আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা
Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।
একদিকে গ্রামগুলিতে দিন দিন কমেই চলেছে কৃষিকাজে সহায়ক শ্রমিকের সংখ্যা, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে পেট্রোল-ডিজেলের দাম। তাই, এহেন পরিস্থিতিতে এখন ভারতে চাষবাস করাটাই এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কৃষকদের এই সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টাই হয়তো করেননি অধিকাংশ বড় প্রযুক্তি সংস্থা। তবে কৃষকদের সেই সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজতে চেয়েছিলেন আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তন শিক্ষার্থী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে।
বড় শহরে উঁচু পদের নিশ্চিত চাকরি, বিশ্বমানের কেরিয়ার ফেলে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন গ্রামের ধুলোমাখা পথ। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ভারতীয় কৃষির একদম গোড়ার কষ্টটা কাছ থেকে বোঝা। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় পুণেভিত্তিক স্টার্টআপ ‘বালিস্টো এগ্রিটেক’ (Balisto Agritech)। তাদের তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্যাটারিচালিত কৃষিযন্ত্র আজ ভারতের ছোট কৃষকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এক নতুন ভোরের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Eco Bloc RR Sivaram: আমরা সচরাচর যে সমস্ত কংক্রিটের ড্রেন দেখি, ইকো ব্লক কিন্তু তার চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি তৈরি হয় মূলত ফেলে দেওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে। ফলে পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যাও এতে কমে।
ঐশ্বর্য ও কেদারের পরিচয় প্রায় দুই দশক আগে। আইআইটি-র প্রবেশিকা পরীক্ষার কোচিং ক্লাসে। স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার পর ঐশ্বর্য বেছে নিয়েছিলেন মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর কেদার ভর্তি হন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। পড়াশোনা শেষে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থা ‘বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’ (BCG)-এ একসঙ্গে শুরু হয় পেশাগত জীবন। তবে এরপর দুজনের পথ কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। ঐশ্বর্য বিখ্যাত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড ‘ওয়েস্টব্রিজ’-এ কাজ করেন, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ শেষ করেন এবং পরবর্তীতে মহিন্দ্রা গ্রুপে আনন্দ মহিন্দ্রার মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করে কোম্পানির ট্র্যাক্টর বিভাগে যুক্ত হন। সেখানে কাজ করতে করতে প্রথমবার ভারতীয় কৃষির ভিতরের সমস্যাগুলি খুব কাছ থেকে দেখতে পান তিনি। অন্যদিকে, কেদার কিছুদিন কনসাল্টিং করার পর একটি এনজিও-তে কাজ করেন, একটি কৃষিভিত্তিক এগ্রিটেক স্টার্টআপ তৈরি করেন এবং পরবর্তীতে জনপ্রিয় ফুড-ডেলিভারি সংস্থা ‘সুইগি’ (Swiggy)-র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব সামলান। অবশেষে ২০২৩ সালে দুজনেরই ইচ্ছে হয় নিজেদের মেধা দিয়ে সমাজের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু করার।
কর্পোরেট দুনিয়া ছেড়ে তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন একের পর এক গ্রামে। কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলে তাঁরা বুঝতে পারেন মাঠে কাজ করার জন্য শ্রমিকের তীব্র অভাব থাকা সত্ত্বেও যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা সাধারণ কৃষকের কাছে পৌঁছচ্ছে না। বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Rain: তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
পুণের মোশিতে কারখানায় কাজ শুরু করে তাঁরা তৈরি করেন ‘Balisto 130 Pro’ নামের একটি ১৩-হর্সপাওয়ারের বহু-কার্যকারী ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক পাওয়ার টিলার। ডিজেলে যেখানে প্রতি একর জমি চাষে প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হতো, সেখানে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করলে একর প্রতি খরচ পড়ে মাত্র ৪০ টাকার মতো। শুধু মাটিকে তৈরি করা নয়, এতে আলাদা আলাদা সরঞ্জাম লাগিয়ে একইসঙ্গে আগাছা ছাঁটা, গাছের গোড়ায় মাটি তোলা, ওষুধ স্প্রে করা এমনকী ট্রলি যুক্ত করে পণ্য পরিবহনের কাজও সহজে মেটানো যায়। ডিজেল ইঞ্জিনের ভয়ানক বিকট আওয়াজ, বিষাক্ত ধোঁয়া কিংবা বিকট ঝাঁকুনি না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে কাজ করলেও কৃষক অসুস্থ হন না, শরীরে ক্লান্তিও আসে না। এছাড়া মেশিনটির বাঁ ও ডানপাশের চাকা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে সরু জমিতে খুব সহজে ঘোরানো যায়। এতে সহজে খুলে নেওয়া যায় এমন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি রিমোটের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালনা করার সুব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
যন্ত্রটির মূল দাম রাখা হয়েছে প্রায় ২.৫ লাখ টাকা এবং এটি সরকারি ভর্তুকি (Subsidy) প্রকল্পের আওতায় থাকায় কৃষকদের জন্য কেনাকাটার কার্যকর খরচ আরও অনেকটাই কমে আসে। যন্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রাংশই মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটক থেকে দেশীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্রের হলুদ ও আখ চাষের এলাকাগুলিতে বহু মেশিন কাজ শুরু করেছে এবং চলতি অর্থবর্ষেই অন্তত ৫০০টি মেশিন কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে বালিস্টো। ঐশ্বর্য ও কেদারের মতে, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য কেবল কৃষিযন্ত্রে ইলেকট্রিক মোটর বসানো নয়, বরং দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে এমন প্রযুক্তি তুলে দেওয়া, যা তাঁদের কেনা ও চালানোর সাধ্যের মধ্যে থাকবে এবং তাঁদের স্বাবলম্বী করে তুলবে।






