হিন্দুভোটের দখলদার কে?

একসময় মনে করা হতো, বিজেপিই বুঝি এই ভোটব্যাঙ্কের আসল মালিক। কিন্তু সিএসডিএস-লোকনীতির কারোর একাধিপত্য নয়। বরং এটি এখন গভীর ও জটিল এক সমীকরণে বিভক্ত।

inscript
৬ মিনিট
হিন্দুভোটের দখলদার কে?

একদিকে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" আর অন্যদিকে "মোদি এলে মাছ-ভাত খাওয়া ঘুচে যাবে"— এই দুয়ের মাঝে বাঙালি হিন্দুরা পড়েছে মহাবিপদে। আর তার চেয়েও বেশি বিপদে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গবাসীর রাজনৈতিক বিশ্লেষক সত্তা, যারা সকালে চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে দুপুরের সেলুনের আড্ডা এবং সন্ধ্যার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় অনুমান করতে ব্যস্ত থাকে— কোন দল কত আসনে জিতবে? কত ব্যবধানে জিতবে? কোন কেন্দ্রে কে জিতবে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, তাঁরা পড়েছেন মহা বিপদে। কিছুতেই বুঝতে পারেন না কে জিতবে? হিন্দু ভোটের দখলদার কে?

একসময় মনে করা হতো, বিজেপিই বুঝি এই ভোটব্যাঙ্কের আসল মালিক। কিন্তু সিএসডিএস-লোকনীতির পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে হিন্দু ভোটে একাধিপত্য এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এটি এখন গভীর ও জটিল এক সমীকরণে বিভক্ত।

​বাংলার জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই হিন্দু। অন্য দিকে মুসলিম ভোটার প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। গত কয়েকটি নির্বাচনের তথ্য বলছে, মুসলিম ভোটের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৭০-৭৫%) নিরঙ্কুশভাবে তৃণমূলের দিকে থেকেছে। এই পরিস্থিতিতে জয়ের পাল্লা ভারী করতে হিন্দু ভোটব্যাঙ্কই হয়ে উঠেছে আসল তুরুপের তাস। যে দল এই বড় অংশের মন জিততে পারবে, নবান্নের চাবিকাঠি তার হাতেই থাকবে।

সিডিএস-লোকনীতি সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৯ থেকে শুরু করে প্রতিটি বড় নির্বাচনে মুসলিম ভোটের ৭০–৭৫% প্রায় নির্দিষ্টভাবে তৃণমূলের পক্ষে থেকে যায়। ফলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু ভোটের উপর—কে হিন্দু ভোটের কতটা অংশ নিজের দিকে রাখতে পারবে, আর কে কতটা টানতে পারবে।

​২০১৯ লোকসভা: এই সময় এক অভূতপূর্ব জাতীয় মেরুকরণ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা দেখেছিল বাংলা। হিন্দু ভোটের প্রায় ৫৭ শতাংশ একচ্ছত্রভাবে গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। তৃণমূল প্রায় ৩৬–৩৮%, বাম/কংগ্রেস প্রায় ৮–১১%।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শাস্ত্র বলে নিরামিষাশী হতে?

ঋগ্বেদে আমরা যজ্ঞকেন্দ্রিক এক সমাজের ছবি পাই। সেখানে ঘি, দুধ ও সোমরসের পাশাপাশি পশুবলির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বহু ঋগ্বৈদিক যজ্ঞে পশুবলি ছিল একটি স্বীকৃত আচার। অর্থাৎ, আমাদের প্রাচীনতম বেদেই আমিষ আহারকে ‘অধর্ম’ বলে বাতিল করা হয়নি। বরং তৎকালীন জীবনব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সেই সময়ের খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। ঋগ্বেদে (১.১৬২ সূক্ত) যজ্ঞে পশুবলির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রায় ৫৭%, ওবিসি (OBC)-র প্রায় ৬৫% এবং তফসিলি জাতির (SC) অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬১% ভোটার ভোট দেয় বিজেপিকে। অর্থাৎ এই তিনটি গোষ্ঠীতেই বিজেপির সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ফলে প্রায় প্রতিটি হিন্দু জাতিগোষ্ঠীই ২০১৯‑এ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। এই তরঙ্গের জোরে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন পায়, মোট ভোট শতাংশ হয় প্রায় ৪০%। এই সময়ে বিজেপি হিন্দু ভোটের আসল দখলদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

​২০২১ ও ২০২৪: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপির হিন্দু ভোট কমে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। আর ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৫-৫০ শতাংশে। অন্য দিকে, তৃণমূল ক্রমে হিন্দু ভোটের দখল বাড়াতে শুরু করে (৩২% থেকে বেড়ে ৩৯% এবং ২০২৪-এ প্রায় ৪০-৪৫%)।

