সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে পরিবার, HRW-এর কী অভিযোগ?
India Bangladesh border: ভারত কি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাভাষী বাসিন্দাদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনই অভিযোগ উঠেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা জোর করে মানুষ পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) অভিযোগ করেছে, পশ্চিমবঙ্গের বহু বাংলাভাষী বাসিন্দাকে, তাদের অধিকাংশই মুসলিম—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে নারী, শিশু-সহ বহু মানুষ সীমান্তের ‘জিরো লাইন’-এ অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত ১৬ জুন প্রকাশিত HRW-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BGB)-এর অননুমোদিত প্রবেশ রোধের কারণে অনেক পরিবার দুই দেশের মাঝামাঝি এলাকায় আটকে পড়েছে। সংস্থাটির দাবি, যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি হওয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই নাগরিকত্ব যাচাই, আইনি শুনানি বা আপিলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে। রাজ্য সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, বহু ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh pushback: বাংলাদেশের পুশইন অভিযোগ, ভারতের পুশব্যাক নীতি এবং পশ্চিমবঙ্গে হোল্ডিং সেন্টার তৈরির সিদ্ধান্ত কি সীমান্ত রাজনীতির নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করছে? নাগরিকত্ব যাচাই, অনুপ্রবেশ ও মানবাধিকার প্রশ্নে কোন পথে এগোচ্ছে রাজ্য?
HRW-এর বক্তব্য, সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী বহু বাংলাভাষী মুসলমান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভোটার কার্ড, আধার বা অন্যান্য পরিচয়পত্র থাকার দাবিও করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, শুধু ভাষা, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা বিপজ্জনক প্রবণতা।
প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে রাতে লোকজনকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা বাধা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই মানুষদের আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলিও একই ধরনের ঘটনার কথা তুলে ধরেছে। বিজিবি-এর দাবি, জুন মাসের শুরু থেকে একাধিকবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে এবং সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব মানুষের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?
সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। HRW-এর বর্ণনা অনুযায়ী, অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে, পর্যাপ্ত খাবার, জল বা চিকিৎসা ছাড়াই দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে। বর্ষার বৃষ্টি, বজ্রপাতের মধ্যেও তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছে—কোন দেশ তাঁদের গ্রহণ করবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, মানুষকে এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা বা অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। তাঁর মতে, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা উচিত, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আইনি সুরক্ষা ছাড়া নির্বাসিত করা উচিত নয়।
এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। তখন সংস্থাটি দাবি করেছিল, শত শত বাংলাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। সেই সময়ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলেছিল, যথাযথ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বিদেশি ঘোষণা করা আইনের শাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ভারত সরকারের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমস্যা। তাঁদের মতে, যাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাঁরা বৈধ নথিপত্রহীন বিদেশি নাগরিক। সরকারপক্ষের দাবি, সীমান্ত সুরক্ষা এবং জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়।
তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা এবং মানবাধিকার রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি কেউ সত্যিই বিদেশি হন, তাহলেও তাঁকে আইনি প্রতিনিধিত্ব, শুনানির সুযোগ এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও সেই কথাই বলে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও সীমান্ত, অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন দুই দেশের মধ্যে বারবার উত্তেজনার কারণ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে রয়েছে নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।








