কলকাতায় তাঁর নামে রয়েছে রাস্তা, 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদের আড়ালে আসলে কে?

শুদ্ধ বাংলা বলা এবং বাংলার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এই প্রবাদগুলো এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা অসংখ্য গল্প আমরা ভুলতে বসেছি। প্রবাদ এবং তাদের সঙ্গে জড়িত গল্পগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কলকাতায় তাঁর নামে রয়েছে রাস্তা, 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদের আড়ালে আসলে কে?

বাংলা ভাষার একটা খুব মজার অংশ হলো প্রবাদ। বাংলা ভাষার বহু প্রবাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের নাম, যাদের ব্যাপারে বর্তমানে খুব বেশি মানুষ জানেন না। শুদ্ধ বাংলা বলা এবং বাংলার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এই প্রবাদগুলো এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা অসংখ্য গল্প আমরা ভুলতে বসেছি। প্রবাদ এবং তাদের সঙ্গে জড়িত গল্পগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে।

একদা বাংলা ভাষার একটা জনপ্রিয় প্রবাদ ছিল হরি ঘোষের গোয়াল। হরি ঘোষের জন্ম হয়েছিল ১৭২০ সালে। তিনি মুঙ্গেরের দেওয়ান ছিলেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি এবং ফার্সি ভাষায় তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। দেওয়ান থাকাকালীন তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে তিনি বহু আত্মীয়দের সঙ্গে বসবাস করতেন। কলকাতার বাইরে থেকে পড়াশুনা করতে আসা ছাত্র, চাকরির খোঁজে আসা বিভিন্ন মানুষকে তিনি নিজের বাড়িতে বিনামূল্যে থাকতে দিতেন। তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় প্রতিদিন বহু মানুষ গল্প করতে আসতেন। কথিত আছে যে, গল্প করতে আসা সকলেই তাঁর বাড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে বাড়ি ফিরত। প্রায় সারাদিন বহু মানুষের সমাগম হতো বলেই, মানুষের ভিড়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদটা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও হরি ঘোষের শেষ জীবনের গল্প খুব একটা জানা যায় না কিন্তু জনশ্রুতি রয়েছে যে, বিভিন্ন মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়ে তিনি অর্থকষ্ট ভোগ করেছিলেন। সেই প্রতারণার ফলে হওয়া লোকসান থেকে মুক্ত হতে গিয়ে তাঁর সম্পত্তি বাঁধা পড়েছিল। শেষ জীবনে সম্ভবত তিনি কাশী যাত্রা করেছিলেন। উত্তর কলকাতার হরি ঘোষ স্ট্রিট সেই হরি ঘোষের গল্প বলে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নামেই লুকিয়ে ইতিহাস! মিরজাফরের প্রাসাদ থেকে বেনিয়া সাহেব, হিসেব রেখেছে কলকাতা

উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজানা ইতিহাসের গল্প। সেই ইতিহাস আমাদের কলকাতা এবং তার বিচিত্র রূপকে দেখতে সাহায্য করে।

বাংলা ভাষায় একদা বিখ্যাত কিন্তু বর্তমানে বিস্মৃত প্রবাদের তালিকা দীর্ঘ। 'বনমালী সরকারের বাড়ি, গোবিন্দরাম মিত্রের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, হুজুরিমলের কড়ি', কে না জানে? প্রবাদ শুনলেই বোঝা যায় যে, এই চারজন যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। তাই তাঁদের সম্পর্কে জানাটা স্বাভাবিক। প্রবাদটা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ার সময় সাধারণ মানুষ এই চার জনের সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলেও এখন বহু মানুষ এই চারজনের মধ্যে হয়তো একজনের নামও জানেন না।

