উমর, সার্জিলদের বিচার হয়নি পাঁচ বছরেও: জামিনের সিদ্ধান্তে ভিন্নতা কেন?
Umar Khalid, Sharjeel Imam bail: ৫ জানুয়ারি পাঁচ জন অভিযুক্তের জামিন পাওয়াকে অনেকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এই স্বস্তির মধ্যেও একটি অস্বস্তিকর বার্তা লুকিয়ে আছে। কারণ আদালত যে যুক্তিতে পাঁচ জনকে মুক্তি দিয়েছে, সেই যুক্তিই উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের ভূমিকা নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্তকে আরও পোক্ত করছে।
দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় শুধু দু'টি জামিনের আবেদন খারিজের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। এই রায় ভারতের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আবারও বহু চর্চিত প্রশ্ন সামনে এনেছে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন মানুষকে কতদিন বন্দি করে রাখা যেতে পারে, আর সেই সময়সীমার দায়ই বা কার?
৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন আবেদন খারিজ করে। আদালতের যুক্তি ছিল, দিল্লি দাঙ্গায় এই দুই অভিযুক্তের ভূমিকা অন্যদের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং পুলিশের পেশ করা তথ্য-প্রমাণ প্রাথমিক ভাবে বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। আদালত আরও জানায়, পাঁচ বছর ধরে কারাগারে থাকা এবং বিচার শুরু না হওয়া— এই দু'টি বিষয়ই জামিন পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারে না।
এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই দেশজুড়ে আইনজীবী মহল, মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, একই আদালত, একই সংবিধান, অথচ জামিনের ক্ষেত্রে এমন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কেন? এ কথা বলা হচ্ছে কারণ, দিল্লি দাঙ্গা মামলার রায়ের ঠিক পরের দিনই সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি মামলায় দুই বিচারপতির বেঞ্চ সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নেয়। ৬ জানুয়ারি আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত একটি মামলায় অভিযুক্ত অরবিন্দ ধামকে জামিন দেয় আদালত। এই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রায় ১৭ মাস ধরে বিচার শুরুর আগেই কারাগারে ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট বা পিএমএলএ অনুযায়ী মামলা চলছিল।
এই রায়ে আদালত স্পষ্ট জানায়, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে যে তার বিরুদ্ধে চলা মামলা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে শেষ হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, যদি তদন্তকারী সংস্থা বা রাষ্ট্র বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় অভিযুক্তের উপর চাপিয়ে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটকে রাখা যায় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Umar Khalid: ২০১৮ সালের ১৩ অগাস্ট, সংসদ ভবন থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে অজ্ঞাত পরিচয় দুই যুবক উমরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
এই দু'টি রায় পাশাপাশি রাখলেই প্রশ্ন উঠে আসে, বিচারে বিলম্ব কি কখনও জামিনের পক্ষে যুক্তি হতে পারে, নাকি তা কেবল নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?
এখানে দিল্লি দাঙ্গার মামলার প্রেক্ষাপট জানাও জরুরি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ৫৪ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। দিল্লি পুলিশের দাবি, ২০১৯ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এই দাঙ্গা সংগঠিত করা হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ‘দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়। মামলায় মোট ২০ জন অভিযুক্তের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া ১৮ জনের মধ্যে ইতোমধ্যেই ১১ জন জামিন পেয়েছেন। ৫ জানুয়ারি বাকি সাত জনের জামিন আবেদনের শুনানি হয়। আদালত পাঁচ জনকে জামিন দিলেও উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের আবেদন খারিজ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই সাত জনের ভূমিকা সমান ছিল না। পাঁচ জনের ক্ষেত্রে আদালত মনে করেছে, তাঁদের অংশগ্রহণ সীমিত পর্যায়ে ছিল এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগ পাওয়া যায় না।
এই যুক্তিতেই লুকিয়ে আছে আরেকটি বিতর্কিত প্রশ্ন। যদি একই মামলায় অভিযুক্তদের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন হয়, তবে সেই মূল্যায়নের ভিত্তি কী? আর সেই মূল্যায়ন কতটা স্বাধীন, কতটা পুলিশের দাবির উপর নির্ভরশীল?
