কেন ম্যাচজুড়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন এই কঙ্গোলিজ সমর্থক?
DR Congo World Cup Fan: গণতান্ত্রিক কঙ্গোর পতাকার রঙে রঞ্জিত কোট-প্যান্ট পরে ৯০ মিনিট কোনো বিশ্রাম ছাড়া হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন মাঠে তাঁর ওভাবে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? এ কি নিছকই নিজের দেশের ফুটবল দলের প্রতি সাধারণ অনুরাগ, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের এক জ্বলন্ত কাহিনি?
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যে গোটা বিশ্ব একের পর এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। এখনকার আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী ইসরায়েল ক্রমাগত মানবসভ্যতার বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এই দেশগুলির প্রতিনিধি দল ও সমর্থকরা খেলার মাঠে এবং মাঠের বাইরে নিজেদের কণ্ঠস্বর বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিচ্ছেন। ফুটবল মাঠ আজ আর কেবল খেলার আসর নয়, তা হয়ে উঠেছে বিশ্বরাজনীতির এক অন্যতম প্রতিবাদের মঞ্চ।
সোমালিয়ার তথা আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজের দেশে ঢুকতে না দেওয়া, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আসা বিভিন্ন দেশের দলকে নিরাপত্তার নামে হেনস্থা করা এবং ইরানের ফুটবল দলকে আমেরিকায় থাকতে না দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতাকে ক্রীড়াপ্রেমীদের বড় অংশই ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত বিশ্বকাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ফুটবল কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এই খেলা চিরকাল শ্রমিক শ্রেণির খেলা হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের সবচেয়ে গরিব এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলির গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যাওয়ার এবং নিজেদের কথা বলার মঞ্চ এই ফুটবল। ইতিহাস চিরকাল তার সাক্ষী থেকেছে।
এবারের বিশ্বকাপও সেই অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে সমর্থকদের নিজেদের আওয়াজ পৌঁছনোর বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষদের হত্যার প্রতিবাদে হাজার হাজার সমর্থক মাঠে নিয়ে আসছেন ফিলিস্তিনের সাদা-কালো-লাল-সবুজ পতাকা। একইভাবে ইরানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে নিষিদ্ধ ইসলামিক রিপাবলিকের পতাকা মাঠে ওড়াচ্ছেন সমর্থকরা। খেলার মাঠে যখন সবাই নিজেদের দিক বেছে নিচ্ছেন, ঠিক তেমনই মাঠের বাইরেও নিজেদের মতামত ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জাহির করছেন তাঁরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তিনি ছিলেন একাধারে একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান বা শিশু বিশেষজ্ঞ এবং অর্থোপেডিক সার্জন। ভাবলে অবাক হতে হয়, যে মানুষটি রবিবার বিকেলে ব্রাজিলের জাতীয় দলের হয়ে মারাকানা স্টেডিয়ামে লক্ষাধিক দর্শকের সামনে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে খেলছেন, তিনিই আবার সোমবার সকালে স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে গরিব শিশুদের চিকিৎসা করছেন।
৫২ বছর পর বিশ্বকাপের ময়দানে নামতে চলেছে 'ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক দে কঙ্গো' (ডি.আর. কঙ্গো)। আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই দেশের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফেকন) খেলার সময় ২০২৫ থেকেই সমাজমাধ্যমে এক বিশেষ সমর্থকের ছবি দেখা গিয়েছে। তাঁকে নিয়ে ইতিমধ্যে উত্তাল হয়েছে গোটা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমী মহল।
গণতান্ত্রিক কঙ্গোর পতাকার রঙে রঞ্জিত কোট-প্যান্ট পরে ৯০ মিনিট কোনো বিশ্রাম ছাড়া হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন মাঠে তাঁর ওভাবে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কী? এ কি নিছকই নিজের দেশের ফুটবল দলের প্রতি সাধারণ অনুরাগ, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের এক জ্বলন্ত কাহিনি? যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে চিরকালের মতো ভুলিয়ে দিতে চায় সাম্রাজ্যবাদীরা।
