নামেই লুকিয়ে ইতিহাস! মিরজাফরের প্রাসাদ থেকে বেনিয়া সাহেব, হিসেব রেখেছে কলকাতা
উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজানা ইতিহাসের গল্প। সেই ইতিহাস আমাদের কলকাতা এবং তার বিচিত্র রূপকে দেখতে সাহায্য করে।

কলকাতা এক বিচিত্র শহর। এই শহরের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে রয়েছে নানা রঙের ইতিহাস। কলকাতার বিভিন্ন এলাকার নাম থেকে সেই ইতিহাসের কিছুটা আমরা জানতে পারি।
কলকাতায় ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে ইতালি থেকে এই দেশে এসেছিলেন এডুয়ার্ডো। যদিও তাঁর ভারতে আসার কারণ নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কলকাতায় এসে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সিভিল আর্কিটেক্ট পদে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি মধ্য কলকাতার একটি বাজারের মালিক হয়েছিলেন। ব্রিটিশরা তাঁর নাম এডুয়ার্ডোর বদলে এডওয়ার্ড উচ্চারণ করতো। ১৭৯০ সালের একটি মানচিত্রে তার অধীনস্থ সেই বাজারের নামের প্রথম নথি পাওয়া যায়।এডুয়ার্ডো তিরেত্তার অধীনস্থ সেই বাজারের প্রথম নাম হয় টিরেটি, এবং পরে টেরিটিবাজার। অষ্টাদশ শতকে চিনা শ্রমিক এবং নাবিকরা এই এলাকায় বসবাস করার ফলে লোকের মুখে এই এলাকার নাম হয়ে যায় চিনে পাড়া। বর্তমানে চিনে পাড়া বলতে বেশিরভাগ মানুষ ট্যাংরা এলাকার কথা জানলেও টেরিটিবাজার হলো কলকাতার প্রথম চিনে পাড়া।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দুর্গাপুজো মানেই বাঙালিদের কাছে সারা বছরের প্রতীক্ষার পরে কয়েক দিনের আনন্দ। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, দেবীর বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন কারণে শুরু হওয়া সেই দুর্গোৎসব বছরের পর বছর অতিক্রম করেই আজ আমাদের চেনা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।
১৭৮৪ সালের এক মানচিত্রে বর্তমান মধ্য কলকাতায় ডোমতলা নামে একটি এলাকার নাম পাওয়া যায়। সৎকারের কাজ করার জন্য ডোমরা সমাজে অচ্ছুৎ ছিল। সুতানুটির এলাকার মধ্যে তাদের বসবাসের অধিকার ছিল না। তাই ডোমরা সুতানুটির এলাকার বাইরে বসবাস করতো। উনিশ শতকে এক ইহুদি ব্যবসায়ী ডেভিড জোসেফ এজরা নীল, সুতো এবং অফিমের ব্যবসায় প্রচুর লাভ করেছিলেন। তিনি সেই সময়ের অন্যতম ধনী ইহুদি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায় উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি প্রচুর জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতে প্রচুর বাড়ি বানিয়ে বিক্রি করা ছাড়াও তিনি হাসপাতাল, ইহুদি এবং পার্সিদের উপাসনালয় নির্মাণ করেছিলেন। এযরা কলকাতা কর্পোরেশনের কমিশনার হয়েছিলেন। ডেভিড এজরার নাম অনুসারে মধ্য কলকাতার একটা রাস্তার নাম এযরা স্ট্রিট। বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে এই এলাকা বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকানের এলাকা হিসেবে পরিচিত। যদিও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এজরা স্ট্রিটের নামের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই বলেন যে এজরা স্ট্রিট আসলে ডেভিড এজরার ছেলের নাম থেকেই নিজের নাম পেয়েছে।
সপ্তগ্রামের বসাক এবং শেঠরা ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে তাঁরা সুতানুটিতে এসেছিলেন। সেই সময় সুতানুটি জঙ্গলাকীর্ণ এক এলাকা ছিল। এই বসাক এবং শেঠরা সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে সুতানুটিকে বসবাসের যোগ্য করেছিলেন। এই বসাকদের মধ্যে অন্যতম ধনী ছিলেন শোভারাম বসাক। শোভারাম বসাকের নাম থেকেই উত্তর কলকাতার এক এলাকার নাম হয় শোভাবাজার। উত্তর কলকাতার অপর এক এলাকা তার নাম পেয়েছে ফুল থেকে। ১৭৪২ সালের বিভিন্ন নথিতে এই এলাকার নাম পাওয়া যায় যদিও এই এলাকা জঙ্গলে ঢাকা ছিল এবং কিছু দূর অন্তর বিভিন্ন আকারের জলাশয় ছিল। সন্ধে নামার পরে কোনও মানুষ ভুলেও সেই পথে যেত না। সেই সময়ের নথিতে এই এলাকাকে ডিহি পঞ্চান্নগ্রামের অংশ হিসেবে দেখানো হতো। জঙ্গলের মধ্যে প্রচুর শিমুল গাছ থাকার কারণে শিমুল ফুল মাটিতে পরে রাস্তার রং লাল হয়ে থাকত। শিমুল গাছের আধিক্যের কারণেই উত্তর কলকাতার এই এলাকার নাম হয় শিমলা।
তাঁর প্রাসাদ বলতে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে 'নমকহারাম দেউড়ি' বলে পরিচিত। তাঁর আসল নামের থেকে সাধারণ মানুষের কাছে এই বিশ্বাসঘাতক তকমা বেশি গ্রহণযোগ্য। এই বিশ্বাসঘাতকের নাম থেকে দক্ষিণ কলকাতার এক এলাকা তার নাম পেয়েছে। বাংলায় 'বিশ্বাসঘাতক' বলতে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকেন মিরজাফর আলি খান। পলাশির যুদ্ধে তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার কথা ইতিহাসে। ইংরেজদের শোষণের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ওলন্দাজদের সাহায্য চেয়েছিলেন। ব্রিটিশরা ওলন্দাজদের চুঁচুড়ার যুদ্ধে পরাজিত করার পরে তার কাছে পালানোর কোনও পথ ছিল না। ব্রিটিশদের নির্দেশ অনুযায়ী বর্তমান দক্ষিণ কলকাতার একটি অংশে তিনি বসবাস করতেন। সেই এলাকায় নিজের জন্য প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করিয়েছিলেন। তাঁর নাম থেকেই দক্ষিণ কলকাতার সেই পরিচিত জায়গার নাম হয়েছে আলিপুর।
উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজানা ইতিহাসের গল্প। সেই ইতিহাস আমাদের কলকাতা এবং তার বিচিত্র রূপকে দেখতে সাহায্য করে। সাধারণ মানুষের কাছে কলকাতা হয়তো এইভাবে নিজেকে মেলে ধরতে চায়।
















