ইট-সিমেন্ট নয়, গাছ দিয়েই তৈরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবন্ত দেওয়াল
Great Green Wall: চড়া রোদে তপ্ত হয়ে ওঠা ধূসর মরুভূমির বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি গাছপালা, সবুজ ঘাস আর সতেজ জলাভূমি। প্রকৃতির আপন খেয়ালে তৈরি এই জীবন্ত মহাপ্রাচীরের নাম ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ মহাপ্রাচীর। আফ্রিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ সেনেগালের আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূল থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের জিবুতি পর্যন্ত প্রায় আট হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে মরুভূমিকে রুখে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য লড়াই।
কয়েকজন শ্রমিক মিলে কষ্ট করে ইট, বালি, সিমেন্ট দিয়ে ধীরে ধীরে গাঁথতে গাঁথতেই তো দেওয়াল তৈরি করে। কিন্তু, কল্পনা করুন এমন একটা দেওয়ালের কথা, যা কোনো ইট, বালি বা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি নয় বরং গাছ দিয়ে তৈরি, ভাবতে একটু অবাক লাগে বৈকি!
চড়া রোদে তপ্ত হয়ে ওঠা ধূসর মরুভূমির বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি গাছপালা, সবুজ ঘাস আর সতেজ জলাভূমি। প্রকৃতির আপন খেয়ালে তৈরি এই জীবন্ত মহাপ্রাচীরের নাম ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ মহাপ্রাচীর। আফ্রিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ সেনেগালের আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূল থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের জিবুতি পর্যন্ত প্রায় আট হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে মরুভূমিকে রুখে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য লড়াই। সাহারা মরুভূমির ঠিক দক্ষিণ ঘেঁষে থাকা আধা-শুষ্ক অঞ্চল ‘সাহেল’-কে বাঁচাতেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্ম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Eco Bloc RR Sivaram: আমরা সচরাচর যে সমস্ত কংক্রিটের ড্রেন দেখি, ইকো ব্লক কিন্তু তার চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি তৈরি হয় মূলত ফেলে দেওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে। ফলে পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যাও এতে কমে।
২০০৭ সালে যখন আফ্রিকার একদল মানুষ এই প্রকল্পের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, তখন ভাবা হয়েছিল একনাগাড়ে একটা সোজা গাছের দেওয়াল তৈরি করা হবে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম তো আর মানুষের বাঁধা ছকে চলে না। বিজ্ঞানীরা দ্রুতই বুঝলেন, জোর করে লাইনে গাছ বসিয়ে মরুভূমি থামানো যায় না। কারণ একেক এলাকার মাটির চরিত্র একেক রকম, কোথাও জলের টান বেশি তো কোথাও আবহাওয়া ভীষণ রুক্ষ। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দেওয়ালের রূপ বদলে গেল। এটি আর পাঁচটা সাধারণ গাছ লাগানোর কর্মসূচি হয়ে রইল না; বরং হয়ে উঠল হারিয়ে যাওয়া জঙ্গল, ঘাসজমি আর শুকিয়ে যাওয়া জলাভূমিকে তার চেনা ছন্দে ফিরিয়ে দেওয়ার এক সামাজিক আন্দোলন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bermuda Island: নদী নেই, কোনো মিষ্টি জলের হ্রদ নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক ঝরনাও। চারপাশ শুধু থৈ থৈ করছে সমুদ্রের নোনা জল। এমন একটা জায়গায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকছে মানুষ। আজব মনে হলেও, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এক ছোট্ট দ্বীপ ‘বারমুডা’ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। কোনো কেন্দ্রীয় পাইপলাইন বা বিশাল সরকারি জলাধারের উপর ভরসা না করে, এখানকার প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব এক পদ্ধতিতে নিজেদের খাওয়ার জলের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন।
এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনটা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। গত কয়েক দশক ধরে সাহেল অঞ্চলের মানুষকে চরম খরা আর খামখেয়ালি বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে। এখানকার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কাটে চাষবাস আর পশুপালন করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় জমি যখন তার উর্বরতা হারিয়ে ধূলিকণায় পরিণত হতে শুরু করল, তখন তাঁদের রুজি-রুটিতে টান পড়ল। সেই বিপদের দিনে আশার আলো জ্বেলেছে এই সবুজ প্রাচীর। মাটির গভীরে জল ধরে রাখা, মাটির ক্ষয় বন্ধ করা এবং অনুর্বর জমিকে আবার ফসল ফলানোর উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে এই প্রকল্প স্থানীয় মানুষদের নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।
আফ্রিকার ২০টিরও বেশি দেশ এখন এই সবুজ যুদ্ধে শামিল হয়েছে। বিগত বছরগুলিতে প্রায় তিন কোটি হেক্টর জমিকে আবার সতেজ করে তোলা সম্ভব হয়েছে, যা সত্যিই এক মস্ত বড় সাফল্য। এই লড়াইয়ে একেকটি দেশ একেক রকম গল্প তৈরি করেছে। যেমন ইথিওপিয়ার কথা বলা যায়। তারা এই প্রকল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। সেখানে কোটি কোটি চারাগাছ লাগিয়ে মাইলের পর মাইল ধূসর জমিকে আবার সবুজ চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নাইজার আর বুর্কিনা ফাসোর কৃষকেরা কোনো আধুনিক প্রযুক্তির ভরসায় বসে না থেকে সম্পূর্ণ নিজেদের সনাতন বুদ্ধি কাজে লাগিয়েছেন। প্রাকৃতিকভাবে যেটুকু চারাগাছ গজিয়ে উঠছিল, সেগুলিকে সযত্নে আগলে রেখে তারা মাটিকে উর্বর করে তুলেছেন। শুষ্ক মরশুমে জল ধরে রাখার জন্য তারা মাটিতে ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখছেন, যা মাটির নীচের জলের স্তরকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে। আবার সেনেগালের কৃষকেরা এমন সব গাছ বেছে নিয়েছেন যা চরম খরাতেও মরে যায় না, অথচ যেখান থেকে ফল বা দামি আঠা পাওয়া যায়। এতে প্রকৃতির যেমন ভালো হচ্ছে, তেমনই মানুষের ঘরেও দু-পয়সা আসছে।
তবে এই রূপকথার পথটা কিন্তু পুরোপুরি মসৃণ নয়, এতে জড়িয়ে আছে অনেক কঠিন বাস্তবতাও। আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে বড় বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও, বাস্তবে সেই ফান্ডের একটা বড় অংশই সময়মতো এসে পৌঁছয় না। তার উপর রয়েছে আফ্রিকার কিছু অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সমস্যা, যার কারণে অনেক ভালো কাজ মাঝপথে থমকে যায়। কোথাও আবার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ আর জলের অভাবে লাগানো গাছের একটা বড় অংশ মারা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এক পরিসংখ্যান দিয়ে বলছেন যে, বর্তমান গতিতে চললে ২০৩০ সালের মধ্যে যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, তা ছোঁয়া হয়তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সব বাধা, বিতর্ক আর খামখেয়ালিপনাকে পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ পৃথিবীর ইতিহাসে পরিবেশ বাঁচানোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সাহসী পদক্ষেপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবেশ রক্ষা করার মানে শুধু কিছু চারাগাছ মাটিতে পুঁতে দেওয়া নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তিকে ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। আফ্রিকার এই সবুজ দেওয়াল যদি আগামী দিনে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারে, তবে তা গোটা পৃথিবীর কাছে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের এক অনন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।