বাম/কংগ্রেস ও বিকল্প দলগুলি এই তিন নির্বাচনেই প্রায় ৮–১১% হিন্দু ভোট পেয়েছিল।

​বিজেপি এবং তৃণমূল— দুই দলেরই কৌশল কিন্তু পুরোপুরি আলাদা।

​বিজেপি মূলত ধর্মীয় মেরুকরণ এবং উগ্র প্রচারের উপর ভরসা করে। তাদের দাবি, তারাই হিন্দুদের আসল রক্ষাকর্তা। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী এবং দক্ষিণবঙ্গের মতুয়া বা নমঃশূদ্রদের মতো প্রান্তিক হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিজেপির প্রভাব এখনও যথেষ্ট।

​তৃণমূল এই মেরুকরণকে আটকাতে ‘বাঙালি আবেগ’, 'স্থানীয় পরিচিতি' এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছে, ধর্মের চেয়েও মানুষের পেটের টান আর আঞ্চলিক পরিচয় বেশি জরুরি।

​তথ্য বলছে, হিন্দু ভোট আসলে জাতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানে বিভক্ত। প্রায় ৫৮% ​উচ্চবর্ণ এখনও বিজেপির প্রতি বেশি অনুগত।

​তৃণমূলের তুরুপের তাস হলো বাংলার মহিলা ভোটাররা। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের কল্যাণে হিন্দু মহিলাদের একটি বড় অংশ এখন ঘাসফুল শিবিরের দিকে ঝুঁকেছে। গ্রামীণ এলাকাগুলিতে এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে তৃণমূল জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করেছে। ওবিসি এবং তফসিলি জাতিগুলির মধ্যে ২০১৯-এ বিজেপির যে দাপট ছিল, বর্তমানে তৃণমূল সেখানে বেশ খানিকটা ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে।

​তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৪-এ যে ২৯টি আসন পেয়েছে, তার হিসেবটা খুব সহজ। মুসলিম ভোটের সিংহভাগ (৭০-৭৩%) তো তাদের পাশে ছিলই, তার সঙ্গে হিন্দু ভোটের প্রায় ৪২-৪৫ শতাংশ যুক্ত হওয়ায় এমন এক ‘দুর্গ’ তৈরি হয়েছে যা ভাঙা বিজেপির পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু মহিলাদের সমর্থন প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তৃণমূলের জন্য জয়কে সহজ করে দিয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো বলে, ২০১৯‑এ বিজেপি হিন্দু ভোটে এক লাফে এগিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু পরের দুটি নির্বাচনে তৃণমূল হিন্দু ভোটের বড় অংশ পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে হিন্দু ভোটের উপর বিজেপির আগের মতো আর একচেটিয়া দখল নেই; তৃণমূলও এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাগ দখল করে বসে রয়েছে। তার মানে হিন্দু ভোটের দখলদার কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর হবে—একক দল নয়, বরং বিজেপি আর তৃণমূল দুই দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদিকে বিজেপি যেমন হিন্দু ধর্মের আবেগ এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্য দিকে তৃণমূল কংগ্রেস ‘বাঙালি পরিচিতি’ এবং ‘সরকারি সুবিধা’ দিয়ে সেই ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় থাবা বসাচ্ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।

এসআইআর: মূল টার্গেট ছিল বাংলা?

SIR West Bengal controversy: এসআইআরের নামে বাংলার নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কতটা সুপরিকল্পিত? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল কারচুপি ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

শ্রমিক বিক্ষোভের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা?

Garment Workers' Protest in Bangladesh: বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, আন্দোলনের পিছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু শ্রমিকদের অসন্তোষের নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাকি মূল্যবৃদ্ধি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার ক্ষোভ? সরকারের দাবির পক্ষে কতটা প্রমাণ রয়েছে?

সকালে জমা বিকেলে খরচ: আইনের শাসনের অবমাননা

Gaighata incident: গাইঘাটার ঘটনার পরমুহূর্তে শাসক দলের মন্ত্রী, নেতাদের প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার করে দেয়, বন্দি অভিযুক্তকে হত্যার ঘটনা সরকারি নীতির ('সকালে জমা, বিকালে খরচ')—নগ্ন প্রয়োগ।

৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত, মোদীর দাবির আড়ালে কোন পরিসংখ্যানগত বিতর্ক?

World Bank's claim about India's poverty decline: বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩-এ ভারতের চরম দারিদ্র্য ২৭.১% থেকে ২.৬%-এ নেমেছে বলে দাবি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক প্রচারের কাজেও লাগাচ্ছেন। কিন্তু, পরিসংখ্যানের আড়ালে আসল সত্য কি? কি বলছেন অর্থনীতিবিদরা?

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ১৫০-র বেশি কারখানা বন্ধ, কী বলছে বাংলাদেশ সরকার?

Bangladesh garment workers protest: মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ১৫০-র বেশি কারখানা বন্ধ, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি নিয়ে কী বলছে বাংলাদেশ সরকার?

কেন পঞ্জাবে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে আপের?

Major Setback for AAP in Punjab: ২০২২ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পঞ্জাবে ক্ষমতায় এসেছিল আম আদমি পার্টি। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যেই দলের অন্দরে বিদ্রোহ, বিধায়কদের দলত্যাগ, মাদক সমস্যা, দুর্নীতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৭-এর নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখা কি কঠিন হয়ে উঠছে আপের?