এক প্রযুক্তিতেই বন্যা ও খরা, দুই সমস্যার সমাধান! ভারতের 'ইকো ব্লক' মডেল
Eco Bloc RR Sivaram: আমরা সচরাচর যে সমস্ত কংক্রিটের ড্রেন দেখি, ইকো ব্লক কিন্তু তার চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি তৈরি হয় মূলত ফেলে দেওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে। ফলে পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যাও এতে কমে।
তীব্র গরম আর জলকষ্ট থেকে বাঁচতে আমরা শুধু বলতে থাকি, "উফ! বর্ষা যে কবে নামবে?" কিন্তু বর্ষার আগমন হলেই, বাড়ি থেকে বেরোতেই ইচ্ছে করে না। বাড়ির বাইরে পা দিলেই তো হাঁটু-জল পেরোতে হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি থমকে দাঁড়িয়ে থাকবে। তারপর, কখনও রক্সময় গন্তব্যে পৌছনো যাবে। অথচ চরম পরিহাস এটাই যে, একদিকে যখন লক্ষ লক্ষ লিটার মূল্যবান বৃষ্টির জল নোংরা ড্রেন দিয়ে স্রেফ নষ্ট হয়ে বয়ে চলে যায়, অন্যদিকে তার ঠিক কয়েক মাস পরেই সেই শহরগুলিতেই আবার পানীয় জলের তীব্র হাহাকার শুরু হয়।
কিন্তু কেমন হতো, যদি আমাদের প্রতিদিনের চলার এই রাস্তাগুলিই একাধারে বন্যা এবং জলসঙ্কট—দুটো বড় সমস্যারই সমাধান করে দিতে পারত?
শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও, এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন কোয়িম্বাটুরের এক পরিবেশপ্রেমী উদ্যোক্তা আর. আর. সিভারাম (RR Sivaram)। তাঁর তৈরি ‘ইকো ব্লক’ (Eco Bloc) প্রযুক্তি আজ ভারতের শহুরে জল ব্যবস্থাপনায় এক বিরাট বিপ্লব নিয়ে এসেছে।
এক অভিনব ভাবনা: চেন্নাইয়ের বন্যা ও খরা থেকে শিক্ষা
এই আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে এক দূরদর্শী গল্প। ২০১৫ সালে চেন্নাইয়ের সেই বিধ্বংসী বন্যা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। ঠিক তার চার বছর পর, ২০১৯ সালে সেই চেন্নাই শহরই সাক্ষী থাকল এক মারাত্মক খরার। জলের জন্য হাহাকার পড়ে গিয়েছিল চারিদিকে।
এই দুটি চরম বিপর্যয় খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন আর. আর. সিভারাম। তিনি ভাবলেন, বৃষ্টির জলকে স্রেফ অপচয় হতে না দিয়ে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাটির নিচে জমিয়ে রাখা যায়, তবে একই সঙ্গে বন্যাও আটকানো সম্ভব, আবার খরার সময়ে জলের অভাবও মেটানো সম্ভব। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল তাঁর কোম্পানি ‘স্টোন হ্যান্ডস প্রজেক্ট অ্যান্ড কনসালটেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং তাদের হাত ধরে এল ‘ইকো ব্লক’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bermuda Island: নদী নেই, কোনো মিষ্টি জলের হ্রদ নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক ঝরনাও। চারপাশ শুধু থৈ থৈ করছে সমুদ্রের নোনা জল। এমন একটা জায়গায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকছে মানুষ। আজব মনে হলেও, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এক ছোট্ট দ্বীপ ‘বারমুডা’ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। কোনো কেন্দ্রীয় পাইপলাইন বা বিশাল সরকারি জলাধারের উপর ভরসা না করে, এখানকার প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব এক পদ্ধতিতে নিজেদের খাওয়ার জলের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন।
কংক্রিটের ড্রেন নয়, এ যেন মাটির নিচের ‘স্পঞ্জ’
আমরা সচরাচর যে সমস্ত কংক্রিটের ড্রেন দেখি, ইকো ব্লক কিন্তু তার চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি তৈরি হয় মূলত ফেলে দেওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে। ফলে পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যাও এতে কমে।
এর কাজের পদ্ধতিটি বেশ চমৎকার এবং বিজ্ঞানসম্মত:
মৌচাকের মতো দেখতে: এই ড্রেনগুলির ভিতরের অংশটি দেখতে অনেকটা মৌচাকের মতো। এই বিশেষ গঠনের কারণে এটি রাস্তা থেকে প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃষ্টির জল নিমেষের মধ্যে শুষে নিতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
East Kolkata Wetlands: আমাদের শরীরে কিডনি ঠিক যেরকম ভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে রক্ত থেকে সব নোংরা আর বর্জ্য ছেঁকে বের করে দেয়, সেরকম ভাবেই কলকাতার ক্ষেত্রে এই কাজটি করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। তাই পরিবেশবিদরা একে ভালবেসে ডাকেন ‘কলকাতার প্রাকৃতিক কিডনি’।
ধাপে ধাপে ছাঁকা: প্রতি ১৫ মিটার পরপরই এতে জল ধরে রাখার বিশেষ ব্যবস্থা আছে। রাস্তা থেকে নোংরা জল ড্রেনে ঢোকার পর সেটি চার স্তরের একটি আধুনিক ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে কাদা, বালি ও অন্যান্য আবর্জনা পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যায়।
মাটির নিচের অদৃশ্য ব্যাংক: ফিল্টার হওয়া এই পরিষ্কার জলটি জমা হয় রাস্তা কিংবা পার্কের নিচে তৈরি করা বিশেষ মডুলার ট্যাংকে। উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে নিচে জলের এত বড় ভাণ্ডার রয়েছে।
ট্যাংকগুলির শক্তি ও স্থায়িত্ব কতখানি?
