ঠাকুরের ছবি আঁকা গোল তাস! হারিয়ে যাওয়া ‘গঞ্জিফা’কে যেভাবে ফিরিয়ে আনল এক রাজপরিবার

Sawantwadi Ganjifa: একসময় মুঘল রাজদরবারের বড় বড় সম্রাট থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিভিন্ন ছোট-বড় রাজপরিবারে এই খেলা ছিল আভিজাত্য আর বিনোদনের প্রধান অঙ্গ। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ঐতিহ্য যখন সস্তা, কলকারখানায় তৈরি চারকোণা তাসের ভিড়ে প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিল, তখন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসে মহারাষ্ট্রের এক রাজপরিবার। তাঁদের জেদ আর ভালবাসার উপর ভর করেই আজ শতাব্দীর প্রাচীন এই শিল্প আবার নতুন করে বেঁচে উঠেছে।

inscript
৭ মিনিট
ঠাকুরের ছবি আঁকা গোল তাস! হারিয়ে যাওয়া ‘গঞ্জিফা’কে যেভাবে ফিরিয়ে আনল এক রাজপরিবার

স্কুলের টিফিন টাইমে বা খেলার মাঠে বাচ্চাদের মধ্যে ‘পোকেমন’ কার্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি আমরা সবাই দেখেছি। একে অপরের সঙ্গে কার্ড অদলবদল করা, কার সংগ্রহে কত দামি কার্ড আছে তা নিয়ে গর্ব করার এই চেনা ছবির বয়স কিন্তু খুব বেশি নয়। এমনকী এখনও উনো নিয়ে যে রমরমা দেখা যায়, তা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, পোকেমন কার্ড, উনো বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের কার্ড গেমের এই উন্মাদনা শুরু হওয়ার বহু শতাব্দী আগে ভারতের নিজস্ব এক অদ্ভুত ও সুন্দর তাসের ডেক ছিল। হাতে রঙ করা, গোল গোল সেই তাসের নাম ছিল ‘গঞ্জিফা’।

একসময় মুঘল রাজদরবারের বড় বড় সম্রাট থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিভিন্ন ছোট-বড় রাজপরিবারে এই খেলা ছিল আভিজাত্য আর বিনোদনের প্রধান অঙ্গ। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ঐতিহ্য যখন সস্তা, কলকারখানায় তৈরি চারকোণা তাসের ভিড়ে প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিল, তখন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসে মহারাষ্ট্রের এক রাজপরিবার। তাঁদের জেদ আর ভালবাসার উপর ভর করেই আজ শতাব্দীর প্রাচীন এই শিল্প আবার নতুন করে বেঁচে উঠেছে।

‘গঞ্জিফা’ শব্দটির উৎস লুকিয়ে আছে ফারসি শব্দ ‘গঞ্জ’-এর মধ্যে, যার সহজ অর্থ হলো গুপ্তধন বা খজানা। ষোড়শ শতাব্দীতে এই খেলাটি পারস্য বা ইরান থেকে ভারতের মাটিতে এসে পৌঁছয়। ভারতে আসার পর মুঘল সম্রাট আকবর এবং শাহজাহানের মতো শাসকেরা এই খেলার এমন ভক্ত হয়ে ওঠেন যে, একে রাজপ্রাসাদের অন্যতম প্রিয় শখ বানিয়ে তোলেন।

সম্রাট আকবর কেবল খেলাই নয়, এই তাসের নিয়মেও বেশ কিছু বদল এনেছিলেন। ঐতিহাসিক দলিল ও ক্রনিকল ঘাঁটলে জানা যায়, তিনি ৯৬টি কার্ডের একটি নির্দিষ্ট মানক সংস্করণ বা সেট তৈরি করেছিলেন। এই সেটে মোট আটটি ভাগ (স্যুট) থাকত এবং প্রতিটি ভাগে ১২টি করে কার্ড থাকত। শুধু তাই নয়, নিজের সুবিশাল শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ ও ক্ষমতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি আরও বড় একটি তাসের সেটও নকশা করিয়েছিলেন।

