প্রতিশোধ, ঘৃণা ও ভালোবাসার কোন গল্প বলে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন'?

Frankenstein : যে-কোনো প্রাণীর স্বভাবধর্ম হল খাদ্য অন্বেষণ এবং নিজের বীজবিস্তার। অর্থাৎ একটি সৃষ্টি চায় ওপর একটি সৃষ্টিকে রেখে যেতে।

Abhirup Mukhopadhyay
৩ মিনিট
প্রতিশোধ, ঘৃণা ও ভালোবাসার  কোন গল্প বলে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন'?

কয়েকটি নীরব প্রশ্ন জেগে উঠল শ্রাবন্তী ভট্টাচার্যের নির্দেশিত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নাটকটি দেখে। সকলেই হয়তো জানেন, মেরী শেলীর লেখা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন; অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’-এর কথা। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নিজের নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সৃষ্টি করেছিল এক প্রাণ-সম্পন্ন মানুষ। কিন্তু সেই নিজের সৃষ্টি মানুষের বীভৎস রূপ দেখে, ভয়ে, তাকে ফেলে রেখে চলে যায় ভিক্টর। নাটকটিতে, এই কাহিনিকেই অদ্ভুত এক জীবন্তরূপ দিয়েছেন পরিচালক!

সেই সদ্যোজাত মানুষ কিন্তু শারীরিকভাবে 'শিশু' নয়। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তাকে তৈরি করেছেন পূর্ণ যুবক হিসেবে। কিন্তু তার মন, শিশুর মতোই জিজ্ঞাসাপ্রবণ। আসলে 'শিশু' কথাটির সঙ্গে ‘বয়স’-এর সম্পর্কের থেকেও বোধহয় সরল জিজ্ঞাসার একটি সম্পর্ক রয়েছে। সম্পূর্ণ নাটকটিতে সেই সরল জিজ্ঞাসার অজস্র উদাহরণের সামনে আমাদেরকেও দাঁড় করান পরিচালক!

মেরী শেলীর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন; অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মার্ক্সের দর্শনে বাংলা পথনাটকের জন্ম দিয়েছিলেন তিনিই, বাঙালি ভুলেছে পানু পালকে

Panu Pal Street Play : কোনও কারণ উল্লেখ না করেই তাঁকে গণনাট্য থেকে বহিষ্কার করা হয়। উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস প্রত্যেকেই তখন গণনাট্য সংঘ ছেড়ে বেরিয়ে গেছিলেন।

মহাভারতের অজস্র কাহিনির মধ্যে একটি হল, শুকদেবের জন্মবৃত্তান্ত। শুকদেব জন্মেছিলেন পূর্ণ যুবকরূপে। তাঁর রূপ ছিল আলোকময় এবং খুবই আকর্ষণীয়। জন্মের পর, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন শুকদেব। পাশের জলাশয়ে স্নানরত রমণীরা তাঁকে দেখে সঙ্গে-সঙ্গে দেহে পোশাক ঢেকে নিলেন। শুকদেব সেদিকে খেয়ালই করলেন না। কারণ, শুকদেব তো একজন শিশুমাত্র। এইসব সামাজিক বৈধ-অবৈধ বোধ তাঁর মধ্যে নেই। কিন্তু জলাশয়ের রমণীদের মধ্যে সেই সামাজিকবোধ জাগ্রত হয়ে আছে। তাই তারা শুকদেবের মনকে নয়, তাঁর সুদর্শন শরীরকে দেখা মাত্র গায়ে কাপড় টেনে নিল। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কেমন, তার থেকেও বড়ো কথা আমি কী মনোভাব নিয়ে সে-ব্যক্তির দিকে তাকাচ্ছি— এই চিন্তার দিকে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন' নাটকটিও আমাদের নিয়ে যায়।

‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’ নাটকের অভিনেতারা

‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নাটকটিতে মানুষের হাতে তৈরি একজন মানুষের দিকে সমাজ তাকিয়েছে কেবল তার বহিরঙ্গরূপটুকুকেই নির্ভর করে। প্রশ্ন হল, ‘রূপের বীভৎসতা’ বলে কিছু হয়? হয় না। আমাদের দেখার দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সৌন্দর্যের সংজ্ঞাগুলিকেও! নাটকটিতে দেখা যায়, পোশাক-হারা, ভাষা-হারা, বোধ-হারা, সমাজ-জ্ঞান শূন্য, ক্ষুধার্ত, সংযোগ-স্থাপনে ইচ্ছুক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-সৃষ্ট মানুষটি বারংবার সমাজের বিভিন্ন মানুষের দ্বারা অত্যাচারিত হচ্ছে। কেউ-ই বুঝতে চাইছে না তাকে। কেবল তার রূপের বীভৎসতা প্রধান হয়ে উঠছে সবার কাছে।মানুষেরই হাতে তৈরি, অথচ সমাজ-বহির্ভূত ‘মানুষ’টির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়রাজ ভট্টাচার্য। চরিত্রটিকে তিনি যেভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তা অবিশ্বাস্য! তাঁর এই অভিনয় সামনে থেকে দেখা এক বিশেষ অভিজ্ঞতা! অতি সূক্ষ্ম বিষয়কে, নিবিড়ভাবে নিজের অভিনয়ের মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছেন জয়রাজ। নতুন মানুষটি যত সমাজের কাছে এসেছে, ভাষা শিখেছে, বুঝতে শিখেছে, পড়তে শিখেছে, তত নিজের অভিনয়ের ব্যক্তিত্বকে পালটে নিয়েছেন জয়রাজ। কিন্তু সেই পালটানোর পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে এক ধীর লয়, এবং চরিত্রটির প্রাথমিক ব্যক্তিত্বকে অটুট রেখেই তিনি অভিনয় করে গেছেন। তাঁর অভিনয়ক্ষমতা কত সুদূর এখান থেকে হয়তো বোঝা যায়! ‘আমার খিদে পায় কেন?’ ‘ভালোবাসা কী?'—সদ্যজাত মানুষটির এইসব প্রশ্নকে যেমন তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন, তেমনই সেই সদ্যজাত প্রাণীর নিজের সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে নিজের জন্মসূত্রের ভিত্তিভূমি সম্পর্কিত কথোপকথনকেও তিনি যুক্ত করেছেন এক আশ্চর্য ম্যাচিওরিটির বোধ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কালীর পায়ে ছুঁইয়ে মহড়া শুরু হতো গিরিশ ঘোষের নাটকের, কোথায় রয়েছে ‘উত্তর কলকাতার গিন্নী’?

Kolkata's siddheshwari kali temple : কেউ বলত ব্ল্যাক প্যাগোডা, কেউ আবার নাম দিয়েছিল ‘মিত্রের প্যাগোডা’, খোদ উত্তর কলকাতার সনাতনী বাসিন্দা সিদ্ধেশ্বরী কালী, জানেন কোথায়?

যে-কোনো প্রাণীর স্বভাবধর্ম হল খাদ্য অন্বেষণ এবং নিজের বীজবিস্তার। অর্থাৎ একটি সৃষ্টি চায় ওপর একটি সৃষ্টিকে রেখে যেতে। তাই, স্বাভাবিকভাবেই মানুষের হাতে তৈরি নতুন মানুষটিও চায় একজন নারী। সঙ্গিনী। চায় ভালোবাসতে। এ তো তার জন্মগত অধিকার। ভিক্টরকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে সে অনুরোধ করে, সে তাকে তার মতো একজন নারী তৈরি করে যদি দেয়, সে লোকালয় ছেড়ে দূরে চলে যাবে। বৈজ্ঞানিক সাহায্যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নতুন এক নারীর জন্ম দেয়। কিন্তু তারপর তাকে মেরেও ফেলে।

‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’ নাটকের টিকিট

এইখানে এক অপূর্ব নাট্যআবহ তৈরি করেছেন পরিচালক। কারণ, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সেই দানবমূর্তিরূপী মানুষটিকে তৈরি করলেও, তার মনের গঠন কিন্তু তার তৈরি নয়। নব্যসৃষ্ট নারীটিকে হত্যা করে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ওই দানবমূর্তিরূপী মানুষটিকে উপহার দিলেন মানুষের সবচেয়ে প্রখর রিপুগুলির মধ্যে একটি, প্রতিশোধ ইচ্ছা। নাটকের শেষার্ধে দেখা যায়, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিয়ের রাতে, তার সৃষ্ট মানুষটি, তারই হবু স্ত্রী-র সঙ্গে সংগমে লিপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করছে। এই পর্যায়ে, নাটকটিতে সকলের অভিনয় আশ্চর্যের শীর্ষবিন্দুকে স্পর্শ করতে চায়। তবে, শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মানবতা কী? তা প্রমাণ করে দেয় মানুষেরই হাতে তৈরি সত্যিকারের মানুষটি!

মঞ্চে জয়রাজ ভট্টাচার্য

সম্পূর্ণ নাটকটিতে যেভাবে স্ক্রিনের, সম্পূর্ণ হল-এর এবং আলো-কে ব্যবহার করা হয়েছে, তা অনবদ্য। এমন আন্তর্জাতিক মানের নাটক কলকাতার শহরে ক্রমাগত হয়ে চলেছে, এ-জন্য নাটকটির নির্দেশক, প্রযোজক ও নাটকটির সমস্ত অভিনেতাই সবিশেষ প্রশংসার যোগ্য!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।