আজও আলো পড়েনি, মৃত্যু শতবর্ষে ফিরে দেখা সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক দুদ্দু শাহকে

শুধুরে ভাই জাতাজাতির দোষে।
ফিরিঙ্গীরা রাজা হলো এদেশে এসে।।
হিন্দু বৌদ্ধ জৈন মুসলমান পরস্পরে হিংসায় দিল প্রাণ ।
তাইতে তো পাদরি খ্রিস্টান যিশুখ্রিস্টের দ্বীন প্রকাশে ।।
কোটি কোটি ভারতবাসী এক হয়ে রইলো না মিশি।
কয়জন ফিরিঙ্গী আসি এদেশ জুড়ে বসে।।
হায়রে ধর্ম মানুষ জাতি এই কিরে তোর রীতিনীতি ।
লালন শাঁই কয় দুদ্দুর প্রতি ত্যাজে জাতপাতের নেশে।
এমন পদ যিনি বেঁধেছেন তাকে এবং তাঁর পদকে ঘিরে এপার বাংলার আমজনতার ভেতরে খুব একটা উৎসাহ দেখতে পাওয়া যায় না। পদটির রচয়িতা হলেন ফকির দবিরউদ্দিন প্রকাশ মল্লিক, যিনি দুদ্দু শাহ (জন্ম আনুমানিক ১৮৪১, প্রয়াণ , ১৯১১) নামে বাংলা ও বাঙালির কাছে পরিচিত। এপার বাংলার আমজনতার কাছে বিশেষ পরিচিত না হলেও তিনি যাঁর প্রধান ভক্ত, সেই ফকির লালন শাহকে ঘিরে এই পারের মানুষের কিছু উৎসাহ আছে।
দুদ্দু শাহ এর মৃত্যুর পর একশো বছর অতিক্রান্ত। তাঁর মৃত্যু শতবর্ষে বাংলাদেশ আলোড়ন হলেও এপার বাংলায় সেভাবে চর্চা হয়েছে এমন দাবি করা যায় না। দুদ্দু বাঙালি সংস্কৃতির রাজদরবারে কার্যত চরম অবহেলিত হয়ে রয়েছেন। শিক্ষিত ভদ্র সমাজে তাঁকে যে ভাবে তুলে ধরা হয়, সেই তুলে ধরবার ভেতরেও নানা ধরনের বিকৃতি দেখতে পাওয়া যায়। আর সেই বিকৃতি থেকে তাঁর সম্পর্কে ভুল ধারণা মানুষের ভিতরে তৈরি হয়।
মধ্যযুগের ভারতের সমন্বয়ী চেতনার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব কবীরের যে 'অখণ্ড ভারতপংথ' তরিকার সাধনা, সেই ধারার সাধনাতেই দুদ্দু শাহ জীবনপাত করেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বিরুদ্ধে। অখণ্ড বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসে বিদীর্ণ হয়ে তিনি যা সৃষ্টি করে গিয়েছেন তা এক অমূল্য এক নতুন দিগন্ত উদ্ভাসিত করছে।
ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু থানার হরিশপুর গ্রাম লাগোয়া বেলতলা গ্রামে ১৮৪১ সালে দবিরউদ্দিন এর জন্ম। এই হরিণাকুন্ডু থানার হরিশপুর গ্রাম কে মহাত্মা লালন সাঁই এর জন্মস্থান বলে অভিহিত করে থাকেন অনেকে। যদিও লালনের জন্ম সাল বা জন্মস্থান ঘিরে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পণ্ডিতরা এখনো পৌঁছাতে পারেননি। দবিরউদ্দিনের দুধ মল্লিক নামটি তাঁর পিতৃদত্ত নাম। আদর করে পুত্রকে তিনি দুধ মল্লিক বলে ডাকতেন। দবিরউদ্দিন, বাবার আদরের ডাক দুধ মল্লিককে অতিক্রম করে দুদ্দু শাহ নামেই সাধারণ মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
দুদ্দু শাহের পিতা ঝড়ু মণ্ডল ছিলেন একজন সম্পন্ন কৃষক। শোনা যায়, তাঁর প্রায় ১৭০ বিঘা জমি ছিল। সেই জমিতে তিনি ধান, পাট এবং নানা রকমের শাক সবজি চাষ করতেন। বেশ ভাল রকমের সামাজিক প্রতিপত্তিও ছিল। সমাজপতি হিসেবে তিনি স্থানীয় অঞ্চলের যথেষ্ট সমাদৃত হতেন। মধু মণ্ডল, পিরু মন্ডল , গরাই মন্ডল এবং দুদ্দু শাহ এই চারজন ছিলেন তাঁর সন্তান। তাঁদের এই 'মণ্ডল' উপাধিটি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার ক্ষমতার পরিচায়ক অর্থেই ব্যবহৃত হতো।