আজকের দিনে আমরা যে চারকোণা তাস দেখতে অভ্যস্ত, গঞ্জিফা কিন্তু দেখতে তেমন ছিল না। এই তাসগুলি হতো সম্পূর্ণ গোল এবং এর প্রতিটি কার্ড শিল্পীরা নিজের হাতে নিখুঁতভাবে আঁকতেন। শুধু তাস বলাই ভুল হবে, এগুলি ছিল একেকটা ক্যানভাস। তাসের উপর আঁকা হতো পুরাণের নানা গল্প। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থান পেত ভগবান বিষ্ণুর ‘দশাবতার’-এর রূপ। এ ছাড়া রাজা, রথ, ঘোড়া, রাজদরবারের জাঁকজমকপূর্ণ জীবন এবং কিছু কিছু অঞ্চলের তাসে রাশিচক্রের চিহ্নও ফুটিয়ে তোলা হতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি মহুয়া আজ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড

Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।

ধীরে ধীরে এই খেলা যখন মুঘল দরবার ছেড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন স্থানীয় চিত্রশিল্পীরা একে নিজেদের সংস্কৃতির রঙে রাঙিয়ে নিলেন। যেমন—মহীশূরের গঞ্জিফা তাস ওয়াদিয়ার রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজস্ব এক সূক্ষ্ম ও স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছিল, যা আবার মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ উপকূলের শৈলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ওড়িশা বা রাজস্থানেও এর রূপ বদলে গিয়েছিল।

শুরুর দিকে যখন রাজা-বাদশাহদের জন্য এই তাস তৈরি হতো, তখন তার উপকরণও হতো বহুমূল্য। হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোল কিংবা চন্দন কাঠের পাতলা টুকরোর উপর সোনা, রুপো আর দামি মণি-মুক্তো খোদাই করে তৈরি হতো গঞ্জিফা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটল। আর বিংশ শতাব্দীতে যখন কলকারখানায় তৈরি সস্তা, চারকোণা প্লেইং-কার্ড বাজারে ছেয়ে গেল, তখন গঞ্জিফার মতো ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হাতের শিল্পের উপর বড় ধাক্কা এল। একে একে বন্ধ হয়ে গেল গঞ্জিফা তৈরির শতাব্দী প্রাচীন সব কর্মশালা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় নাগাদ, পেটের দায়ে বেশির ভাগ শিল্পী পরিবারই অন্য পেশার খোঁজে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন। ফলে একটি মাত্র ছোট শহর ছাড়া ভারতের বাকি সব মানচিত্র থেকেই গঞ্জিফা শিল্পটি প্রায় মুছেই গিয়েছিল।

তবে ব্যতিক্রমী শহরটির নাম হলো মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ জেলার ‘সাওয়ান্তওয়াড়ি’।

এই শহরের রাজপরিবার—‘সাওয়ান্ত ভোঁসলে’ পরিবার হঠাৎ খেয়াল করলেন, যে মাটি শত শত বছর ধরে গঞ্জিফাকে লালন-পালন করেছে, সেখান থেকেই এই শিল্পটি নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাজপরিবারের সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাজা বাহাদুর শিবরাম সাওয়ান্ত ভোঁসলে এবং তাঁর স্ত্রী রানি সত্যশীলাদেবী এক সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা বুঝলেন, এই শিল্পকে বাইরে থেকে বাঁচানো যাবে না, একে বাঁচাতে হলে নিজেদেরই এর অন্দরমহলে ঢুকতে হবে।