ডি.আর. কঙ্গো এককালে ছিল বেলজিয়ামের উপনিবেশ। দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের গোটা জাতির মর্যাদা হারিয়ে, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকু খুঁইয়ে ক্রমাগত লুণ্ঠিত হয়েছে এই দেশের মানুষ। দাসপ্রথার দ্বারা আক্রান্ত এবং মানুষ হিসেবে মাথা তুলে বাঁচার অধিকারের কথা যখন ভুলে যেতে বসেছিল সমগ্র জাতি, তখন গোটা জাতির মেরুদণ্ড সোজা করতে হাত তুলে দাঁড়িয়েছিলেন কঙ্গোর সমাজতান্ত্রিক নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা। ভয়ডরহীন এই নেতা মানবমুক্তির লক্ষ্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করার আঙিনায় নিজেকে এনে ফেলেছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
FIFA World Cup 2026 Mexico: বিশ্বকাপের সমস্ত জাঁকজমককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামনে উঠে আসে সাধারণ শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
চে গেভেরা বক্তৃতায় যাঁকে 'বিশ্ববিপ্লবের শহিদ' হিসেবে সম্মান জানিয়েছেন, সেই লুমুম্বা ছিলেন কঙ্গোর বেলজিয়ানবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান পথিকৃৎ। ১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের উপনিবেশকে হটানোর পর প্রতিষ্ঠিত হয় 'রিপাবলিক দে কঙ্গো', যার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন প্যাট্রিস লুমুম্বা। তাঁর সেই হাত তুলে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমাটিই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে কঙ্গোর সংগ্রামের প্রধান প্রতীক।
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো শোষিত জাতির মানুষ জীবনে প্রথমবার মাথা তুলে মানুষের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করে, তখনই দাঁত-নখ বের করে তার শরীর চিরে দিতে চায় ঔপনিবেশিক শক্তিরা। চে গেভেরা, ঘাসান কানাফানি, চারু মজুমদার থেকে শুরু করে নিজেদের মাটির ও মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে শহিদ হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ এর বড় উদাহরণ। কঙ্গোর জাতীয় নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বার পরিণতিও হয়েছিল সালফিউরিক অ্যাসিডের প্রয়োগে সশরীর চিরতরে উবে যাওয়ার মধ্য দিয়ে অমর হওয়ার মতো।
১৯৬০ সালে বেলজিয়াম ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্বেগে কঙ্গোয় মিলিটারি ক্যুপ বা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। বন্দি করা হয় রাষ্ট্রনায়ক লুমুম্বাকে ও তাঁর কমরেডদের। পিছমোড়া করে বাঁধা বিধ্বস্ত লুমুম্বার সেই ছবি আজও খুঁজলে ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। ১৯৬১ সালে গাছে বেঁধে কয়েক রাউন্ড গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় লুমুম্বা-সহ তাঁর আরও দুই কমরেডের দেহ। যাতে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে না হয় এবং এই হত্যাকাণ্ড লুকিয়ে রাখা যায়, সেই জন্য লুমুম্বার দেহ সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে চিরতরে গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু একজন মানুষকে মারলেও তাঁর ভাবনাকে কি হত্যা করা যায়?
তার উত্তরই হচ্ছে ডি.আর. কঙ্গোর এই ফুটবল সমর্থক। লুমুম্বার সেই বিপ্লবী চেতনা আজও ৬০ বছর পরেও বয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি। বিশ্বের সামনে কঙ্গোর খেলা চলাকালীন তিনি লুমুম্বার মতো হাত তুলে ৯০ মিনিট দৃঢ় দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকেন।
১৭ জুন ছিল পর্তুগালের সঙ্গে ডি.আর. কঙ্গোর ৫২ বছর পর প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। ১-১ স্কোরের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বকাপের প্রথম পয়েন্ট এনেছে তারা। ইতিমধ্যে ডি.আর. কঙ্গোর ফুটবল ফেডারেশন এই সমর্থকের সমস্ত যাতায়াত ও টিকিটের খরচের দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও গতকাল তাঁকে মাঠে দেখা যায়নি। কী কারণে তিনি মাঠে ছিলেন না তা স্পষ্ট না হলেও মনে করা হচ্ছে, আমেরিকা তাঁকেও ভিসা দেয়নি।
এই ঘটনা অবশ্য একদমই অবাক করার মতো নয়। যাকে তিনি প্রতিদিন ম্যাচে অনুকরণ করেন, সেই লুমুম্বাকে হত্যা করার চক্রান্তে অন্যতম শরিক ছিল খোদ মার্কিনরাই। কিন্তু মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানসিক শক্তি জোগায় কঙ্গোর খেলোয়াড়দের। তাই তাঁরা তাঁদের দেশের প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যাতে উজবেকিস্তানের সঙ্গে পরের খেলায় তাঁকে মাঠে আনার বন্দোবস্ত করা হয়।
এম্বোলাডিঙ্গা শুধু একজন ক্রীড়া সমর্থক নন। তিনি মানবমুক্তির পক্ষের রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী। নিপীড়িত, লুণ্ঠিত, অপমানিত মানুষের বিশ্বের কাছে এক অনন্য প্রতিনিধি। গণতান্ত্রিক কঙ্গোর ১২ নম্বর খেলোয়াড় তিনি, তথা প্রত্যেকটি নিপীড়িত দেশের এবারের বিশ্বকাপের ১২ নম্বর খেলোয়াড়। তিনি জীবন ও ফুটবলের দর্শনের মিলনের এক প্রতীক।