অনেকের মনে হতে পারে, রাস্তার নিচে প্লাস্টিকের ট্যাংক বসালে তা ভারী গাড়ির চাপে ভেঙে যাবে না তো? সিভারাম ও তাঁর দল এই ট্যাংকগুলি এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যা ৬০ টন পর্যন্ত ওজন অনায়াসে সহ্য করতে পারে। অর্থাৎ, উপর দিয়ে লরি বা বাস চলে গেলেও এর কোনো ক্ষতি হবে না। এই ট্যাংকগুলির আয়ু ৫০ বছরেরও বেশি এবং প্রয়োজনে এগুলিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়েও নিয়ে যাওয়া যায়।
ইকো ব্লকের কার্যকারিতা প্রথম প্রমাণিত হয় ২০২০ সালে, চেন্নাইয়ে এর প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবহারের মাধ্যমে। সেখানে একটি মন্দিরের দিঘি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সম্পূর্ণ শুকনো ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার পর, মাত্র এক বছরের মধ্যে সেই দিঘি আবার কানায় কানায় জলে ভরে ওঠে।
এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কোয়িম্বাটুরের বিখ্যাত ‘রেস কোর্স রোড’-এ মাত্র ৯০০ মিটারের একটি ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি করে প্রায় ১ লক্ষ লিটার জল সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। চেন্নাই কর্পোরেশন এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের (NDMA) যৌথ উদ্যোগে এখন বিভিন্ন পার্ক, খেলার মাঠ ও স্কুলে এই ব্যবস্থা দ্রুত বসানো হচ্ছে। খেলার মাঠের উপরটা যেমন ছিল তেমনই থাকছে, আর তার নিচেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে ৫ লক্ষ লিটার ধারণক্ষমতার একেকটি বিশাল জলের ট্যাংক!
শহরগুলির জন্য কেন এটি সেরা বিকল্প?
ঐতিহ্যবাহী কংক্রিটের স্টর্মওয়াটার ড্রেনের তুলনায় ইকো ব্লক ভারতের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর মূল কারণগুলি হলো, প্রচলিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার তুলনায় ইকো ব্লক তৈরি ও ইনস্টল করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ খরচ কম হয়। এটি বসাতে খুব বেশি শ্রমিক লাগে না এবং খুব কম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো শহরগুলিকে একটি ‘স্পঞ্জের’ মতো গড়ে তোলা। বৃষ্টি হলেই শহর সেই জল শুষে নেবে, যার ফলে মাটির নিচের জলের স্তর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
বর্তমানে এই দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটি ভারতের বিভিন্ন শহরের প্রায় ৫,০০০-এরও বেশি জায়গায় সফলভাবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) লিটারেরও বেশি বৃষ্টির জল মাটির নিচে জমিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রতি বছর এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ টন কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো যাচ্ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমে আজ আর. আর. সিভারামের এই ‘ইকো ব্লক’ মডেল প্রশংসিত হচ্ছে। ভারতের শহরগুলি যখন আরও একটি বর্ষার মুখোমুখি হতে চলেছে, তখন এই প্রযুক্তি আমাদের মনে আশা জাগায়। এটি প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা আর আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগালে প্রকৃতির দেওয়া বৃষ্টি আমাদের কাছে আর জলমগ্ন রাস্তার অভিশাপ হয়ে থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার আসল চাবিকাঠি।