তাঁরা দুজনে মিলে খুঁজে বের করলেন পুণ্ডলিক চিতারি নামের এক কারিগরকে। পুণ্ডলিকবাবু তখন ৮০ বছর বয়সি এক প্রবীণ ওস্তাদ শিল্পী, যিনি তখনও এই শিল্পের শেষ প্রদীপটি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। এই রাজদম্পতি সেই প্রবীণ গুরুর কাছে শিষ্যের মতো বসে গঞ্জিফা তৈরির প্রতিটি ধাপ ও কৌশল নিজেরা শিখলেন। এরপর ১৯৭১ সালে এই শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং কারিগরদের নতুন করে রুজিরুটির ব্যবস্থা করতে তাঁরা গড়ে তুললেন ‘সাওয়ান্তওয়াড়ি ল্যাকারওয়্যার্স’।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৫০ বছরের পুরনো বাংলো, এখানেই সুস্থ হয়েছিলেন নেতাজি

Netaji Dalhousie Bungalow: নেতাজির ডালহৌসি জীবনের সেই দিনগুলি নিয়ে আজও অনেক রহস্যে মোড়া। কিন্তু একটা তথ্য একেবারে খাঁটি। পাহাড়ের এক কোণে লুকিয়ে থাকা প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এক বাংলোতেই সে সময় পা রেখেছিলেন তিনি। কালের নিয়মে সেই বাংলোর চেহারা বদলেছে, কিন্তু তার ভিতরের ইতিহাসটা হারিয়ে যায়নি।

রাজপ্রাসাদের যে বিশাল দরবার হলে একসময় বিচারসভা বসত বা রাজকীয় অনুষ্ঠান হতো, সেই দরবার হলটিই বদলে গেল একটি জীবন্ত স্টুডিওতে। গঞ্জিফা তৈরির ঐতিহ্যকে কাঁধে তুলে নিলেন স্থানীয় কারিগরেরা। বর্তমানে প্রায় ২০ জন কারিগর দিনরাত এক করে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখছেন, যার মধ্যে ১৩ জনই হলেন নারী। এই নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতেও এক বড় ইতিবাচক বদল এনেছে।

চিত্রঋণ: konkankatta.in

গঞ্জিফা তৈরি করা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়, এর জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য। তাসের বৃত্তাকার বেস তৈরি করা, তাতে খড়িমাটি বা বিশেষ লেপ দেওয়া, বর্ডার টানা, নিখুঁতভাবে দেবদেবীর চোখ-মুখ ফুটিয়ে তোলা এবং সবশেষে সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ল্যাকারের (গালা) চকচকে প্রলেপ দেওয়া—প্রতিটি কাজই করতে হয় হাত দিয়ে।

আজকের যুগে যেখানে কয়েক সেকেন্ডে হাজার হাজার তাস ছাপা হয়ে যায়, সেখানে সাওয়ান্তওয়াড়িতে মাত্র এক সেট গঞ্জিফা তাস তৈরি করতে পুরো এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়! এই ধৈর্যের পরীক্ষা সাওয়ান্তওয়াড়ির আরেকটি বিখ্যাত শিল্প—হাতে রঙ করা কাঠের খেলনা তৈরির মধ্যেও দেখা যায়।

ঐতিহ্যকে তো বাঁচানো গেল, কিন্তু তাকে আজকের প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় না করতে পারলে তা আবার হারিয়ে যাবে। এটা বুঝতে পেরেছিলেন যুবরানি শ্রদ্ধা লাখাম সাওয়ান্ত ভোঁসলে, যিনি ২০১৯ সালে এই রাজপরিবারে পুত্রবধূ হয়ে আসেন। তিনি গঞ্জিফাকে প্রাসাদের চার দেওয়াল থেকে বের করে নিয়ে এলেন আধুনিক দুনিয়ায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২২টি যুদ্ধে অপরাজিত থাকার পর এক তীরেই শেষ! কে ছিলেন সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য?

