কলকাতায় তাঁর নামে রয়েছে রাস্তা, 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদের আড়ালে আসলে কে?
শুদ্ধ বাংলা বলা এবং বাংলার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এই প্রবাদগুলো এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা অসংখ্য গল্প আমরা ভুলতে বসেছি। প্রবাদ এবং তাদের সঙ্গে জড়িত গল্পগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে।

বাংলা ভাষার একটা খুব মজার অংশ হলো প্রবাদ। বাংলা ভাষার বহু প্রবাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের নাম, যাদের ব্যাপারে বর্তমানে খুব বেশি মানুষ জানেন না। শুদ্ধ বাংলা বলা এবং বাংলার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এই প্রবাদগুলো এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা অসংখ্য গল্প আমরা ভুলতে বসেছি। প্রবাদ এবং তাদের সঙ্গে জড়িত গল্পগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে।
একদা বাংলা ভাষার একটা জনপ্রিয় প্রবাদ ছিল হরি ঘোষের গোয়াল। হরি ঘোষের জন্ম হয়েছিল ১৭২০ সালে। তিনি মুঙ্গেরের দেওয়ান ছিলেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি এবং ফার্সি ভাষায় তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। দেওয়ান থাকাকালীন তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে তিনি বহু আত্মীয়দের সঙ্গে বসবাস করতেন। কলকাতার বাইরে থেকে পড়াশুনা করতে আসা ছাত্র, চাকরির খোঁজে আসা বিভিন্ন মানুষকে তিনি নিজের বাড়িতে বিনামূল্যে থাকতে দিতেন। তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় প্রতিদিন বহু মানুষ গল্প করতে আসতেন। কথিত আছে যে, গল্প করতে আসা সকলেই তাঁর বাড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে বাড়ি ফিরত। প্রায় সারাদিন বহু মানুষের সমাগম হতো বলেই, মানুষের ভিড়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদটা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও হরি ঘোষের শেষ জীবনের গল্প খুব একটা জানা যায় না কিন্তু জনশ্রুতি রয়েছে যে, বিভিন্ন মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়ে তিনি অর্থকষ্ট ভোগ করেছিলেন। সেই প্রতারণার ফলে হওয়া লোকসান থেকে মুক্ত হতে গিয়ে তাঁর সম্পত্তি বাঁধা পড়েছিল। শেষ জীবনে সম্ভবত তিনি কাশী যাত্রা করেছিলেন। উত্তর কলকাতার হরি ঘোষ স্ট্রিট সেই হরি ঘোষের গল্প বলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজানা ইতিহাসের গল্প। সেই ইতিহাস আমাদের কলকাতা এবং তার বিচিত্র রূপকে দেখতে সাহায্য করে।
বাংলা ভাষায় একদা বিখ্যাত কিন্তু বর্তমানে বিস্মৃত প্রবাদের তালিকা দীর্ঘ। 'বনমালী সরকারের বাড়ি, গোবিন্দরাম মিত্রের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, হুজুরিমলের কড়ি', কে না জানে? প্রবাদ শুনলেই বোঝা যায় যে, এই চারজন যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। তাই তাঁদের সম্পর্কে জানাটা স্বাভাবিক। প্রবাদটা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ার সময় সাধারণ মানুষ এই চার জনের সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলেও এখন বহু মানুষ এই চারজনের মধ্যে হয়তো একজনের নামও জানেন না।
বনমালী সরকার পাটনার প্রথম দেওয়ান হয়েছিলেন। দেওয়ানি এবং ব্যবসা করে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। সেই উপার্জিত অর্থের কিছুটা ব্যয় করে তিনি এক বিশাল বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। সম্ভবত ১৭৪০-১৭৫০ সাল নাগাদ উত্তর কলকাতার কুমারটুলি এলাকায় বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। বাড়ির আকার, স্থাপত্যশৈলির কথা ক্রমে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত সেই বাড়ির বর্ণনা দিতেই প্রবাদের প্রথম অংশের জন্ম হয়। উত্তর কলকাতার বনমালী সরকার স্ট্রিট এই বাড়ির গল্পের সাক্ষী হিসাবে রয়েছে।
গোবিন্দরাম মিত্র কলকাতার প্রথম 'কালো জমিদার' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। প্রভাবশালী ব্রিটিশদের এই কালো জমিদার মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কিছু নৃশংস উপায় বের করেছিলেন। কথিত আছে,গোবিন্দরাম মিত্রর নির্দেশে এক আসামীর শাস্তিস্বরূপ তাঁকে কারাগারে বন্দি করে লাঠি এবং লোহার শিকল দিয়ে প্রহার করা হয়। এই প্রহারের পর আসামীকে রাস্তায় বেঁধে রেখে গোবিন্দরাম রাস্তায় উপস্থিত পথচারীদের আসামীর মাথায় লাথি মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা পর্যন্ত এই জমিদারকে সামলে চলত। হলওয়েল গোবিন্দরামের বিরুদ্ধে চাকরিক্ষেত্রে অসৎ উপায় অবলম্বন করার অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু শেষ অবধি গোবিন্দরামের শাস্তি হয়নি। ধনী এবং প্রভাবশালী এই জমিদারের কঠোর মানসিকতা বোঝাতেই প্রবাদের দ্বিতীয় অংশ লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।
উমিচাঁদ সম্ভবত নুন এবং অফিমের ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার মাধ্যমে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন।তিনি ব্রিটিশ এবং মুর্শিদাবাদের নবাব- উভয়ের ঘনিষ্ট ছিলেন। দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরুদ্ধে চক্রান্তে তিনি যুক্ত ছিলেন। পলাশির যুদ্ধের পর তিনি নবাবের উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির পাঁচ শতাংশ দাবি করেছিলেন, যার মূল্য সেই সময় প্রায় চল্লিশ কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। রবার্ট ক্লাইভ তাঁর সঙ্গে ছল করে প্রথমে রাজি হয়ে, পরে তাকে দিয়ে চুক্তির কাগজে সই করিয়ে নিয়েছিলেন, যে চুক্তিতে উমিচাঁদের কোনও অংশ প্রাপ্য ছিল না। এই ছলচাতুরির খেলায় শেষ পর্যন্ত উমিচাঁদ ইংরেজদের সাহায্য করার পরিবর্তে একটা টাকাও পান নি। উমিচাঁদের দাড়ির বাহার সম্ভবত প্রবাদের তৃতীয় অংশের জন্ম দিয়েছে, যদিও এই ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
হুজুরিমল সম্ভবত উমিচাঁদের বন্ধু ছিলেন। হুজুরিমল পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ব্যবসা করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেছিলেন। সেই টাকার কিছু অংশ তিনি জনসাধারণের জন্যও ব্যয় করেছিলেন। বৈঠকখানা এলাকায় একটা পুকুর খনন, স্নান করার জন্য গঙ্গার ঘাট বাঁধানোর মতো বহু কাজ করার কারণে তিনি মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। হুজুরিমলের জীবনযাত্রার কারণে তাঁর ব্যবসা এবং সেই ব্যবসা থেকে লাভ বিষয়ে বিভিন্ন গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরত। হুজুরিমলের বিস্তর টাকার কথা যে সবাই জানে, সেকথা বোঝাতে প্রবাদটা ধীরে ধীরে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলা ভাষার প্রবাদ এবং বাংলার ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় খুঁজলে বাংলার মানুষ হয়তো আরও অনেক অজানা গল্প খুঁজে পাবে।








