পাখি থেকে বাদুড়: তাপপ্রবাহে যেভাবে সংকট বাড়ছে বন্যপ্রাণীদের
Heat stress in birds: ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাপপ্রবাহের জেরে পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এই নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
দুপুরের প্রখর রোদে আচমকাই মাটিতে এসে পড়ল একটি ভুবনচিল (Black Kite)। কিছু দূরে তপ্ত রাস্তার ধারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে একটি শালিক পাখি। অন্যদিকে, ভোরবেলা ছত্তীসগঢ়ের কোরবা জেলার মানুষ ঘুম ভেঙে দেখে গাছের ডাল থেকে ঝরে পড়ছে শয়ে শয়ে বাদুড়, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, যা অনেকটা পুড়ে যাওয়া ফলের মতো দেখাচ্ছে। গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমন করুণ দৃশ্য বারবার সামনে এসেছে। রাজস্থান, দিল্লি, ছত্তীসগঢ়ের, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ—একাধিক রাজ্যে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ঘটনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু মানুষের মতো পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর পক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে চরম গরমের অভিঘাত তাদের শরীরে সরাসরি আঘাত হানছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন পশুচিকিৎসক এবং উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাপপ্রবাহের সময়ে ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক এবং শারীরিক অবসাদের শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক পাখি চিকিৎসার জন্য আনা হচ্ছে।
ওয়াইল্ডলাইফ এনভায়রনমেন্ট সেভিয়ার ট্রাস্টের সভাপতি চিত্রক প্রামাণিকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ডিহাইড্রেশন এবং তাপজনিত অসুস্থতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষত ভুবনচিল বা ব্ল্যাক কাইট, এছাড়া শালিক, বুলবুলি, ছাতারে এবং শহর ও মফস্বলের মধ্যে যেসব পাখি বেশি থাকে, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। গোয়ার টেইলওয়্যাগারজ পেট ক্লিনিকের পাখি এবং ইগজটিক প্রাণী চিকিৎসক ডা. নেহা আফোনসো বলেন,
পাখিরা অসুস্থতা লুকিয়ে রাখতে অত্যন্ত দক্ষ। ফলে যখন তাদের অসুস্থতা চোখে পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছে যায়।
তাপপ্রবাহে আক্রান্ত ভুবনচিল
তিনি জানান, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পাখিদের শরীর দ্রুত জলশূন্য হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা দুর্বল হয়ে যায়, উড়তে পারে না, শ্বাসকষ্টে ভোগে এবং মাটিতে পড়ে যায়। চিকিৎসকদের কাছে আসা বহু পাখির মধ্যে মুখ খোলা রেখে দ্রুত শ্বাস নেওয়া, ডানা ঝুলে পড়া, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, চোখ আধবোজা হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক অবসাদের মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ডা. আফোনসোর কথায়,
মানুষের মতো পাখিদের ঘামগ্রন্থি নেই। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা মূলত হাঁপানো এবং ছায়ার আশ্রয় নেওয়ার উপর নির্ভর করে।
পাখিদের বিপাকক্রিয়াও অত্যন্ত দ্রুত। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা শরীর থেকে প্রচুর জল হারিয়ে ফেলতে পারে। তাপমাত্রা যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন শরীর থেকে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যায় এবং ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফলেই ডিহাইড্রেশন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা হ্রাস এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Birds Ear: পাখির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙে, আর পাখিদের ঘুম ভাঙে কোন শব্দে? পাখিরা শব্দ শোনে কীভাবে? পাখিদের কান কই?
