চারদিকে সমুদ্রের নোনাজল, বৃষ্টির জলে ভর করেই ৪০০ বছর ধরে ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস!
Bermuda Island: নদী নেই, কোনো মিষ্টি জলের হ্রদ নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক ঝরনাও। চারপাশ শুধু থৈ থৈ করছে সমুদ্রের নোনা জল। এমন একটা জায়গায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকছে মানুষ। আজব মনে হলেও, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এক ছোট্ট দ্বীপ ‘বারমুডা’ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। কোনো কেন্দ্রীয় পাইপলাইন বা বিশাল সরকারি জলাধারের উপর ভরসা না করে, এখানকার প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব এক পদ্ধতিতে নিজেদের খাওয়ার জলের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন।
১৬০৯ সাল। ‘সী ভেঞ্চার’ (Sea Venture) নামে একটি ইংরেজ জাহাজ বারমুডার এক পাথুরে শৈলশিরায় ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। এরপর ১৬১২ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে মানুষজন বসবাস করতে শুরু করে।
নতুন বাসিন্দারা দ্বীপে পা দিয়েই এক চরম বিপদে পড়লেন। ইংল্যান্ডের মতো সবুজ মাঠ বা মিষ্টি জলের নদী-নালা এখানে কিচ্ছু নেই। দ্বীপের মাটি তৈরি হয়েছে মূলত এক প্রাচীন আগ্নেয়গিরির উপর জমে থাকা ঝাঁঝরা চুনাপাথর দিয়ে। ফলে যখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, সেই জল মাটিতে জমে থাকার সুযোগই পায় না; তড়িৎ গতিতে পাথরের ছিদ্রে চুইয়ে নিচে চলে যায় এবং সমুদ্রের নোনা জলের সঙ্গে মিশে একবারে নষ্ট হয়ে যায়।
শুরুতে বাসিন্দারা পাম পাতা দিয়ে ছাদ বানিয়ে কোনোমতে জল জমানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আটলান্টিকের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আর হারিকেনের দাপটে সেই ছাদ খড়কুটোর মতো উড়ে যেত। টিকে থাকার এই কঠিন লড়াই থেকেই জন্ম নিল এক অসাধারণ প্রকৌশলগত উদ্ভাবন— ‘বারমুডিয়ান স্টেপড রুফ’ বা খাঁজকাটা ছাদ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
East Kolkata Wetlands: আমাদের শরীরে কিডনি ঠিক যেরকম ভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে রক্ত থেকে সব নোংরা আর বর্জ্য ছেঁকে বের করে দেয়, সেরকম ভাবেই কলকাতার ক্ষেত্রে এই কাজটি করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। তাই পরিবেশবিদরা একে ভালবেসে ডাকেন ‘কলকাতার প্রাকৃতিক কিডনি’।
বারমুডার আকাশ থেকে যদি আপনি নিচের দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন প্রতিটি বাড়ির মাথায় ধবধবে সাদা, সিঁড়ির মতো খাঁজকাটা ছাদ। এই ছাদগুলি শুধু সৌন্দর্যের জন্য তৈরি নয়, এর পিছনে রয়েছে নিখুঁত বিজ্ঞান।
স্থানীয় খনি থেকে কেটে আনা চুনাপাথরের স্লেট একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে এই সিঁড়ির মতো ধাপগুলি তৈরি করা হয়। যখনই বৃষ্টি হয়, এই ধাপগুলি জলের গতিকে কমিয়ে দেয়। ফলে জল ছাদ থেকে ছিটকে বাইরে পড়ে যায় না।
ছাদের চারপাশটা একটু উঁচু চওড়া পাড়ের মতো করা থাকে, যাকে বলে ‘গাটার’ বা ড্রেন। ছাদ বেয়ে নেমে এসে জল এই ড্রেনে এসে জমা হয়। এরপর পাইপের মধ্য দিয়ে সেই জল সোজা চলে যায় বাড়ির নিচে তৈরি করা একটি বিশাল কংক্রিটের ট্যাংকে (যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘cistern’ বলা হয়)। এই ট্যাংকগুলি সাধারণত ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ গ্যালন জল ধরে রাখতে পারে।
