সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে পরিবার, HRW-এর কী অভিযোগ?

India Bangladesh border: ভারত কি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাভাষী বাসিন্দাদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনই অভিযোগ উঠেছে।

inscript
৩ মিনিট
সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে পরিবার, HRW-এর কী অভিযোগ?

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা জোর করে মানুষ পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) অভিযোগ করেছে, পশ্চিমবঙ্গের বহু বাংলাভাষী বাসিন্দাকে, তাদের অধিকাংশই মুসলিম—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে নারী, শিশু-সহ বহু মানুষ সীমান্তের ‘জিরো লাইন’-এ অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

গত ১৬ জুন প্রকাশিত HRW-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BGB)-এর অননুমোদিত প্রবেশ রোধের কারণে অনেক পরিবার দুই দেশের মাঝামাঝি এলাকায় আটকে পড়েছে। সংস্থাটির দাবি, যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি হওয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই নাগরিকত্ব যাচাই, আইনি শুনানি বা আপিলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে। রাজ্য সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, বহু ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে চিহ্নিত করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাকিমপুর থেকে লালগোলা: পুশব্যাক রাজনীতির নতুন মানচিত্র

Bangladesh pushback: বাংলাদেশের পুশইন অভিযোগ, ভারতের পুশব্যাক নীতি এবং পশ্চিমবঙ্গে হোল্ডিং সেন্টার তৈরির সিদ্ধান্ত কি সীমান্ত রাজনীতির নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করছে? নাগরিকত্ব যাচাই, অনুপ্রবেশ ও মানবাধিকার প্রশ্নে কোন পথে এগোচ্ছে রাজ্য?

HRW-এর বক্তব্য, সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী বহু বাংলাভাষী মুসলমান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভোটার কার্ড, আধার বা অন্যান্য পরিচয়পত্র থাকার দাবিও করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, শুধু ভাষা, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা বিপজ্জনক প্রবণতা।

প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে রাতে লোকজনকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা বাধা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই মানুষদের আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলিও একই ধরনের ঘটনার কথা তুলে ধরেছে। বিজিবি-এর দাবি, জুন মাসের শুরু থেকে একাধিকবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে এবং সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব মানুষের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?

সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। HRW-এর বর্ণনা অনুযায়ী, অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে, পর্যাপ্ত খাবার, জল বা চিকিৎসা ছাড়াই দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে। বর্ষার বৃষ্টি, বজ্রপাতের মধ্যেও তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছে—কোন দেশ তাঁদের গ্রহণ করবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, মানুষকে এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা বা অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। তাঁর মতে, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা উচিত, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আইনি সুরক্ষা ছাড়া নির্বাসিত করা উচিত নয়।

এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। তখন সংস্থাটি দাবি করেছিল, শত শত বাংলাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। সেই সময়ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি বলেছিল, যথাযথ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বিদেশি ঘোষণা করা আইনের শাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ভারত সরকারের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমস্যা। তাঁদের মতে, যাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাঁরা বৈধ নথিপত্রহীন বিদেশি নাগরিক। সরকারপক্ষের দাবি, সীমান্ত সুরক্ষা এবং জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়।

তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা এবং মানবাধিকার রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি কেউ সত্যিই বিদেশি হন, তাহলেও তাঁকে আইনি প্রতিনিধিত্ব, শুনানির সুযোগ এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও সেই কথাই বলে।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও সীমান্ত, অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন দুই দেশের মধ্যে বারবার উত্তেজনার কারণ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে রয়েছে নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।