একদিনে নয়, ধাপে ধাপে যেভাবে বাংলার দুর্গাপুজো পেল ইউনেসকো-র স্বীকৃতি
ইউনেসকো-স্বীকৃত হলো বাঙালির দুর্গাপুজো। কার অবদান নেপথ্যে?

ইউনেসকো-র স্বীকৃতি পাওয়ার পর ২০২২-এ এই প্রথম আন্তর্জাতিক পুজো। অনুষ্ঠানের সাজো সাজো রব ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। গত ২২ অগাস্ট নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে পুজো কমিটির উদ্যোক্তা-কর্মকর্তাদের নিয়ে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। গোটা রাজ্যেই সাজো সাজো রব এইবার। প্রায় ৪৩ হাজার ক্লাবের প্রাপ্য সরকারি অনুদান ৬০,০০০ টাকা। ১ অক্টোবর থেকে ঢাকে কাঠি পড়বে, ৮ অক্টোবর পুজো কার্নিভাল এবং ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটি। দু'বছর করোনার প্রকোপে বাংলার অন্যতম প্রধান এই উৎসব খানিক ম্রিয়মান হয়ে পড়েছিল। এই বছর ফের শতগুণ জৌলুসে ফিরতে চলেছে তাই-ই। এই নিয়ে চিরাচরিত উচ্ছ্বাস খানিক চোখে পড়ছে সাধারণ মানুষেরও। চালচিত্র শিল্পী থেকে কুমোরটুলি, মধ্যবিত্ত পাড়া থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত বসত, পুজোর অপেক্ষা এক চঞ্চলতা এনে দিয়েছে।
চিরাচরিত আমরা বলি বটে, কিন্তু বাংলার বুকে এই উৎসবের পথ চলা কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। শক্তির উপাসনা অবশ্য ছিল। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ধর্মে তা নানা রূপ পেয়েছে। অসমের পাল ও বঙ্গের সেন রাজাদের আমলেই পুজোর সূত্রপাত। সেখান থেকে শহর কলকাতায় এসে পৌঁছতে তার সময় লেগেছিল বিস্তর। প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি। যাই হোক, রাজা কংসনারায়ণের হাতে যে পুজোর শুরু, ইতিহাসের নানা মোড়ে রং বদলেছে সেও। ঔপনিবেশিক আমলে বাবুদের বাবুয়ানি, নব্য জমিদারদের দেখনদারি পুজোয় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছিল। কোম্পানির পুজোর হাত ধরে উপনিবেশের গোড়ার দিক থেকে ধীরে জাতীয়তাবাদী ভাবনায় 'দেশমাতৃকা'-র ধারণা সৃষ্টি, স্বদেশি আন্দোলন থেকে স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসি আমল, বাম আমল হয়ে তৃণমূল আমলে নানা পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে এই উৎসব। বঙ্গভঙ্গের সময় জাতীয়তাবাদকে এলিট শ্রেণি থেকে গণ-তে চালনা করার প্রয়োজন বোধ এল। সার্বজনীন দুর্গোৎসব এল গান্ধীর পাশাপাশি। এর পরের দশক গুলিতেও ক্ষমতা গণের যোগদান নিয়ন্ত্রণে পুজোর রূপ বদলে দিতে থেকেছে। পাড়ার পুজো থেকে পুজোয় বাম দলগুলির বুকস্টল যে পন্থায় এসেছে, তার হাত ধরেই অধুনা ক্লাবের ষাট হাজারি পুজো। ফলে এ জিনিস দেখে বিশেষ চমৎকৃত হয়ে লাভ নেই। বরং উৎসবের মূল সুরটির বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চারশো বছর ধরে পাল্টে পাল্টে গেছে বাঙালির উৎসব।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ঔপনিবেশিক আমলের মতোই মামলা সংস্কৃতির আমদানি হয়েছে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আদতে মার্কিন মুলুকের মতো পরস্পর প্রভাববর্জিত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তবু এই ধারণা এইভাবে বিক্রি হচ্ছে কেন, তার পিছনে উদ্দেশ্যটাই বা কী, সবটাই খুব সাধু উদ্দেশ্য কি না— তা নিয়েও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। আপাতত ক্লাবগুলিকে বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়া নিয়ে মামলার সূত্রপাত। বলা বাহুল্য, এই ক্ষোভ মধ্যবিত্তোচিত। আপামরের এই নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। আর এই উৎসবের ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখলে এই বিশেষ সময়ে বিশেষ বড় অঙ্কের টাকা ঢালার প্রবণতা খুব একটা নতুন কিছু না।