Hem Chandra Vikramaditya: আনুমানিক ১৫০১ সালে রাজস্থানের আলোয়ারের এক অতি সাধারণ পরিবারে হেমুর জন্ম। ছোটবেলা কেটেছিল হাটে-বাজারে সবজি আর নুন-শোরা বিক্রি করে। এই ব্যবসার সূত্রেই খুব কম বয়সে সেনাবাহিনীর রসদ ও লজিস্টিকসের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।

শ্রদ্ধা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের দরজায় পৌঁছে দিলেন। পাশাপাশি রিলায়েন্সের ‘স্বদেশ’-এর মতো বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রদর্শনী ও বিপণনের ব্যবস্থা করলেন। ফলে যে নতুন প্রজন্ম গঞ্জিফার নামও জানত না, তারা অবাক হয়ে এই শিল্পের প্রেমে পড়ল।

চিত্রঋণ: mint

এখানেই শেষ নয়, যুবরানি শ্রদ্ধা এবং তাঁর স্বামী যুবরাজ লাখাম সাওয়ান্ত ভোঁসলে মিলে সাওয়ান্তওয়াড়ি প্রাসাদের একটি অংশকে গঞ্জিফা থিমের একটি অভিনব ‘বুটিক হোটেল’-এ রূপান্তরিত করেছেন। এই হোটেলের দরজার নব, আয়নার ফ্রেম থেকে শুরু করে সব আসবাবপত্রই গঞ্জিফা শৈলীতে হাতে রঙ করা। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, হোটেলের ঘরগুলির কোনো চেনা রুম নম্বর নেই; প্রতিটি স্যুটের নামকরণ করা হয়েছে ভগবান বিষ্ণুর এক একটি অবতারের নামে!

তবে এই শিল্পকে আইনিভাবে সুরক্ষিত করাটাও একটা বড় লড়াই ছিল। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান বা মহীশূরের গঞ্জিফা থেকে যে সাওয়ান্তওয়াড়ির গঞ্জিফা রূপ ও শৈলীতে সম্পূর্ণ আলাদা, তা প্রমাণ করতে রাজপরিবার ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (GI) ট্যাগের জন্য আবেদন করে।

দীর্ঘ দেড় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আইনি নথিপত্র পেশ করার পর, অবশেষে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সাওয়ান্তওয়াড়ির গঞ্জিফা ভারতে এই শিল্পের জন্য প্রথম ‘জিআই ট্যাগ’ অর্জন করে। এর ফলে এই রাজপরিবার ও স্থানীয় কারিগরেরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের শিল্পের উপর এক আইনি মালিকানা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। কোঙ্কণ অঞ্চলেরই পদ্মশ্রীজয়ী ‘চিত্রকাঠি’ শিল্পের পুনরুত্থানের মতোই, গঞ্জিফাও দেশের অন্যতম সেরা পুনরুজ্জীবিত আঞ্চলিক শিল্প হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নেয়।

চিত্রঋণ: konkankatta.in

২০২৫ সালে গঞ্জিফার এই সাফল্যের মুকুটে জুড়ল আরও একটি নতুন পালক। ভারতের ডাকবিভাগ সাওয়ান্তওয়াড়ির কারিগরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশে প্রথমবার গোল আকৃতির পোস্টকার্ড চালু করে। এই পোস্টকার্ডগুলির নকশা সরাসরি গঞ্জিফার ‘দশাবতার’ মোটিফ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। এর ফলে যে শিল্প একসময় কেবল রাজদরবারের মখমলের ফরাশে বন্দি ছিল, তা আজ সাধারণ মানুষের হাত ধরে দেশের কোটি কোটি ডাকবাক্স আর ডাকঘরের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে এই শিল্পে কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে। তাসগুলি যাতে সহজে নষ্ট না হয়, জল বা ঘামে রঙ চটে না যায় এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানোর সময় ভালো থাকে—সেজন্য কারিগরেরা এখন কিছু কিছু প্রাকৃতিক খনিজ রঙের বদলে টেকসই ও স্থায়ী পোস্টার কালার ব্যবহার করছেন। তবে রঙের ধরন পাল্টালেও এর মূল আত্মাটা কিন্তু একই আছে। সেই হাতে স্কেচ করা, ছবির মাধ্যমে পুরাণের গল্প বলা আর নিখুঁত ল্যাকারিংয়ের পদ্ধতি আজও ঠিক আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

