দিল্লিতে আজ ক্লাউড সিডিং, কিন্তু ৭০ বছর আগেই কলকাতার আকাশে বৃষ্টি নামিয়েছিলেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী
Artificial Rain: তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
আজকাল শীতকাল এলেই দিল্লির বিষাক্ত ধোঁয়াশা (smog) পরিষ্কার করার জন্য কৃত্রিম বৃষ্টি বা ‘ক্লাউড সিডিং’ (Cloud Seeding) প্রযুক্তির কথা প্রায়ই খবরে শোনা যায়। আধুনিক বিমান আর কোটি কোটি টাকার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেঘের উপর রাসায়নিক ছড়িয়ে এই বৃষ্টি নামানো হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত দশক আগে কলকাতার বুকে এক বাঙালি বিজ্ঞানী কোনো দামি বিমান ছাড়াই, স্রেফ সাধারণ কিছু হাইড্রোজেন বেলুন আর নিজের অদম্য জেদকে পুঁজি করে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে দেখিয়েছিলেন।
তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
সুধাংশু বাবুর বিজ্ঞান চর্চার শুরুটা কিন্তু আবহাওয়া অফিস থেকে হয়নি। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং বিজ্ঞানে ডক্টরেট (D.Sc.) ডিগ্রি পান। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সায়েন্স কলেজে পড়াতেন। ঠিক এই সময়েই তিনি নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্যার সি. ভি. রমনের প্রথম গবেষণা সহকারী (Research Assistant) হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। ল্যাবরেটরিতে কঠোর পরিশ্রম আর নিখুঁত পরীক্ষানিরীক্ষার সেই যে হাতেখড়ি, সেটাই পরবর্তীতে তাঁর পুরো জীবনকে বদলে দিয়েছিল।
এরপর তিনি ভারতের আবহাওয়া দপ্তরে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালে তিনি এই দপ্তরের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ ‘ডিরেক্টর জেনারেল অব অবজারভেটরিজ’ হন। তাঁর আগে এই পদে কেবল ব্রিটিশরাই বসতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন বিদেশ থেকে আবহাওয়ার যন্ত্রপাতি আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন সুধাংশু বাবু সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতে বসেই চমৎকার সব যন্ত্রপাতি তৈরি করেন। এই অসাধারণ অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘ওবিই’ (OBE) উপাধিতে ভূষিত করে। আন্তর্জাতিক স্তরেও ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনে (WMO) তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Lightning: কলকাতায় ইদানীং আকাশ ভেঙে যে হারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়-বৃষ্টি নামছে, তা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা আর হঠাৎ ধেয়ে আসা তীব্র বজ্রঝড় নিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট কথা বলেছিল বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী-র সঙ্গে।
যেভাবে মাথায় এল ‘বৃষ্টি তৈরির যন্ত্র’ বানানোর বুদ্ধি
১৯৫০ সালে আবহাওয়া দপ্তর থেকে অবসর নেওয়ার পর সুধাংশু বাবু যাদবপুরের ‘কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ (যা এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়)-তে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর মন পড়েছিল গবেষণায়।
ঠিক সেই সময়ে, ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে আমেরিকার বিজ্ঞানীরা প্রথম দেখান যে মেঘের মধ্যে বিশেষ কিছু কণা বা রাসায়নিক ছড়িয়ে দিলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানো সম্ভব। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে আমেরিকা সফরের সময় সুধাংশু বাবু এই পরীক্ষাগুলি খুব কাছ থেকে দেখেন। দেশে ফিরে তিনি ভাবলেন, ভারত তো গরিব দেশ, এখানে আমেরিকার মতো দামি বিমান ব্যবহার করে আকাশে রাসায়নিক ছড়ানো সম্ভব নয়। তাহলে উপায়? তিনি ঠিক করলেন, বিমান ছাড়াই অনেক কম খরচে ভারতে বৃষ্টি নামানোর দেশীয় পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে।
যাদবপুরের ল্যাবে তিনি কাঁচের একটি মস্ত বড় ‘ক্লাউড চেম্বার’ বা কৃত্রিম মেঘ তৈরির ঘর বানালেন। প্রায় দুই বছর ধরে সেই বন্ধ ঘরের ভিতর তিনি সিলভার আয়োডাইড বাষ্প, ড্রাই আইস (কঠিন কার্বন ডাই অক্সাইড) আর সাধারণ লবণ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলেন। লক্ষ্য একটাই—মেঘকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে জল বের করে আনা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jagadish Chandra Bose: জগদীশ চন্দ্র বসুর ‘প্যান-ভাইটালিস্ট’ বিজ্ঞান কি সত্যিই পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, নাকি প্রকৃতিকে ‘মা’ এবং বিজ্ঞানকে ‘পুরুষ’ হিসেবে দেখার মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক ধারণাকেই পুনরুৎপাদন করেছিল? নব্য উদারপন্থার যুগে পরিবেশ-ন্যায়ের লড়াইয়ে গীতা চাঁধার প্রস্তাবিত নারীবাদী বিজ্ঞান কি নতুন পথ দেখাচ্ছে?
