ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ: কাল থেকে কালান্তরে অভিযাত্রা

Gautam Roy
৭ মিনিট
ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ: কাল থেকে কালান্তরে অভিযাত্রা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁর নিজের করা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের একটি কাব্যগ্রন্থের অনুবাদের পান্ডুলিপি তুলে দিয়েছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। সেই পরিকল্পিত কবিতা সংকলনের নাম রণেশ দাশগুপ্ত রেখেছিলেন 'বিদীর্ণ হৃদয়'। পাণ্ডুলিপিটি ভালো ভাবে পড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পান্ডুলিপিটির আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি।

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ এমন একজন কবি ছিলেন, যাঁকে কখনো কোনো দেশ বা ভাষা এমনকী সময়ের প্রেক্ষিতে আটকে রাখতে পারা যায় না। কাঁটাতার শব্দটি ছিল ফয়েজের সৃষ্টির প্রেক্ষিতে সবথেকে অদ্ভুতুড়ে একটি শব্দ। কাঁটাতারের বাঁধাকে ফয়েজ কোনদিনও তাঁর চিন্তা চেতনার পরিব্যাপ্তি ঘটার ক্ষেত্রে পাত্তাই দেননি। যেমন তিনি কখনো পরোয়া করেননি , নিজেকে আবদ্ধ দেখতে বা দেখাতে।আবদ্ধ মানসিকতা, তেমনটা কখনো ভাবতে পারতেন না ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ।তাঁর সৃষ্টির সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, কাল থেকে কালান্তরের পথে যাত্রা করে, সেই সৃষ্টিকে একটা কালোত্তীর্ণ মাত্রায় পৌঁছে দেওয়া।

এই বিষয়টিকে মানুষের জীবনে যেভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি সেই জীবন সত্যের মশালটি, দেশকাল, সমাজ সবকিছুর বাধাকে অতিক্রম করে আজও মানবসভ্যতাকে আলো জোগাচ্ছে। বাস্তব জীবনে দেশভাগের পর ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মত মানুষ, একটি বিশেষ দেশের বাসিন্দা হয়ে গেলেন।কিন্তু পাকিস্তানের বাসিন্দা হয়েও কখনোই দেশের গণ্ডীর মধ্যে তিনি নিজের সৃষ্টিকে, নিজের চিন্তাকে, নিজের চেতনার পরিমণ্ডলকে আবদ্ধ রাখলেন না। নিজের সৃষ্টিকে কাল থেকে কালান্তরের পথে যাত্রা ,এমন মানুষকে ঘিরে বাংলা তথা বাঙালির মধ্যে খুব একটা আলাপ-আলোচনা দেখতে পাওয়া যায় না। অমিতাভ দাশগুপ্ত অসামান্য অনুবাদ করেছিলেন ফয়েজের কিছু কবিতার। সেই অনুবাদটি এখন দুর্লভ। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু চর্চা হয়েছে বাংলাদেশে, কিন্তু ফয়েজকে ঘিরে একটা সামগ্রিক চর্চা ,এপার বাংলায় প্রায় হয়নিই বলা যেতে পারে।

ফয়েজের জন্মদিন নীরবে নিঃশব্দে কেটে গেল (১৩ ই ফেব্রুয়ারী)। কবিতা প্রেমিক বাঙালির কাছে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের জন্মদিন, আজকের এই দিনটি সেভাবে চর্চার জন্য উঠে এলো না। বাংলাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে চর্চা হয়েছে আজ তাঁকে ঘিরে ।পশ্চিম পাকিস্তানের ভয়াবহ শোষণ অত্যাচার থেকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের যে দুঃখ ভোগ এবং তা থেকে উত্তরণ সেক্ষেত্রেও ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গফফর খান তাঁর পুত্র ডঃ ওয়ালি খানের মতো বাঙালির মুক্ত চিন্তা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ইত্যাদি প্রশ্নে নিরন্তর সাহস যুগিয়েছেন বাঙালিকে। উৎসাহ দিয়েছে বাঙালিকে।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের উচ্চারণের ভেতরে আমরা যেমন বেদনাকে খুঁজে পাই, আবার তেমনি আমরা খুঁজে পাই সেই বেদনা থেকে উত্তরণের শক্তি। সেই বেদনাকে জয় করবার মতো মানসিক বল। কেবলমাত্র দুঃখবিলাসী কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ছিলেন না ।কিভাবে সেই দুঃখকে আত্মশক্তির দ্বারা অতিক্রম করে একটা সুন্দর লাল টুকটুকে দিনা আনতে পারা যায়, সেদিকে কিন্তু সমস্ত সৃষ্টির লক্ষ্য কে তিনি নিবদ্ধ করেছিলেন। তাই আমরা যেন ফয়েজের প্রতিটি লেখার ভেতরেই নতুন করে আবিষ্কার করি, কাল থেকে কালোত্তরে মানুষের যে দুঃখ, যন্ত্রণা, লড়াই, হতাশা -- এই সমস্ত রকমের বিষয়গুলিকে। আর সেই বিষয় গুলির মধ্যে থেকে উঠে আসে অনির্বচনীয় আনন্দ। দিন-রাতের যে ভয়ঙ্কর তিক্ত অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা আজও আমাদের চিন্তা-চেতনা জগতকে পরিব্যাপ্ত করবে। সেই পরিব্যাপ্তি আমাদের মানসিক শান্তি নষ্ট করবে। আর সেখান থেকেই আমরা আরো নিত্যনতুন শোষণের যান্ত্রিক কৌশলের শিকার হবো --এই যে কথাগুলি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বলেছিলেন, তা যে কোন দেশের মানুষ শুনলেই মনে করবে ,এটা তাঁর দেশের কোনো মানুষের বলা কথা।