এই মামলার অন্যতম কেন্দ্রীয় শব্দ হয়ে উঠেছে ‘ষড়যন্ত্র’। পুলিশ ও আদালতের পর্যবেক্ষণে বারবার এই শব্দটির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা খুব কম ক্ষেত্রেই সামনে এসেছে। পুলিশের চার্জশিট অনুযায়ী, উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম দাঙ্গার পরিকল্পনা, জনসমাবেশ সংগঠিত করা এবং দাঙ্গার দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আদালত জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাঁরা এই দাবির সঙ্গে একমত। কিন্তু এই ‘প্রাথমিক ভাবে একমত’ হওয়ার মানদণ্ডই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। কারণ ইউএপিএ-র মতো কঠোর আইনে জামিনের সময় আদালতকে কেবল প্রমাণের উপরিভাগ দেখতে বলা হয়েছে। গভীরে গিয়ে সেই প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রাথমিক মূল্যায়ন কি কার্যত অভিযুক্তকে আগাম শাস্তি দেওয়ার সমান হয়ে উঠছে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-র একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। এই আইনে জামিন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ আদালত যদি মনে করে যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি সত্য বলে মনে হচ্ছে, তাহলে জামিন দেওয়া যায় না।
২০১৯ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই অবস্থান আরও কঠোর করা হয়েছিল। সেই রায়ে বলা হয়, ইউএপিএ মামলায় জামিন শুনানির সময় আদালতকে অভিযোগের গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টই আবার একাধিক রায়ে জানিয়েছে, যদি কেউ দীর্ঘ সময় ধরে বিচার ছাড়াই বন্দি থাকেন এবং বিচার দ্রুতই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জামিন দেওয়া উচিত। এই দু'রকম দ্বন্দ্বের কারণেই প্রশ্ন আরও জোরাল হচ্ছে।
উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম গত পাঁচ বছর ধরে জেলবন্দি রয়েছেন। অথচ এই মামলার বিচার এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরুই হয়নি। মামলাটি বর্তমানে চার্জ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। চার্জ গঠন নিয়ে সওয়াল-জবাব চলছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। এত দীর্ঘ সময় ধরে চার্জ গঠনেও পৌঁছতে না পারার দায় কার? আদালত বলেছে, তারা দিল্লি পুলিশের যুক্তির সঙ্গে একমত যে এই বিলম্বের জন্য অভিযুক্তরাও আংশিকভাবে দায়ী। এই যুক্তি নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। কারণ ইউএপিএ-র অধীনে সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। সেখানে পাঁচ বছর কেবল বিচার শুরুর অপেক্ষায় কাটিয়ে দেওয়ার পরও যদি বলা হয় অভিযুক্তরাই দায়ী, তাহলে বিচার ব্যবস্থার দায় কোথায়?
এ কথাও বলতে হয়, ২০২৪ সালে আম আদমি পার্টির নেতা মণীশ সিসৌদিয়াকে জামিন দেওয়ার সময় আদালত বলেছিল, চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কারাবাস কার্যত শাস্তির সমান হয়ে যায়। কিন্তু দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলার রায়ে এই নজিরগুলির কোনো উল্লেখ নেই। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই নীরবতা?
৫ জানুয়ারি পাঁচ জন অভিযুক্তের জামিন পাওয়াকে অনেকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এই স্বস্তির মধ্যেও একটি অস্বস্তিকর বার্তা লুকিয়ে আছে। কারণ আদালত যে যুক্তিতে পাঁচ জনকে মুক্তি দিয়েছে, সেই যুক্তিই উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের ভূমিকা নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্তকে আরও পোক্ত করছে। আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, সাত জন অভিযুক্তের ভূমিকা একই রকম ছিল না। এই বিভাজন ভবিষ্যতে বিচার প্রক্রিয়ায় আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁরা এও বলছেন, এই রায় ভারতের ভিন্নমত, প্রতিবাদ এবং নাগরিক স্বাধীনতার সীমারেখা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিনা বিচারে পাঁচ বছর কারাগারে থাকা কি জামিন পাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি নয়? আদালত কি এখানে সরকারের যুক্তিকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করছে? আর যদি বিচার ব্যবস্থাই সময় মতো বিচার শেষ করতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতার মূল্য কি অভিযুক্তকেই দিতে হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু আর এই মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই রায় দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতে ভিন্নমত প্রকাশ করলে তার কতটা চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।