১৯৫২: কলকাতার আকাশে ইতিহাস
ল্যাবের পরীক্ষা সফল হওয়ার পর ১৯৫২ সালের বর্ষাকালে শুরু হলো আসল লড়াই। সুধাংশু বাবু আর তাঁর দল নাগপুর থেকে বিশেষ ধরনের বেলুন আনিয়েছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে হাইড্রোজেন গ্যাস জোগাড় করেছিলেন।
পদ্ধতিটি ছিল ভারী অদ্ভুত কিন্তু দারুণ বুদ্ধিমত্তায় ভরা। তাঁরা হাইড্রোজেন ভর্তি বড় বেলুনগুলির সঙ্গে ছোট ছোট কিছু কলকব্জা বেঁধে দিলেন। এই যন্ত্রগুলির কাজ ছিল সিলভার আয়োডাইড বাষ্প আর ড্রাই আইস বহন করা। আর তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল সামান্য একটু বারুদ (গানপাউডার)। বেলুনগুলি যখন উড়তে উড়তে ঠিক মেঘের স্তরে গিয়ে পৌঁছত, তখন ঘড়ির কাঁটা মেপে সেই বারুদে মৃদু বিস্ফোরণ ঘটানো হতো। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে মেঘ তৈরির রাসায়নিকগুলি মেঘের ভিতর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
কলকাতার আকাশে যেদিন প্রথম এই বেলুন ওড়ানো হলো, অনেকেই হেসেছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন এটা সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু বেলুন ওড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে চমকে দিয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল কলকাতার বুকে। বেশ কয়েকবার এই পরীক্ষা করা হলো এবং প্রায় প্রতিবারই পরীক্ষা চালানোর ঠিক পরেই বৃষ্টি হতো। কখনো কখনো এত বেশি বৃষ্টি হতো যে চারদিকের রাস্তায় জল জমে যেত আর প্রতিবেশীরা মজা করে নালিশ জানাতেন! এই প্রায় নিখুঁত সাফল্যের পরই তাঁর নাম হয়ে গেল ‘মেঘ ব্যানার্জি’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়।
হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যেভাবে ফিরে এল
সুধাংশু বাবুর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর ১৯৫৩ সালে ভারত সরকার উত্তর ভারতে কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে বড়সড় গবেষণার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে উত্তর ভারতে এই প্রযুক্তিতে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টিপাত বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এই ইউনিটটিই পরবর্তীতে পুনের বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজি’ (IITM) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্থাটি আজও স্বীকার করে—ভারতে কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর প্রথম সফল পথিকৃৎ ছিলেন ডক্টর এস. কে. ব্যানার্জি।
অবসরের পর সুধাংশু বাবু শান্তিনিকেতনের রতনপল্লীতে শান্তিতে জীবন কাটাতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মহান বিজ্ঞানীর গল্প ধুলো চাপা পড়ে যায়। ইন্টারনেটে বা পুরনো খবরের কাগজেও তাঁর নাম খুব একটা পাওয়া যেত না।
এই ইতিহাসকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলেন তাঁর নাতি রঞ্জন ব্যানার্জি (আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন ছাত্র)। সুধাংশু বাবুর স্ত্রী একটি বাংলা ডায়েরিতে স্বামীর এই গৌরবময় জীবনকাহিনি লিখে রেখেছিলেন। রঞ্জন বাবু সেই ডায়েরিটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর ও বিভিন্ন বিজ্ঞান সংস্থার কাছে পাঠান। এরপরই আবহাওয়া দপ্তর নতুন করে এই বাঙালি বিজ্ঞানীকে সম্মান জানায়। আজ দিল্লির আবহাওয়া দপ্তরের সদর দপ্তরে তাঁর ছবি টাঙানো আছে এবং কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া অফিসের একটি কনফারেন্স রুমের নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে।
কেন আজ ৭০ বছর পরও তিনি প্রাসঙ্গিক?
আজ সুধাংশু বাবুর সেই পরীক্ষার পর ৭০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। ভারতের তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলি খরা মোকাবিলা করতে আজও কৃত্রিম বৃষ্টির সাহায্য নেয়। জলসংকট আর বায়ুদূষণ মেটাতে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক আছে, কিন্তু মূল ভাবনাটা একই রয়ে গিয়েছে—যা আজ থেকে সাত দশক আগে যাদবপুরের একটা সাধারণ ল্যাবে বসে একজন বাঙালি বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন।
‘মেঘ ব্যানার্জি’-র গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বড় কোনো আবিষ্কারের জন্য সব সময় কোটি কোটি টাকার আধুনিক ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয় না। সীমিত সম্পদ আর চারপাশের মানুষের অবিশ্বাস সামলেও যদি নিজের স্বপ্নের প্রতি একরোখা জেদ থাকে, তবে আকাশের বুক থেকেও বৃষ্টি নামিয়ে আনা সম্ভব।