দূর থেকে এই ছাদগুলিকে বরফের মতো সাদা দেখায়। ঐতিহ্যগতভাবে এই ছাদে চুনকাম করা হতো, যা প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করত। এখন আধুনিক ও নিরাপদ সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। এই সাদা রঙের দুটি মস্ত বড় সুবিধা রয়েছে— প্রথমত, এটি সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে প্রতিফলিত করে জলকে পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ রাখে। দ্বিতীয়ত, উপক্রান্তীয় অঞ্চলের তীব্র গরমেও ঘরকে চমৎকার ঠান্ডা রাখে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Rain: তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
বারমুডায় নিজের বাড়ি মানেই আপনি নিজেই নিজের জলের জোগানদার। এখানে জল বাঁচানো কোনো উপদেশ নয়, একেবারে কড়া সরকারি আইন। ১৯৫১ সালে এখানে একটি জনস্বাস্থ্য আইন করা হয়। সেই নিয়ম অনুযায়ী, বারমুডায় কোনো নতুন বাড়ি বানাতে গেলে তার ছাদের অন্তত ৮০% অংশ জল সংগ্রহের উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। শুধু তাই নয়, ছাদের প্রতি বর্গফুট আয়তন মেপে মাটির নিচে নির্দিষ্ট আকারের জলের ট্যাংক বানানো বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, বারমুডার এই ছাদগুলি এতটাই কার্যকরী যে বড় ধরনের বৃষ্টি হলে প্রায় ৮৫% জলই ট্যাংকে গিয়ে জমা হয়। তবে এই ব্যবস্থার কিছু নিজস্ব চ্যালেঞ্জও আছে: ছাদে যাতে পাখির বিষ্ঠা, মরা পাতা বা ধুলোবালি না জমে, সেজন্য নিয়মিত ছাদ পরিষ্কার করতে হয়। প্রতি ২-৪ বছর পর পর ছাদে সাদা রঙের প্রলেপ দিতে হয়। আইন অনুযায়ী, প্রতি ৬ বছরে অন্তত একবার মাটির নিচের ট্যাংক খালি করে ট্যাংকের তলা পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক।
বৃষ্টি যদি একটানা বেশ কিছুদিন না হয়, তবে ৪ জনের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ট্যাংকের জল ফুরিয়ে আসে। তখন চড়া দামে বাইরে থেকে ওয়াটার ট্যাঙ্কার ট্রাক ডেকে জল কিনতে হয়।
আজকাল জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ছাদের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই চাহিদা মেটাতে এখন দ্বীপটিতে ৬টি আধুনিক ‘ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট’ বা নোনা জল মিষ্টি করার কারখানা তৈরি করা হয়েছে। বড় বড় বাণিজ্যিক ভবন আর পর্যটকদের হোটেলগুলি মূলত এই কারখানার জলের উপরই নির্ভর করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘরের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ জলের চাহিদা আজও মেটায় সেই আদিম রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম।
বারমুডার মানুষেরা শৈশব থেকেই জল জমানোর এক অদ্ভুত সুন্দর সংস্কৃতি বুকে নিয়ে বড় হয়। সেখানে এক কাপ জল দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা বা সবজি ধোয়া জল গাছের গোড়ায় দেওয়ার মতো অভ্যাসগুলি একদম মজ্জাগত। হারিকেন আসার আভাস পেলেই এখানকার মানুষ টেনিস বল আর মোজা দিয়ে ছাদের পাইপের মুখ বন্ধ করে দেয়, যাতে সমুদ্রের নোনা বাতাস বা নোংরা জল ভিতরের বিশুদ্ধ জলের ট্যাংকে ঢুকতে না পারে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন গোটা পৃথিবী জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন আর তীব্র জল সংকটের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে, তখন বারমুডার এই ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য আমাদের এক মস্ত বড় শিক্ষা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং স্থানীয় ভূপ্রকৃতিকে ভালোবেসে, সঠিক দূরদর্শিতা আর স্থাপত্যের মেলবন্ধনে কীভাবে এক একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। বারমুডার এই সাদা ছাদগুলো তাই আজ কেবল কোনো স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং মানুষের টিকে থাকার এক অদম্য ও জয়ী লড়াইয়ের প্রতীক।