শৈশবে প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত ঝোঁক ছিল দুদ্দুর। প্রথাগত পড়াশুনায় তিনি অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতি শৈশবেই দুদ্দু শাহ নিজের প্রতিভার অসামান্য পরিচয় দিয়েছিলেন। হরিশপুর গ্রামের শ্রীনাথ বিশ্বাসের পাঠশালায় ছোটবেলায় ভর্তি হয়েছিলেন । সেখানে বাংলা, সংস্কৃত ,আরবি সহ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আধুনিক ধারার সঙ্গে তাঁর একটা গভীর আত্মিক সংযোগ গড়ে উঠেছিল। ঝিনাইদহ অঞ্চলের বহুভাষাবিদ মদন দাস গোস্বামীর কাছে পৃথিবীর প্রধান আটটি ভাষা শিখেছিলেন দুদ্দু। ছাত্র হিসেবে তিনি অত্যন্ত কৃতি ছিলেন। ভাষাগত দক্ষতার জন্য তিনি অতি শৈশবেই তাঁর পরিচিত তৈরি হয়েছিল। এই জন্যে সকলের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
আশ্চর্য স্মৃতি শক্তির অধিকারী ছিলেন দুদ্দু। কোনো রকম গল্প কাহিনি, ইতিহাসের বিষয়বস্তু একবার শুনলে তার মধ্যে সেটি গেঁথে যেত। অধ্যাবসায় আর শিক্ষকদের সাহচর্যে তিনি অতি অল্প বয়সেই প্রথাগত পড়াশুনো এবং লেখার কাজে নিজের দক্ষতার অনবদ্য স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য তিনি কিন্তু তার শিক্ষকদের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন। পাঠশালার পড়াশুনা শেষ করে দুদ্দু শাহ স্থানীয় এক বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব, মাওলানা সাহেবের কাছে আরবি, ফারসি ভাষা এবং সাহিত্য সম্পর্কে সম্যক বিদ্যা চর্চা করেছিলেন।কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার তিনি একজন কৃতি ছাত্র ।সেখান থেকেই টাইটেল পাস করে কোরান হাদিসের প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লালন শাহ ফকিরের গুরু সিরাজ সাঁই হরিশপুর অঞ্চলের করতেন। দুদ্দুর কৈশোরকালে নিজের গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সেবা-শুশ্রূষার উদ্দেশ্যে এই হরিশপুর গ্রামটিতে লালন শাহ বেশ অনেক বার এসেছেন।থেকেছেন। লালন যখন সিরাজ সাঁঈয়ের আখরায় অবস্থান করতেন ,সেই সময়ে সিরাজ সাঁইয়ের বাড়ির গবাদি পশু গুলোকে তিনি বহু সময় স্থানীয় বেলতলার ঠাকুরতলায় চড়াতে নিয়ে আসতেন।
এই সব কর্মকাণ্ড যখন চলছে, তখন কিন্তু দুদ্দু সেই সেই মেঠো পথ দিয়েই পাঠশালায় আসা-যাওয়া করছেন।ঠাকুরতলাটি পড়তো দুদ্দুর পাঠশালায় যাওয়ার পথে। শিশু দুদ্দুর পাঠশালায় যাওয়া-আসার মেঠো পথের ধারে গুরু সিরাজ সাঁইয়ের গরু চরাতে চরাতে একদিন লালন গেয়ে উঠলেন-
পড়ে ভূত আর হোস নে মনু রায়।
কোন হরফে কি ভেদ আছে লেহাজ করে যান হয়।
আলিফ হে আর মিম দালেতে আহমদ নাম লেখা যায়।
আবার মিম হরফ টি নফি করে দেখ না খোদা কারে কয়।।
আকার ছেড়ে নিরাকারে ভজলি রে পাগলের প্রায়।
আহাদে আহামদ হলো করলিনে তার পরিচয় ।।
জাতে সেফাত সেফাতে জাত দরবেশে তাই জানিতে পায়।
লালন বলে কাঠমোল্লাজী ভেদ না জানিতে পায়।।
যে মানুষটি গরু চরাতে চরাতে গান গাইছে, প্রথাগত শিক্ষা আশ পাশ দিয়ে তিনি হয়তো কখনও যাননি, সেই মানুষটির কন্ঠ থেকেই অমন অকাট্য, যুক্তিপূর্ণ কথা, আর পবিত্র কোরানের অমন সুন্দর ব্যাখ্যা শুনে দুনিয়াদারি কে নতুন করে ভাবতে শিখলেন সেই শিশুটি।

