মতুয়ারাও ভোট দিল না মমতাকে! নাগরিকত্ব পেতে ভরসা মোদি-শাহ?
তৃণমূল মতুয়াদের আবেগ কাজে লাগাতে চাইলেও, ন্যারেটিভ তৈরি করতে ব্যার্থ হয়েছে— ফলাফলেই তা স্পষ্ট। এখন দেখার, মতুয়াদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখে কি না বিজেপি সরকার।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব রেখেছে মতুয়া ভোটব্যাংক। উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়া— রাজ্যের এই তিন জেলার অন্তত ২৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে মতুয়া ভোটারদের প্রভাব সরাসরি ফল নির্ধারণে ভূমিকা নেয়। ফলে এই তিন জেলায় সামান্য ভোটের হেরফেরও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আগে থেকেই আশঙ্কা ছিল রাজনৈতিক মহলে।
দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণে উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং নদিয়ায় ৯২ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছে। সংখ্যার বিচারে এই অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালের নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি আসনের মধ্যে ২৮টি পেয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি জিতেছিল ৫টি। ২০২৬-এর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল নেমে এসেছে ১১টি আসনে এবং বিজেপি শক্তি বৃদ্ধি করে ঝুলিতে ভরেছে ২২টি আসন। অন্যদিকে, নদিয়ার ১৭টি আসনে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ৯টি, তৃণমূল ৮টি। এবার বিজেপি পেয়েছে ১৪টি আসন এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৩টি আসন। এমনকী, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় যেখানে ২০২১-এ একটিও পদ্ম ফোটাতে পারেনি রাজ্য বিজেপি। এই জেলায় মোট ৩১টি আসনের ৩০টি পেয়েছিল তৃণমূল, আইএসএফ পেয়েছিল একটি আসন, আর বিজেপি কোনো আসনই পায়নি। ২০২৬-এর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এই জেলায় শূন্য থেকে নিজেদের আসনসংখ্যা ১০ করে ফেলেছে গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে তৃণমূলের আসনসংখ্যা এখানে কমে হয়েছে ২০। আইএসএফ ধরে রেখেছে ভাঙড় বিধানসভাকেন্দ্রটি।
ভোটের আগে মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু উত্তর ২৪ পরগনাতেই প্রায় ৩.২৫ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বনগাঁ মহকুমায়, যা মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম ঘাঁটি, যাচাইয়ের আওতায় থাকা ভোটারদের মধ্যে ৬৭% থেকে ৮৮% পর্যন্ত নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। গাইঘাটায় ২২,২৭৮ জনের মধ্যে ১৬,২২২ জনের নাম বাদ গেছে, বাগদায় ১৫,০০০-এর বেশি নাম বাদ পড়েছে। বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
নদিয়ার কৃষ্ণনগর উত্তর, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ ও রানাঘাট এলাকায় যাচাই হওয়া ভোটারদের ৯০ শতাংশেরও বেশি চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। প্রশাসনের হিসেব বলছে, এই বাদ পড়া নামের বড় অংশই মতুয়া নমশূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে। ২০২৪ সালের মার্চে নিয়ম চালু হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১.১২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ১৫,০০০টি অনুমোদিত হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া থেকেই এসেছে ৫০,০০০-এর বেশি আবেদন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী সব থাকা সত্ত্বেও কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ভাঙল? অভয়া আন্দোলনের ক্ষোভেই কি বাংলার মেয়েরা এ বার বিজেপির দিকে ঝুঁকল?
ফলে বহু বাসিন্দা, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়েছেন, তারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এতে তাঁদের নাগরিক পরিচয় এবং ভোটাধিকার— উভয়ই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর SIR পর্বে বলেছিলেন,
“এক লক্ষ মতুয়া ভোট দিতে না পারলেও সেটা মেনে নিতে হবে।”
অনুপ্রবেশকারীদের আটকাতে এইটুকু সহ্য করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
এই ইস্যুতে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, SIR-এর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মতুয়া ভোটারদের ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির কিছু স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বাগদা ও গাইঘাটায় বিক্ষোভ এবং দলত্যাগের ঘটনাও সামনে এসেছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Government in West Bengal: ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এল বাংলার ক্ষমতায়। এই পরিবর্তনে কি সত্যিই দুর্নীতি, বেকারত্ব, কাটমানির রাজনীতি শেষ হবে? নাকি শুধু শাসকের মুখ বদলাবে, মানুষের ভাগ্য নয়?