অখণ্ড ভারতে জন্ম হওয়া মানুষটি পরবর্তীকালে পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে তিনি যে পাকিস্তানের অত্যাচারিত মানুষদের কথাই কেবলমাত্র বলছেন, তা কিন্তু নয়। সামগ্রিক ভাবে মানব জাতির পক্ষে যা ইতিবাচক, যা মঙ্গল কর ,সেই কল্যাণময় মন্ত্রই ফয়েজের সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে বারবার উচ্চারিত হয়েছে ।তাই যখন আমরা শুনি ফয়েজের কলম থেকে উৎসারিত দিন-রাত্রির বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করা হৃদয়গ্রাহী আনন্দের উৎসে নিঃসরণ, তখন আমাদের চিন্তা চেতনার জগতে এক নির্বাচনী অশান্তি বিরাজ করে। তিনি বলছেন; তিক্ততা মেনে নিলাম। এই নির্যাতনও। কিন্তু আমার শরীরে প্রাণ যদি থাকে, তাহলে এই দুনিয়ার দুঃখের প্রতিবিধান করব আমি।

এই উক্তি যখন আমরা শুনি ফয়েজের কণ্ঠে তখন কি একটিবারের জন্য মনে হয়, এই পাকিস্তানেরই শাসক আমাদের এই দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য কী নিরন্তর ষড়যন্ত্র করে চলেছে। আমাদের তখন মনে হয়, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ যে দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় রয়েছেন, সে দেশের মাটি, সে দেশের মানুষও আমার কত আপন। আমার কত নিজের।

আসলে বিপন্নতার এক আত্মনিবেদিত আত্মীয়তা নির্মাণ, এটাই ছিল কিন্তু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সৃষ্টির সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য ।তাই যেখানেই মানুষ বিপন্ন, যেখানেই মানবতা বিপন্ন ,যেখানেই রাজনীতি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকী ধর্ম বিপন্ন, সেখানেই তাঁর সৃষ্টি অত্যন্ত বেশি রকমের সক্রিয় ।প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বেড়াজালে কিন্তু বিচার করা যায় না এই ধর্মকে। সেই ধর্মের কথাই ফয়েজ বলেছেন, যে ধর্মের কথা শঙ্খ ঘোষ বলেছেন। শূন্যতাকে ভরিয়ে দেওয়া। তাঁর গোটা জীবন ধরে শূন্যতাকে ভরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন নিজের অসামান্য সৃষ্টির মাধ্যমে।

বিশ্ববিশ্রুত বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ ছিলেন ফয়েজের একনিষ্ঠ ভক্ত। সাঈদ বলেছিলেন ; ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতা একদিকে বুদ্ধিজীবীদের মনের খিদে মেটাবার ,অপরদিকে আনন্দ দেয় অতি সাধারণ মানুষ ,যে মানুষগুলোর সঙ্গে বুদ্ধিকে জীবিকা করে পেট চালানোর কোনো সংযোগ নেই।তাই এডওয়ার্ড সাঈদ বারবার, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার বিশুদ্ধ তাগিদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বাংলায় বিশুদ্ধতম কবি হিসেবে একাংশের কাব্য রসিকেরা জীবনানন্দের কথা বলে থাকেন। ঠিক তেমনটাই কবিতার জগতের এক বিশুদ্ধতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের নাম করতে পারা যায়।