ইউনেসকো-স্বীকৃত হলো পুজো। ২০২১-এ ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত আবহমান বিশ্বসংস্কৃতি রক্ষা সংক্রান্ত ইউনেসকো-র আন্তঃসরকারি কমিটির ষোড়শ সম্মেলনে কলকাতার দুর্গাপুজো 'মানবতার জন্য আবহমান অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য'-র তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। এই বিষয়ে প্রধান অবদান তপতী গুহঠাকুরতার। ২০০৩ সাল থেকেই প্রেসিডেন্সির এই প্রাক্তন অধ্যাপিকা ও সেন্টার ফর সোশ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর অধ্যাপিকা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনিই কিছু ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে ইউনেসকো-র অধিবেশনে আবেদন করেছিলেন। ইউনেসকো-র স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রথম দুর্গাপুজো পালনে আড়ম্বরের ত্রুটি নেই। বৃহস্পতিবার জোড়াসাঁকো থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ হয়ে মেগা র্যালি পৌঁছয় রেড রোডে। অসংখ্য লোকের ঢল। বছর দুই বাদে পুজোর উন্মাদনায় এই জনজোয়ারের সাক্ষী থাকল কলকাতা। রাস্তার পাশে মানুষ দেখছিলেন উৎসুক চোখে। উত্তেজনা চারিয়ে গিয়েছিল আশপাশের অঞ্চলেও। মিছিল এতটাই বড়, মাথা যখন ডোরিনা ক্রসিংয়ে, শেষ তখনও গিরিশ পার্কে।
কলকাতা, উত্তর চব্বিশ পরগণা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, হাওড়া এবং সল্টলেক মিলিয়ে ২৫০০-এরও বেশি পুজো কমিটি এই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। রেড রোডে ইউনেসকো-কে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মঞ্চ করা হয়েছিল। সেই মঞ্চে ইউনেসকো-র প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা গেল তপতীকেও। প্রাক্তন অধ্যাপিকাকে নিজের হাতে সম্মাননা জ্ঞাপন করেন মমতা। ২০১৫ সালে প্রকাশ পায়, 'ইন দ্য নেম অফ দ্য গডেস: দ্য দুর্গাপূজাস অব কনটেম্পরারি কলকাতা'। তপতী গুহঠাকুরতার গবেষণাধর্মী এই বইটির ভূমিকায় জানানো হচ্ছে, সহকর্মী এবং বন্ধু অঞ্জন ঘোষের সঙ্গে একটি জয়েন্ট প্রোজেক্টে কাজ শুরু করেন তিনি। পরে নিজের দীর্ঘ গবেষণার ভিত্তিতে ২০১৫ সালে প্রকাশ পায় সেই বই। এই লড়াইয়ের ভিত শক্ত হল। ২০১৮ থেকে ইউনেসকো-র হেরিটেজ তকমা পাওয়ার জন্য লড়াই শুরু করেন তপতী। ডসিয়ার তৈরি করে কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়। পরে তা ইউনেসকো-র মনোনয়নের জন্য যায়। ২০২১ নাগাদ তপতীর এই দীর্ঘ লড়াই সফল হয়। এই নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক চলছিল। কেউ কেউ অভিযোগ আনছিলেন, তপতীর দীর্ঘ লড়াইয়ের সুফল সম্পূর্ণ আড়াল করতে চাইছেন মমতা। নিজে কৃতিত্ব নিতে চাইছেন। কিন্তু প্রকাশ্য মঞ্চে ১ সেপ্টেম্বর তপতী গুহঠাকুরতাকে সম্মান জ্ঞাপন করে সে বিতর্কের অবসান করলেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং।