যেমনটা দেখা যাচ্ছে পুরো সিন্ধুদুর্গ জেলা জুড়েই। সেখানকার মানুষ নিজেদের আদি সংস্কৃতিকে বিসর্জন না দিয়ে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হোমস্টে এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন (ইকো-ট্যুরিজম) গড়ে তুলছেন, যা প্রাচীন সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি উপার্জনের নতুন পথ দেখাচ্ছে।

গঞ্জিফার এই বেঁচে ওঠার গল্প আমাদের একটা মস্ত বড় শিক্ষা দেয়। কোনো দেশের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নিজে নিজে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের নিয়মে তা একদিন ফিকে হতে বাধ্য। ঐতিহ্য তখনই বেঁচে থাকে, যখন কোনো মানুষ বা সমাজ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে, ভালবেসে এবং সচেতনভাবে তাকে আগলে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সাওয়ান্তওয়াড়ির রাজপরিবার আর তাঁদের কারিগরেরা ঠিক সেই কাজটিই করে দেখিয়েছেন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।

কর্নওয়ালিস স্ট্রিট থেকে বিধান সরণি, ধর্মতলা থেকে লেনিন সরণি: যেভাবে ক্ষমতাসীনরা বদলেছে কলকাতার রাস্তার নাম

Renaming politics of kolkata's street: লটারি কমিটির কর্নওয়ালিস স্ট্রিট নির্মাণ থেকে বামফ্রন্টের লেনিন সরণি, হো চি মিন সরণি—কলকাতার রাস্তার নামকরণ প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ছিল। ২০২৬ সালে, বিজেপি সরকারের উৎসাহে দশ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে লেনিন, কার্ল মার্কস ও হো চি মিন সরণির নাম বদলের সুপারিশ করতে। কিন্তু নাম বদলালেই কি মানুষের স্মৃতি বদলায়?

মাছে-ভাতে বাঙালি, দুর্গাপুজোর ভোগেও আমিষের চল, কী বলছে শোভাবাজার রাজবাড়ির ২৭০ বছরের ইতিহাস?

Durga Puja non vegetarian food: পুজোর দিনগুলিতে সকালে রাজবাড়ির সদস্যরা উপোস করে অঞ্জলি দেন এবং পুজোর কাজে অংশ নেন। দিনের সেই সময়ে তাঁরা নিরামিষ খাবারই গ্রহণ করেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর আমিষ খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে। অর্থাৎ পুজোর প্রত্যেক দিনই পরিবারের সদস্যরা মাছ-মাংস খান।

বাংলা কবিতায় যুক্তি ও আবেগের সেতু গড়েছিলেন বিনয় মজুমদার

Binoy Majumdar: বিনয় মজুমদারের কাব্যভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল প্রচলিত ‘কবিত্ব’-এর থেকে সচেতন দূরত্ব। তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা অনেক সময় কবিতার পরিবর্তে কোনো বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত নোট, গাণিতিক অনুমান অথবা যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের মতো মনে হয়।

স্বাধীনতার আগেই নেতাজি যেভাবে এঁকেছিলেন আধুনিক ভারতের অর্থনীতির নকশা

Subhas Chandra Bose economic vision: “কদম কদম বঢ়ায়ে যা, খুশি কে গীত গায়ে যা…” যখনই এই গান বেজে ওঠে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি। খাকি উর্দি, চোখে গোল চশমা আর হাতে উদ্যত তরবারি। কিন্তু এই সৈনিক রূপের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন এক অসামান্য অর্থনৈতিক দূরদর্শী—যিনি কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর স্বপ্ন দেখেননি, দেশ স্বাধীন হলে তার কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ কীভাবে দু’মুঠো ভাত পাবে, সেই হিসেবও কষেছিলেন নিখুঁত অঙ্কে।