বনমালী সরকার পাটনার প্রথম দেওয়ান হয়েছিলেন। দেওয়ানি এবং ব্যবসা করে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। সেই উপার্জিত অর্থের কিছুটা ব্যয় করে তিনি এক বিশাল বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। সম্ভবত ১৭৪০-১৭৫০ সাল নাগাদ উত্তর কলকাতার কুমারটুলি এলাকায় বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। বাড়ির আকার, স্থাপত্যশৈলির কথা ক্রমে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত সেই বাড়ির বর্ণনা দিতেই প্রবাদের প্রথম অংশের জন্ম হয়। উত্তর কলকাতার বনমালী সরকার স্ট্রিট এই বাড়ির গল্পের সাক্ষী হিসাবে রয়েছে।

গোবিন্দরাম মিত্র কলকাতার প্রথম 'কালো জমিদার' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। প্রভাবশালী ব্রিটিশদের এই কালো জমিদার মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কিছু নৃশংস উপায় বের করেছিলেন। কথিত আছে,গোবিন্দরাম মিত্রর নির্দেশে এক আসামীর শাস্তিস্বরূপ তাঁকে কারাগারে বন্দি করে লাঠি এবং লোহার শিকল দিয়ে প্রহার করা হয়। এই প্রহারের পর আসামীকে রাস্তায় বেঁধে রেখে গোবিন্দরাম রাস্তায় উপস্থিত পথচারীদের আসামীর মাথায় লাথি মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা পর্যন্ত এই জমিদারকে সামলে চলত। হলওয়েল গোবিন্দরামের বিরুদ্ধে চাকরিক্ষেত্রে অসৎ উপায় অবলম্বন করার অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু শেষ অবধি গোবিন্দরামের শাস্তি হয়নি। ধনী এবং প্রভাবশালী এই জমিদারের কঠোর মানসিকতা বোঝাতেই প্রবাদের দ্বিতীয় অংশ লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

উমিচাঁদ সম্ভবত নুন এবং অফিমের ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার মাধ্যমে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন।তিনি ব্রিটিশ এবং মুর্শিদাবাদের নবাব- উভয়ের ঘনিষ্ট ছিলেন। দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরুদ্ধে চক্রান্তে তিনি যুক্ত ছিলেন। পলাশির যুদ্ধের পর তিনি নবাবের উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির পাঁচ শতাংশ দাবি করেছিলেন, যার মূল্য সেই সময় প্রায় চল্লিশ কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। রবার্ট ক্লাইভ তাঁর সঙ্গে ছল করে প্রথমে রাজি হয়ে, পরে তাকে দিয়ে চুক্তির কাগজে সই করিয়ে নিয়েছিলেন, যে চুক্তিতে উমিচাঁদের কোনও অংশ প্রাপ্য ছিল না। এই ছলচাতুরির খেলায় শেষ পর্যন্ত উমিচাঁদ ইংরেজদের সাহায্য করার পরিবর্তে একটা টাকাও পান নি। উমিচাঁদের দাড়ির বাহার সম্ভবত প্রবাদের তৃতীয় অংশের জন্ম দিয়েছে, যদিও এই ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।

হুজুরিমল সম্ভবত উমিচাঁদের বন্ধু ছিলেন। হুজুরিমল পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ব্যবসা করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেছিলেন। সেই টাকার কিছু অংশ তিনি জনসাধারণের জন্যও ব্যয় করেছিলেন। বৈঠকখানা এলাকায় একটা পুকুর খনন, স্নান করার জন্য গঙ্গার ঘাট বাঁধানোর মতো বহু কাজ করার কারণে তিনি মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। হুজুরিমলের জীবনযাত্রার কারণে তাঁর ব্যবসা এবং সেই ব্যবসা থেকে লাভ বিষয়ে বিভিন্ন গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরত। হুজুরিমলের বিস্তর টাকার কথা যে সবাই জানে, সেকথা বোঝাতে প্রবাদটা ধীরে ধীরে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলা ভাষার প্রবাদ এবং বাংলার ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় খুঁজলে বাংলার মানুষ হয়তো আরও অনেক অজানা গল্প খুঁজে পাবে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।