এডওয়ার্ড সাঈদ ,ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতাকে একদিকে পাবলো নেরুদার তেজস্ক্রিয়তার মিলনভূমি বলে উল্লেখ করেছিলেন। আবার মনোমুগ্ধকর শীতলবসন্তের হাওয়ার অপূর্ব সম্মেলন কবিতাও তিনি ফয়েজের কবিতাকে বলেছিলেন। যারা সেইসব কবিতা গুলি পড়েছেন সেটা তারা উপলব্ধি করতে পারবেন জীবনকে কেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ গ্রহণ করেছিলেন এক বসন্তের মায়াবী দৃষ্টিতে।

ফয়েজের যে মানবমুক্তির অঙ্গীকার, সেটা কিন্তু কখনো কোনো অবস্থাতেই শিল্পবোধ বিবর্জিত, নিছক প্রোপাগান্ডা ছিল না। জীবনকে শিল্প আর লড়াই এভাবে দেখেছিলেন ফয়েজ। আজ কেবলমাত্র উর্দু ভাষা জানা মানুষদের কাছে নয় ,পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছে নয় ,গোটা বিশ্বের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ,তাঁদের কাছে একটা যেন চরম নির্দেশিকা ফয়েজ উচ্চারণ করেছিলেন, মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই কে সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করে, সেই মুক্তির সংগ্রামে শামিল হওয়ার আন্তরিক প্রয়াস তাঁর মধ্যে একটা জ্ঞান পূর্ণ প্রয়াস হয়ে ফুটে উঠেছিল।এটা ফয়েজের কাছে কেবল জীবনের দাবি নয়। শিল্পের ও দাবি। শিল্প ছিল ফয়েজের কাছে জীবনেরই একটা অংশ। জীবনেরই একটা শাখা। তাই শিল্প সাধনাকে তিনি মনে করতেন ,সংগ্রামেরই একটা বাহন।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সৃষ্টিতে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধে লড়াই ছিল জীবনের মতো এক চরম সত্য ।কাব্যসাধনায় ধ্রুপদীয়ানা আনতে গিয়ে তিনি পশ্চিমের আধুনিকতাকে যেমন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মর্যাদা দিয়েছিলেন, তেমনি প্রাচ্যের স্বপ্নকেও একটিবারের জন্য অস্বীকার করেননি ।এই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনা স্বপ্নের মিলন, তার ভেতর থেকে মানুষের লড়াইয়ের শক্তি সংগ্রহ করা-- এটাই যেন ছিল ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সৃষ্টির এক অনির্বচনীয় আনন্দ।

সৃষ্টির ভেতর দিয়ে শোষিত নিপীড়িত মেহনতী মানুষের জগৎ ,সেই জগতের বেদনা ,সংকল্প তার একটি অগ্নিশিখায় যেন বারবার জ্বলে উঠতে আমরা দেখি ফয়েজকে।তাই পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের কবিকণ্ঠ কে মিলিয়ে দিয়ে, তিনি যেন মহাকবি ইকবালের মতই সৃষ্টিজগতকে এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভরে দিয়ে গিয়েছেন।

অবিভক্ত ভারতের শিয়ালকোটে ১৯১১ সালেল ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের জন্ম। তাঁর বাবা সুলতান মোহাম্মদ খান। মা ফাতেমা সুলতান। মৌলবী ইব্রাহিম মীরের মক্তবে তাঁর শিক্ষার সূচনা। তারপর স্কচ মিশন স্কুল। শিয়ালকোট ম্যারি কলেজ ,লাহোর সরকারি কলেজ, ওরিয়েন্টাল কলেজ-- এইসব তাঁর শিক্ষা। তুখোর উর্দু ভাষা জানতেন। তাঁর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ছিল অসামান্য।আরবি ও জানতেন সমান তালে। মাত্র ১৯বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন ব্রিটিশ তরুণী এলিসকে।কর্মজীবন শুরু করেছিলেন অমৃতসর এম এ ও কলেজের ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে ১৯৩৫ সালে। পরে চলে গেলেন লাহোর হ্যালি কলেজে। ১৯৪২ সালে শুরু করলেন সৈনিকের জীবন।

ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আর্মির অত্যন্ত উঁচু পদে তিনি থেকেছেন। আবার দেশভাগের সময়কালেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ছেড়ে শুরু করলেন সাংবাদিকতা ।হলেন পাকিস্তান টাইমসের প্রধান সম্পাদক। ১৯৫৯ সালে হলেন পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের সম্পাদক। ১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে চলে এলেন করাচিতে ।আব্দুল্লাহ হারুন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে শুরু করলেন নতুন কর্মজীবন।ভারত পাক যুদ্ধের সময়('৬৫) তিনি ছিলেন পাকিস্তানের তথ্য অধিদপ্তরে।

এই যে নানা ধরনের পেশা পরিবর্তন, এর ভেতর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারা যায় যে পেশাজীবনে স্থিরতা জিনিসটা কিন্তু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ছিল না। পাকিস্তানের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর, ফিল্মকেই তিনি লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে বসেই ,সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে করলেন চলচ্চিত্র ,গান। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার দেরি লাগলো না পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের উপর পশ্চিমের অত্যাচার ঘিরে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের তৈরি শিল্প গুলিকে নিষিদ্ধ করতে ।কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকারের যে সমস্ত ফিল্ম নিষিদ্ধ করেছিল, সেগুলি মস্কোতে চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কৃত হল। ফয়েজের তৈরি ফিল্মের জনপ্রিয়তা কোন জায়গায় আজও রয়েছে, তা বুঝতে পারা যায়, যখন প্যারিসে ২০০৭ সালের চলচ্চিত্র উৎসবের ফয়েজের তৈরি সেই সময়ের ফিল্মগুলো প্রদর্শিত হয়, তা দেখে।

দেশভাগের আগে ১৯৩৬ সালে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ যোগ দিয়েছিলেন লেখক সঙ্ঘে। হয়েছিলেন পাঞ্জাবের সাধারণ সম্পাদক। পাকিস্তানের ১৯৫৮ সালে আফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হল তাঁর ।আর এই প্রতিবাদী লড়াকু সত্তার জন্যই পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে বেশ কয়েক বছর। ১৯৫১ সালে কবিতার জন্য তিনি অভিযুক্ত হলেন রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ।এই রাতের খাপে ঢাকা ভোর -- এই কবিতার জন্য ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তাঁকে পাকিস্তানের জেলে কাটাতে হয়।

১৯৫৮ সালে জঙ্গি শাসক আইয়ুব খান তাঁকে আবার জেলে পাঠায়। ১৯৭৭ সালে সবসময়ের পুলিশ নজরদারির আওতায় তাঁকে আবার রাখা হয় ।১৯৮৪ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল তাঁর নেম।সেই মনোনয়নের তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর বন্ধু ইয়াসের আরাফাতের অনুরোধে ।১৯৬২ সালে লেনিন শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী যখন গোটা বাংলাদেশ জুড়ে নরহত্যা চালাচ্ছে ,সেই সময় কালে পশ্চিম পাকিস্তানে বসে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ লিখেছিলেন ; 'আমার শরীর থেকে দূরে থাক' কবিতাটি। বলেছিলেন;" তবে কিভাবে সাজাবো গণহত্যার শোভাযাত্রা /আমার রক্তের চিৎকারে আকর্ষণ করব কাকে? এই সময় 'বাংলাদেশে দুই ' নামে তাঁর কবিতায় ফয়েজ বলেছিলেন ; " প্রতিটি গাছ রক্তের মিনারের মতো/ প্রতিটি ফুল ও রক্তমাখা/ প্রতিটি চাহনি যেন রক্তের বর্শার তীর।' জেনারেল জিয়াউল হকের সময় ,' হাম দেখেঙ্গে ' বলে ফয়েজের যে অসামান্য সৃষ্টি, তা আজও আমাদের শাসকের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক বিশিষ্ট হাতিয়ার ।ফয়েজ এই কবিতায় বলেছেন; " একদিন তোদের আমরা দেখে নেবো/ তোদের আমরা অবশ্যই দেখে নেব /এটা ঘটবেই ,আমাদের তা দেখতেই হবে ।আমরা দেখব .... /যেদিন জুলুম আর বেইনসাফের হিমালয় /তুলোর মতো ফরফর করে উড়ে যাবে তুফানে/ মজলুমের পায়ের তলায়/ ধরিত্রী কাঁপবে থর থর থর থর থর থর /আর ক্ষমতা আমাদের মাথার উপর / বিজলী ও বিদ্যুৎ চমকায় কর কর কর কর/ আওয়াজ হবে /আমরা সেদিন তোদের দেখে নেব আমরা সেদিন তোদের দেখে নেবো।"

১৯৮৪ সালের ১০ ই নভেম্বর লাহোরে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের জীবনাবসান ঘটে।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।