যখন কাঞ্চীরাজ তাঁর ভুল বুঝতে পারেন এবং সুদর্শনা বলেন,
আমার এই পরাজয়েই আমার মুক্তি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manuel Puig: তাঁর চরিত্ররা খুব কমই উচ্চস্বরে কথা বলে; তারা ফিসফিসিয়ে কথা বলে, অন্ধকার ঘরে বসে স্বপ্ন দেখে, পুরনো সিনেমার পর্দার দিকে তাকিয়ে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জীবন খুঁজে বেড়ায়।
তখন তা কেবল সংলাপ থাকে না; রতন থিয়ামের নির্দেশনায় তা হয়ে ওঠে মানুষের ইগো বা অহংকারের বিনাশ এবং আত্মোপলব্ধির পথে এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই নাটকে নবদ্বীপ-জাতক রতন থিয়াম মণিপুরী ধ্রুপদী নৃত্য এবং নট-সংকীর্তনের উপাদান ব্যবহার করে যে অতীন্দ্রিয় আবহ তৈরি করেছেন, সেই আবহে দর্শক পৌঁছে যান আরেক নবদ্বীপ-নন্দনের কীর্তনের ‘ভাবোন্মাদ’ প্রদেশে।
ভারতীয়ত্ব: ‘থিয়েটার অফ রুটস’ ও রবীন্দ্র-দর্শন
রতন থিয়ামের নাট্যযাত্রার মূল মন্ত্র হলো ‘থিয়েটার অফ রুটস’ (Theatre of Roots) বা শিকড়সন্ধানী থিয়েটার। তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতীয় থিয়েটারকে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে হলে তাকে শেকসপিয়র বা ইবসেনের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের মাটির রসদ খুঁজে নিতে হবে। আর এখানেই তিনি রবীন্দ্রনাথের সবথেকে বড় উত্তরাধিকারী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে বলেছিলেন যে, দৃশ্যপট বা সিনারি দিয়ে দর্শকের চোখ ভোলানো নয়, বরং দর্শকের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলাই নাট্যকারের কাজ। রতন থিয়াম ঠিক এই দর্শনকেই তাঁর নাট্যশৈলীতে প্রয়োগ করেছেন।
তাঁর নাটকে জমকালো সেটের বদলে গুরুত্ব পায় অভিনেতার শরীরী ভাষা, কোরিওগ্রাফি এবং দেশজ অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ যেমন চেয়েছিলেন নাটক হবে নাচ, গান এবং কবিতার এক অখণ্ড রূপ, রতন থিয়ামও তাঁর নাটকে মণিপুরের ‘থাং-তা’ (Thang-Ta - মার্শাল আর্ট), ‘নট-সংকীর্তন’, ‘ওয়ারি-লিবা’ (Wari-Leeba- কথকতা) এবং লোকজ আচারকে মিশিয়ে এক ‘কম্পোজিট আর্ট’ (Composite Art) তৈরি করেছেন। তিনি বলেন,
Utilizing tradition by itself is not my tradition, rather utilizing it as a re-interactive tool is my tradition;
যে কথার অনুরণন আমরা পাই রবি ঠাকুরের দর্শনে–
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Film Industry Politics: আমরা দর্শক হিসেবে কী চাই? কাদের চাই? ‘ইয়েস স্যার’ বলা একদল অনুগত কর্মী, নাকি অনির্বাণ-ঋদ্ধির মতো ক্ষুরধার শিল্পী যারা পর্দায় জাদু তৈরি করতে পারেন? যখন রাজনীতি বা ইগো শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে, তখন ক্ষতিটা কোনো নির্দিষ্ট অভিনেতার হয় না, ক্ষতিটা হয় আমাদের—দর্শকদের, বাংলার সংস্কৃতির।
পুরাতনই যে চিরকাল পুরাতন থাকিবে তাহা নহে, তাহাকেই আবার নতুন করিয়া আবিষ্কার করিতে হইবে।
তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করা মানে কেবল একটি গল্প বলা নয়; বরং সেই ‘ভারতীয়ত্ব’ বা ‘ইন্ডিয়াননেস’-এর খোঁজ করা, যা পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ নয়।
সমকালে রবীন্দ্রনাথ ও রতন থিয়াম
আজকের যে পৃথিবীতে ট্রাম্পের মতো যুদ্ধবাজেরা পদ্মবনে মত্ত হস্তীর মতো আচরণ করছেন, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে রতন থিয়ামের মঞ্চানুবাদে রবীন্দ্রনাথকে ফিরে দেখা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মণিপুর নিজেও আজ এক দীর্ঘ অশান্ত সময় পার করছে। রতন থিয়ামের বিখ্যাত নাটক ‘চক্রব্যূহ’ (Chakravyuha) বা ‘নাইন হিলস ওয়ান ভ্যালি’ (Nine Hills One Valley)-তে আমরা দেখেছি সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে তিনি হয়তো প্রতিবাদের ভাষা বদলে শান্তির এক শাশ্বত পথ খুঁজেছিলেন।
মণিপুরের জাতিগত সংঘাত হোক, বা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার লড়াই—সবই আসলে সেই অজ্ঞানতার ‘অন্ধকার ঘর’ প্রকোষ্ঠ, যেখানে ‘তোমার আমার ফারাকের নয়া ফন্দি’ হয়ে উঠছে রিলস-ময় এই জড়-জগত। রবীন্দ্রনাথের নাটকে যেমন ‘অচলায়তন’ ভাঙার ডাক থাকে, তেমনই রতন থিয়ামও তাঁর এই নাট্যনির্মাণের মধ্য দিয়ে সেই মনের অচলায়তন ভাঙতে চান। রানি সুদর্শনা যেমন আগুনের মধ্য দিয়ে সত্যকে চিনেছিলেন, আজকের মানুষও যেন সেই মানস-সংঘাতের মধ্য দিয়ে সেই মানবিক সত্যকে খুঁজে পায়—এটাই রতন থিয়ামের অন্বেষণ। তিনি মনে করেন, আধুনিক সভ্যতা আমাদের ‘বহির্মুখী’ করে তুলেছে, কিন্তু শান্তি পেতে হলে আমাদের ‘অন্তর্মুখী’ হতে হবে, ফিরে তাকাতে হবে নিজেদের শিকড়ের দিকে।
তাঁর অরূপলোকে যাওয়ার পরের প্রথম জন্মবার্ষিকীর কালে দাঁড়িয়ে বলা যায়, রতন থিয়াম রবীন্দ্রনাথকে কেবল পাঠ করেননি, তিনি তাঁকে যাপন করেছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের নাটককে লাইব্রেরির আলমারি থেকে বের করে এনে মুক্তমঞ্চের ধুলোমাখা প্রান্তরে স্থাপন করেছেন। তাঁর মঞ্চে যখন রবীন্দ্রনাথের গান বা সংলাপ মণিপুরী বাচিকে উচ্চারিত হয়, তখন তা আর কোনো নির্দিষ্ট ভাষার থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন অনুভূতির ভাষা। অন্ধকারের রাজাকে আলোর মাঝে খুঁজে পাওয়ার এই যে নিরন্তর যাত্রা, সেখানেই রতন থিয়াম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন—যে বিন্দুর নাম
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীর,
যে ভারততীর্থে শোনা যাবে
নঈমউদ্দিনের তদারকি চিৎকার -/ বিজয়ন- আকিল- কুলজিৎ – বাইচুং/ মাঠটাকে আরও বড়ো কর।
সেই মাইল-মাইল অভিমান আর ভালোবাসার নাম স্বদেশ-স্বাধীনতা…