ডা. আফোনসো সতর্ক করে বলেন,
তাপপ্রবাহের ঘটনা যত ঘন ঘন হচ্ছে এবং যত দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, ততই বহু প্রাণী তাদের স্বাভাবিক সহনক্ষমতার সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে শুধুমাত্র তাপমাত্রা বৃদ্ধিই এই সংকটের কারণ নয়। চিত্রক প্রামাণিকের মতে, নগরায়ণ, বৃক্ষনিধন, জলাভূমি ধ্বংস এবং মানুষের লাগাতার অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
তিনি বলেন,
অতিরিক্ত গাছ কেটে ফেলা, জলাভূমি ভরাট এবং দূষণের ফলে পাখিদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তারা আরও বেশি সমস্যার মুখে পড়ছে।
একসময় শহর ও গ্রামের নানা প্রান্তে বড় বড় গাছ, পুকুর, ডোবা এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল। গ্রীষ্মকালে এগুলিই পাখিদের আশ্রয় ও জলের উৎস হিসেবে কাজ করত। কিন্তু দ্রুত নগর সম্প্রসারণের ফলে সেই প্রাকৃতিক পরিকাঠামোর বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। চিত্রক প্রামাণিকের কথায়,
একটি প্রাচীন বড় গাছ কেটে ফেললে শুধু একটি গাছ হারায় না, পাখিরা তাদের বহু বছরের বাসস্থানও হারায়।

তাপপ্রবাহে ডিহাইড্রেশনের শিকার বিরল প্রজাতির পাখি রাতচরা (Long-tailed Nightjar)। উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে।
এছাড়া বহু জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলনির্ভর পাখিদের খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট তৈরি হয়েছে। চরম গরমের সময় এই সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Urban Nature and Mental Health: মেলবোর্নে শহুরে এলাকায় গাছেদের ইমেল ঠিকানা তৈরি করা হয়েছিল। দেখা যায়, বাসিন্দারা তাদের প্রিয় গাছগুলিকে হাজার হাজার প্রেমপত্র লিখেছেন।
জলাভূমি ও পুকুরের জল পাখিদের বেঁচে থাকার অন্যতম ভরসা। কিন্তু সেগুলি ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরাঞ্চলে পাখিদের জলসংকট ক্রমশ বাড়ছে।
ডা. আফোনসোও মনে করেন,
জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবাসস্থল ধ্বংস একসঙ্গে পাখিদের তাপজনিত ঝুঁকির মুখে আরও অসহায় করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে পাখিদের মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পাখি অসুস্থ বা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। তবে ডা. আফোনসোর মতে,
সুস্থ একটি বন্য পাখি সাধারণত মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই উড়ে যায়। যদি কোনো পাখি মাটিতে পড়ে থাকে এবং মানুষকে খুব কাছে আসতে দেয়, তবে সেটি প্রায়শই বিপদের লক্ষণ।
অসুস্থ পাখিকে একটি শান্ত, ছায়াযুক্ত এবং বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখতে হবে। খোলা জায়গায় না রেখে পিচবোর্ডের বাক্স বা ঝুড়ির মধ্যে নরম কাপড়ের বিছানা তৈরি করে রাখা যেতে পারে। তবে সাহায্য করতে গিয়ে অনেকেই ভুল করে বসেন। ডা. আফোনসো সতর্ক করে বলেন,
অসুস্থ পাখিকে কখনও জোর করে জল বা খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না; এতে উপকারের বদলে প্রাণঘাতী ক্ষতি হতে পারে।
তাঁর কথায়,
পাখির ঠোঁটে জোর করে জল ঢাললে তা ফুসফুসে ঢুকে যেতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হতে পারে।
তিনি আরও জানান, দুধ, বিস্কুট, রুটি বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার অধিকাংশ পাখির জন্য উপযুক্ত নয়। পাখির প্রজাতি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে খাবার না দেওয়াই ভালো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব পাখির খাদ্যাভ্যাস এক নয়। কেউ শস্যভোজী, কেউ ফলভোজী, কেউ আবার কীটভোজী বা মাংসাশী। উদাহরণস্বরূপ, চড়ুই, পায়রা ও ঘুঘু প্রধানত শস্যদানা খায়, বুলবুল ও হরিয়াল ফলভোজী, দোয়েল ও ফিঙে বিভিন্ন পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে, আর চিল ও পেঁচার মতো পাখি ছোট প্রাণী শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করে। কাক ও শালিকের মতো কিছু পাখি সর্বভুক এবং পরিবেশ অনুযায়ী খাদ্য পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এক প্রজাতির জন্য উপযোগী খাবার অন্য প্রজাতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই উদ্ধার করা পাখিকে খাবার দেওয়ার আগে তার প্রজাতি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ছোট পাখিদের সাধারণত অর্ধতরল বা মণ্ড করা খাবার দেওয়া উচিত। বড় পাখির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত শক্ত খাবার দেওয়া যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুস্থ হয়ে ওঠা পাখিকে অকারণে খাঁচাবন্দি করে রাখা উচিত নয়। যদি পাখিটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত হয়, তাহলে তাকে মুক্ত করে দিতে হবে। অন্যদিকে, গুরুতর আঘাত বা স্থায়ী শারীরিক সমস্যার কারণে যেসব পাখি আর প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারবে না, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। চিত্রক প্রামাণিকের মতে,
একটি-দুটি পাখি উদ্ধার করে পাখিদের রক্ষা করা সম্ভব নয়; পাখিদের রক্ষা করতে হলে তাদের বাসস্থান রক্ষা করতে হবে।
ভারতের ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য এক নীরব বিপর্যয় ডেকে আনছে। আকাশ থেকে পড়ে যাওয়া একটি চড়াই কিংবা গাছ থেকে ঝরে পড়া একটি বাদুড় আমাদের পরিবেশ, জলবায়ু এবং উন্নয়নের মডেল সম্পর্কে এক গভীর সতর্কবার্তা বহন করে। চিত্রক প্রামাণিকের ভাষায়,
পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া পরিবেশের জন্য এক অশনি সংকেত।
প্রশ্ন হলো, সেই সতর্কবার্তা শোনার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?