যদিও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভোটপ্রচারে এসে মতুয়া সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন যে, CAA-এর মাধ্যমে তাঁদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে। তিনি উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে প্রার্থনা করেন এবং দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও একই বার্তা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া নমশূদ্রদের সংখ্যা প্রায় ১৭-১৮ শতাংশ বলে অনুমান। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, হাওড়া, কোচবিহারসহ বিভিন্ন জেলায় তাঁদের বিস্তার রয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের পেছনে এই সম্প্রদায়ের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতায় মতুয়া ভোট আর একমুখী নয়। ঠাকুর পরিবার-সহ নেতৃত্বের মধ্যেই বিভাজন তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ভোটব্যাঙ্কে পড়ছে।
আসলে, মতুয়া সমাজের ভোট কোন দিকে যাবে, তার পিছনে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে ঠাকুরবাড়ি-র। ঠাকুরবাড়ির ‘বড়মা’ নামে পরিচিত প্রয়াত বীণাপাণি দেবী-র সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্রেই বীণাপানির দুই ছেলে কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর এবং মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুর-কে সক্রিয় সংসদীয় রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২১ সালে যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন এবং তৃণমূল ২১৫। ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে বিজেপি জয়লাভ করেছে ২০৭ আসনে এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৮০টি আসন।
তবে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সেই সময় বিজেপিতে যোগ দেন মঞ্জুলকৃষ্ণ। আর তার পর থেকেই কার্যত ঠাকুরবাড়ির ভিতরে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে ঠাকুরবাড়ির দুই ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন কপিলকৃষ্ণের স্ত্রী মমতাবালা ঠাকুর (TMC) এবং মঞ্জুলকৃষ্ণের ছেলে শান্তনু ঠাকুর (BJP)। ফলে মতুয়া রাজনীতির সমীকরণে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর দীর্ঘ সময় এই মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে শক্ত ভিত তৈরি করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে দ্রুত প্রভাব বাড়াতে শুরু করে ভারতীয় জনতা পার্টি।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এই ২৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১১টিতে এগিয়ে যায় বিজেপি। বাকি ১২টি আসনে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। পরে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সেই প্রবণতা প্রায় অক্ষুণ্ণ থাকে। যে দল যে আসনে লোকসভায় এগিয়েছিল, পরের বিধানসভা ভোটে মূলত সেই দলই আসন ধরে রাখে।
তবে রাজনৈতিক সমীকরণ আবারও বদলাতে শুরু করে ২০২৪ সালের উপনির্বাচনের পরে। মতুয়া প্রভাবিত বাগদা কেন্দ্র হাতছাড়া হয় বিজেপির।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া অধ্যুষিত আসনগুলির মধ্যে বিশেষ নজরে ছিল বাগদা ও গাইঘাটা। বিশেষ করে বাগদা কেন্দ্র ঘিরে আগ্রহ ছিল বেশি। কারণ, সেখানে কার্যত ঠাকুর পরিবারের দুই রাজনৈতিক ধারার সরাসরি লড়াই দেখেছে রাজ্য রাজনীতি। ননদ মধুপর্না ঠাকুর এবং বৌদি সোমা ঠাকুরের লড়াই ঘাসফুল ও পদ্মফুল প্রতীক সঙ্গে নিয়ে। ফলাফল প্রকাশের পদ্ম হাতে জয়ী শান্তনু-স্ত্রী সোমা।
এই নির্বাচন তাই শুধু রাজনৈতিক লড়াই ছিল না, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও ছিল। একদিকে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, এই পরিস্থিতি মতুয়া সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কিন্তু তারপরও নাগরিকত্ব পাওয়ার স্বার্থে মোদি-শাহদের প্রতি আস্থা রেখেছেন মতুয়ারা। তৃণমূল মতুয়াদের আবেগ কাজে লাগাতে চাইলেও, ন্যারেটিভ তৈরি করতে ব্যার্থ হয়েছে— ফলাফলেই তা স্পষ্ট। এখন দেখার, মতুয়াদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখে কি না বিজেপি সরকার।