আলাপ জমে উঠল লালন- দুদ্দুর। ভাবীকালের মানব সভ্যতার যেন এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটলো । এই কথোপকথনের কালে লালন গেয়ে উঠলেন;
তরিকতে দাখিল হলে সকলই জানা যায়। কেনরে মন কোলের ঘোরে ঘুরছো ডানে-বাঁয়।।
আউয়ালে বিসমিল্লাহ বর্ত মূল জেনো তিনটি অর্থ ।
আগমে বলেছে সত্য ডুবে জানতে হয়।।
নবী আদম খোদা খোদা এ তিন কভু নহে জুদা।
আদমে করিলে সেজদা আলাক্কজনা পায়।।
যথা আলাক্ক মোকামবাড়ি শফিউল্লাহ তাহার সিঁড়ি।
লালন বলে মনের বেড়ি লাগাও গুরুর পায়।
শিশুটির মনে হল, কী শুনছে? আমিত্ব থেকে যেন নিজেকে বের করে আনতে পারছে সে। গুরুর পথ নির্দেশ ব্যতীত যে আমিত্ব তৈরি হয়, তা মানুষকে এক অদ্ভুত মোহজালের মধ্যে আবিষ্ট করে রাখে। আর এই বৃদ্ধ রাখালের কন্ঠ থেকে যে পদ তিনি শুনলেন, সেই পদ যেন গুরুবাদের রহস্য রাজ্যে র প্রবেশ দ্বার তার সামনে খুলে দিল। গুরুর অকুল পাথার আহ্বানের ভিতরে মনের মানুষের অধুসন্ধানের চাবিকাঠি মিলে গেল সেই শিশুটির কাছে।
দুদ্দু শাহের সাঁইজীকে কোনো প্রশ্ন করার সাহস হয়নি। বড় ভাবনা কিন্তু ধরা যায় না ।বাধা যায় না। তাই ছোট বা আপনার কোন প্রশ্নের নিগড়ে তিনি গুরুর ভাবনাকে ধরতে রাজি ছিলেন না। অথচ গান মাতাল করে দিল শিশু দুদ্দুকে। গানের অর্থ বুঝতে তিনি শরণাপন্ন হলেন তাঁর পাঠশালার প্রবীণ শিক্ষক মদন দাস গোস্বামী কাছে।
পাঠশালার প্রবীণ শিক্ষকের ব্যাখ্যায় থেকে একটু হলেও গানটির অর্থ হৃদয়ে প্রবেশ করাতে সক্ষম হলেন শিশু দুদ্দু। প্রথাগত ধার্মিক আচরণের যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে তিনি বড় হচ্ছেন, সেই সব শরীয়তী তারিকা থেকে বেরিয়ে আসা এক দিনের মধ্যে সম্ভব নয়। সব কিছুরই একটা সময় আছে এ।কটা কাল প্রবাহ আছে। তাই তখনই মহাত্মা লালন শাহের নির্দেশ মেনে এগিয়ে যাওয়ার পথে ইচ্ছে থাকলেও, সাহস অনুভব করতে পারলেন না দুদ্দু। তিনি তখন উঠতি শিক্ষিত শৈশব-কৈশোরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো এক নব উত্থিত ব্যক্তিত্ব। পারিবারিক বংশগৌরব ঘিরেও তাঁর কিছুটা গর্বিত মনোভাব তখনও আছে।

তাই তাঁর বংশের যে সামাজিক প্রতিপত্তি, সেটা অনুভব করেই একজন অতি সাধারন ,প্রায় বৃদ্ধ রাখালের কথা শুনে নিজের জীবনকে অন্য খাতে নেওয়ার মতো মনের অবস্থা কখনো দুদ্দুর তৈরি হয়নি। লালন শাহ তাঁকে প্রথম জীবনে যেভাবে মনের গহিনে, মনের মানুষের বীজ বপন করতে চাইলেন, ঠিক সে পথে পা না বাড়িয়ে দুদ্দু শাহ তখনই রাজি ছিলেন না।
প্রথাগত শিক্ষার পথকেই নিজের যাপন চিত্রের একটা অবশ্যম্ভাবী চিহ্ন হিসেবে বেছে নিলেন তিনি। ভর্তি হলেন কলকাতা মাদ্রাসা আলিয়া মাদ্রাসায়। ধর্মীয় শিক্ষা এবং সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশে যেটুকু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ধারা সেখানে প্রচলিত ছিল, সেই কার্যক্রমে পঠন-পাঠন শুরু করলেও তাঁর মন কিন্তু পড়ে রইল সেই রাখাল বালকের কাছেই।
সেই টানেই দুদ্দু তাঁর গোটা জীবন আর সাধনাকে পরিচালিত করলেন।








